কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব | Kohlberg’s Theory of Moral Development

মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব (Kohlberg’s Theory of Moral Development) একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার, একজন ব্যক্তি কীভাবে ঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে সেই প্রক্রিয়ার এক গভীর ব্যাখ্যা প্রদান করে। প্রখ্যাত মার্কিন মনোবিজ্ঞানী লরেন্স কোহলবার্গ ১৯৫৮ সালে এই তত্ত্বটি প্রবর্তন করেন। এটি মানব আচরণ এবং সমাজবিজ্ঞানের এক জটিল সংযোগস্থল। জ্যাঁ পিঁয়াজের (Jean Piaget) ‘জ্ঞানমূলক বিকাশের তত্ত্ব’ (Piaget Theory of Cognitive Development)-র ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোহলবার্গের এই মডেলটি দেখায় যে, নৈতিকতা কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় ধারণা নয়। এই তত্ত্বের মূল কথা হল, কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নেওয়া সিদ্ধান্তটির চেয়ে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের কারণটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, এমন একজন ব্যক্তির কথা বিবেচনা করা যাক যিনি তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে দোকান থেকে ওষুধ চুরি করেন। এই কাজটি কি সঠিক নাকি ভুল? এই জটিল প্রশ্নের কোনো একক বা সর্বজনীন উত্তর নেই। শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে সঠিক ও ভুল সম্পর্কে মানুষের মানসিকতা কীভাবে বিবর্তিত হয়, তা বোঝার জন্য কোহলবার্গের তত্ত্বটি অনুধাবন করা অপরিহার্য।

 

Table of Contents

নৈতিক বিকাশের অর্থ

নৈতিক বিকাশ বলতে পূর্বে শৃঙ্খলা সম্পর্কিত ধারণাকেই বোঝানো হত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এই ধারণা বহুল পরিবর্তন ঘটে গেছে। তাই নৈতিকতা এবং নৈতিক বিকাশ সম্বন্ধে শিক্ষাবিদ এবং মনোবিদগণ নতুন আঙ্গিকে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। ইংরাজি ‘Moral’ শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘Mores’ থেকে, যার অর্থ হল- আচার-আচরণ, রীতিনীতি এবং লোকাচার। নৈতিক বিকাশ বলতে একটি ধারাবাহিক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সমাজ ও সংস্কৃতির রীতিনীতি অনুযায়ী সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখে এবং সেই অনুযায়ী নিজের আচরণ পরিচালনা করে। মানুষের চরিত্র গঠন, ন্যায়বোধ ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

 

কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব

কোহলবার্গ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ছিলেন এবং ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে সেখানে তাঁর কাজের জন্য তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। যদিও তিনি একজন বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, পরবর্তীকালে তিনি নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করেন। তিনি বিশেষত তাঁর ‘নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব’-এর জন্য সুপরিচিত ছিলেন; হার্ভার্ডের ‘Center for Moral Education’-এ পরিচালিত গবেষণার মাধ্যমে তিনি এই তত্ত্বটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তাঁর নৈতিক বিকাশের তত্ত্বটি সুইস মনোবিজ্ঞানী জ্যাঁ পিঁয়াজের এবং আমেরিকান দার্শনিক জন ডিউই-র ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তাঁরা উভয়েই এই বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন যে, মানুষের দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ একটি ক্রমিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটে।

 

কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশ তত্ত্বের পটভূমি

লরেন্স কোহলবার্গ (১৯৫৮) যদিও মূলত জ্যাঁ পিঁয়াজের (১৯৩২) নৈতিক বিকাশের তত্ত্বের সাথে একমত ছিলেন, তবুও তিনি সেই ধারণাগুলোকে আরও বিস্তারিত ও সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেছিলেন। নৈতিক দ্বিধা বা সংকটপূর্ণ ঘটনাগুলো তুলে ধরার জন্য তিনি পিয়াজের গল্প বলার পদ্ধতিটিই গ্রহণ করেছিলেন। কোহলবার্গের মতে নৈতিক বিকাশের প্রধান তিনটি কারণ হল- ১) জ্ঞানমূলক বিকাশ (Cognitive development), ২) জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্ব (Cognitive conflict), ভূমিকা গ্রহণের ক্ষমতা (Role taking ability)। মনোবিজ্ঞানী পিঁয়াজে যাকে সাম্যাবস্থা (Equilibrium) বুঝিয়েছেন, কোহলবার্গ তাকেই জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্ব বলেছেন। কোহলবার্গ বলেছেন, শিশুদের নৈতিক বিকাশে জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্বের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পরস্পর বিরোধী চিন্তা বা ব্যক্তির বিশ্বাসের সঙ্গে বাহ্যিক পরিবেশের সংঘাতের ফলেই জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্ব নৈতিক বিকাশের সহায়ক রূপে চিহ্নিত। সহজভাবে বলা যায় জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্ব এবং তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সাম্যাবস্থা বজায় রাখার প্রচেষ্টার ফলেই শিশুর নৈতিক বিকাশ ঘটে। এই তিনটি উপাদান (জ্ঞানমূলক বিকাশ, জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্ব এবং ভূমিকা গ্রহণের ক্ষমতা) পরস্পর নির্ভরশীল ও মিথস্ক্রিয়া সাপেক্ষ। নিম্নে একটি চিত্রের মাধ্যমে সেটি তুলে ধরা হল-

চিত্র : কোহলবার্গের মতে নৈতিক বিকাশের ভিত্তি
Heinz-এর দ্বন্দ্ব (Heinz Dilemma)

‘Heinz-এর দ্বন্দ্ব’ হল নৈতিক বিকাশের ওপর গবেষণাকালে কোহলবার্গের প্রবর্তিত একটি নৈতিক পরিস্থিতি বা দৃশ্যপট। এই দৃশ্যপটটি Heinz নামের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যিনি মুমূর্ষু স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য এমন একটি ওষুধ চুরি করার কথা বিবেচনা করেন যা কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই; এই পরিস্থিতিটি তাঁর সম্ভাব্য কাজের নৈতিক তাৎপর্য ও যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটায়।

কোহলবার্গ তাঁর তত্ত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিস্থিতি বা বিকল্প উপস্থাপন করতেন, যেমন- কোনো কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যক্তির অধিকারের বিপরীতে এমন একজন যোগ্য ব্যক্তির প্রয়োজনকে বিবেচনা করা যার প্রতি অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন নৈতিক দ্বিধার পরিস্থিতি উপস্থাপনের পর, কোহলবার্গ মানুষের প্রতিক্রিয়াগুলোকে নৈতিক চিন্তাভাবনার বা যুক্তিবোধের বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করেন। একাধিক নৈতিক দ্বিধার ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে কোহলবার্গ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের চেয়ে সেই সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি বা চিন্তাপ্রক্রিয়াটিই নৈতিক বিকাশের অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

কোহলবার্গ-এর অন্যতম একটি সুপরিচিত গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন Heinz নামের এক ব্যক্তি, যিনি ইউরোপের কোনো এক স্থানে বসবাস করতেন। Heinz-এর স্ত্রী এক বিরল ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে ছিলেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন যে, একটি নতুন ওষুধ তাঁর প্রাণ বাঁচাতে পারে। স্থানীয় এক ফার্মাসিস্ট বা ওষুধ বিক্রেতা সেই ওষুধটি আবিষ্কার করেছিলেন। Heinz ওষুধটি কেনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ফার্মাসিস্ট উৎপাদন খরচের চেয়ে দশ গুণ বেশি দাম চাইছিলেন যে মূল্য Heinz-এর সামর্থ্যের অনেক বাইরে ছিল।

পরিবার ও বন্ধুদের সহায়তা নিয়েও Heinz প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র অর্ধেক জোগাড় করতে পেরেছিলেন। তিনি ফার্মাসিস্টকে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে তাঁর স্ত্রী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন; তিনি অনুরোধ করেছিলেন যেন কম দামে ওষুধটি কিনতে পারেন অথবা বাকি টাকা পরে পরিশোধ করার সুযোগ পান। কিন্তু ফার্মাসিস্ট তা প্রত্যাখ্যান করেন; তাঁর যুক্তি ছিল যে ওষুধটি তিনিই আবিষ্কার করেছেন এবং তা থেকে তিনি মুনাফা করতে চান। স্ত্রীকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায়, Heinz সেই রাতেই ফার্মাসিস্টের দোকান বা গবেষণাগারে জোরপূর্বক প্রবেশ করেন এবং ওষুধটি চুরি করেন।

স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে Heinz-এর কি গবেষণাগারে ঢুকে ওষুধটি চুরি করা উচিত ছিল? কেন বা কেন নয়?

কোহলবার্গ-এর নৈতিকতা সম্পর্কিত বেশ কিছু প্রশ্ন
  1. Heinz-এর কি ওষুধটি চুরি করা উচিত ছিল?
  2. Heinz যদি তার স্ত্রীকে ভালোবাসতেন না, তবে কি পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হতো?
  3. মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিটি যদি একজন অপরিচিত মানুষ হতেন, তবে কি কোনো পার্থক্য হতো?
  4. ওই নারী যদি মারা যেতেন, তবে পুলিশ কি ওষুধ বিক্রেতাকে হত্যার দায়ে গ্রেপ্তার করত?

বিভিন্ন বয়সী শিশুদের দেওয়া উত্তরের ওপর ভিত্তি করে, কোহলবার্গ বোঝার চেষ্টা করেছিলেন যে বয়সের সাথে সাথে মানুষের নৈতিক বিচারবুদ্ধি বা যুক্তিপ্রক্রিয়া কীভাবে বিকশিত হয়। এই গবেষণার নমুনায় শিকাগোর ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৭২ জন বালক অন্তর্ভুক্ত ছিল; এদের মধ্যে ৫৮ জনের ওপর ২০ বছর ধরে প্রতি তিন বছর অন্তর পর্যবেক্ষণ চালানো হয়েছিল (কোহলবার্গ, ১৯৮৪)।

প্রতিটি বালক দশটি নৈতিক দ্বিধা বা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আয়োজিত দুই ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছিল। কোনো কাজকে বালকরা সঠিক নাকি ভুল বলে বিচার করছে মূলত তাতে কোহলবার্গের আগ্রহ ছিল না; বরং তিনি সেই সিদ্ধান্তগুলোর পেছনের যুক্তিটিই বুঝতে চেয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই যুক্তিগুলোরও পরিবর্তন ঘটেছিল।

 

কোহলবার্গ-এর নৈতিক বিকাশের পর্যায়সমূহ

কোহলবার্গ মত প্রকাশ করেন যে, মানুষের নৈতিক বিচারবুদ্ধি বা নৈতিক চিন্তন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট কিছু ধাপ বা পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এক্ষেত্রে ছয়টি শনাক্তযোগ্য ধাপ রয়েছে, যেগুলোকে সামগ্রিকভাবে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করা যেতে পারে। যথা- প্রাক-প্রথাগত পর্যায় (Pre-conventional stage), প্রথাগত পর্যায় (Conventional stage) এবং উত্তর-প্রথাগত পর্যায় (Post-conventional stage)। প্রতিটি স্তরের আবার দুটি করে উপ-পর্যায় রয়েছে। নিম্নে এগুলির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল-

চিত্র : কোহলবার্গ-এর নৈতিক বিকাশের পর্যায়সমূহ
প্রাক-প্রথাগত পর্যায় – ৪ বছর থেকে ১০ বছর

নৈতিক চিন্তাধারার এই প্রাথমিক পর্যায়টি সাধারণত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায়।

পর্যায়-১ (আনুগত্য ও শাস্তি)

এই পর্যায়ে ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে স্বীকৃত নিয়মকানুন মেনে চলে কারণ গুরুজন (যেমন- বাবা-মা বা শিক্ষক) তাদের তেমনটি করার নির্দেশ দেন। শাস্তির ভয় অথবা প্রকৃতপক্ষে শাস্তি পাওয়া হল এই নিয়ম মেনে চলার প্রধান কারণ। এখানে নৈতিকতা শাস্তি ও পুরস্কারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে; বাইরের কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ভিত্তিতে বিচার-বিবেচনা করা হয় এবং কোনো কাজের ভালো-মন্দ বা সঠিক-ভুল নির্ধারিত হয় সেই কাজের প্রত্যক্ষ বা শারীরিক পরিণতির ওপর ভিত্তি করে।

পর্যায়-২ (ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও বিনিময়)

এই পর্যায়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে নিজের সর্বোচ্চ স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করাকেই ‘সঠিক’ আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে নৈতিকতা পারস্পরিক বিনিময়ের ওপর নির্ভর করে। ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় এবং কেবল তখনই অন্যদের সহায়তা করে যখন তাতে কোনো ব্যক্তিগত লাভ থাকে। সহজ কথায়, এখানে যে নীতিটি কাজ করে তা হল: “তুমি যদি আমার কোনো উপকার করো, তবে আমিও তোমার উপকার করব।”

প্রথাগত পর্যায় – ১০ বছর থেকে ১৩ বছর

নৈতিক চিন্তাধারার এই দ্বিতীয় পর্যায়টি সমাজে সচরাচর পরিলক্ষিত হয় বলে একে ‘প্রচলিত’ বা ‘কনভেনশনাল’ স্তর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

পর্যায়-৩ (ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে)

এই স্তরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এমন আচরণ করা যার মাধ্যমে অন্যদের অনুমোদন বা স্বীকৃতি লাভ করা যায়। এখানে ভালো পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর ভিত্তি করেই নৈতিকতাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়; অর্থাৎ, যে আচরণ অন্যদের সন্তুষ্ট করে, তাকেই সঠিক বলে গণ্য করা হয়। কোনো কাজের বিচার করা হয় ব্যক্তির উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে।

পর্যায়-৪ (আইন ও শৃঙ্খলা)

এই স্তরে আইন মেনে চলা এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এখানে নৈতিকতাকে সাধারণ কল্যাণ সাধন এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

উত্তর-প্রথাগত পর্যায় – ১৩ বছর এবং ঊর্ধ্বে

কোহলবার্গের মতে, নৈতিক চিন্তাধারার এই তৃতীয় পর্যায়টি এমন একটি স্তর যেখানে অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই পৌঁছাতে পারেন না।

পর্যায়-৫ (সামাজিক চুক্তি)

এই পর্যায়টি পারস্পরিক সামাজিক আদান-প্রদান এবং অন্যের কল্যাণের প্রতি প্রকৃত উদ্বেগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এখানে সামাজিক চুক্তির কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তিগত ও নৈতিক অধিকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামাজিক ঐকমত্যের মাধ্যমে স্বীকৃত ব্যক্তিগত অধিকারের ভিত্তিতে সঠিক আচরণ নির্ধারিত হয়। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে আইন পরিবর্তন করা যেতে পারে।

পর্যায়-৬ (সর্বজনীন নীতি)

এই পর্যায়টি সর্বজনীন নীতি এবং ব্যক্তিগত বিবেকের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এখানে নৈতিকতাকে ন্যায়বিচারের সর্বজনীন নীতি দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সঠিক আচরণ ব্যক্তিগত বিবেক এবং নিজের দ্বারা নির্বাচিত নৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করে। এই পর্যায়ে অন্যায় বা অযৌক্তিক আইন অমান্য করাকে একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যদিও কোহলবার্গ সর্বদা ষষ্ঠ পর্যায়ের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন এবং এর কিছু সম্ভাব্য উদাহরণ চিহ্নিত করেছিলেন, তবুও তিনি এটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করার জন্য পর্যাপ্ত অংশগ্রহণকারী খুঁজে পাননি; এমনকি কোনো ব্যক্তির এই পর্যায়ের দিকে দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করাও ছিল অত্যন্ত কঠিন।

কোহলবার্গের বিশ্বাস ছিল যে, মানুষ কেবল উল্লিখিত ক্রমেই এই স্তরগুলো অতিক্রম করতে পারে। প্রতিটি নতুন পর্যায় পূর্ববর্তী পর্যায়ের চিন্তাধারাকে প্রতিস্থাপন করে। তবে সবাই সবকটি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, কেউ ‘ভালো ছেলে/মেয়ে’ (good boy/girl) পর্যায়ের মধ্য দিয়ে না গিয়ে সরাসরি স্বার্থপর মানসিকতা থেকে ‘আইন ও শৃঙ্খলা’ (law and order) পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না। ব্যক্তিরা তাদের বর্তমান স্তরের ঠিক পরবর্তী উচ্চতর পর্যায়ের নৈতিক যুক্তি বা চিন্তাধারা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। তাই, কোহলবার্গ তাদের সামনে আলোচনার জন্য নৈতিক দ্বিধা বা সংকট (Moral Dilemmas) তুলে ধরাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন; কারণ এটি তাদের ‘উচ্চ-স্তরের’ নৈতিকতার পেছনের যুক্তি বুঝতে এবং সেই দিকে তাদের বিকাশে সহায়তা করত। এই বিষয়টি কোহলবার্গের ‘নৈতিক আলোচনা পদ্ধতি’র (Moral discussion approach) ইঙ্গিত দেয়, যাকে তিনি আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করার একটি উপায় হিসেবে গণ্য করতেন। পিঁয়াজের মতোই, কোহলবার্গ বিশ্বাস করতেন যে নৈতিক বিকাশের সিংহভাগই সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। এই আলোচনা পদ্ধতিটি এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে, কোনো ব্যক্তি তার বর্তমান পর্যায়ে বিদ্যমান জ্ঞানীয় দ্বন্দ্বের (Cognitive Conflicts) ফলে বিকশিত হয়।

 

কোহলবার্গ-এর তত্ত্বের শিক্ষাগত তাৎপর্য

কোহলবার্গের তত্ত্ব অনুযায়ী নৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিদ্যালয় এবং শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। শিক্ষকরা নৈতিক দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গটি সচেতনভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তাঁরা সচেতনভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিস্থিতি তুলে ধরে তাকে সঠিকভাবে নিরসনে সাহায্য করতে পারে। এই জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ-

  1. বিদ্যালয়ে বা শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্ত নিয়মনীতিগুলি খুব স্পষ্টভাবে বলা দরকার এবং প্রয়োগ করার সময় কোনো পক্ষপাতিত্ব দেখানো উচিত নয়।
  2. নৈতিক দ্বন্দ্বের সমাধান প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীরাই করবে কিন্তু তা অবাঞ্ছিত পথে গেলে যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে সঠিক পথে চালিত করতে হবে।
  3. সমস্ত বয়সের ছাত্রছাত্রীর জন্য একই নৈতিক মান থাকা উচিত।
  4. নীতি শিক্ষার আলাদা ক্লাস বা উপদেশ বিশেষ কার্যকর নয় বরং; পাঠক্রমের মধ্যেই নীতিবোধের উপাদানগুলি সংযুক্ত করে দেওয়া দরকার।
  5. নীতিবোধ এবং প্রকৃত নৈতিক আচরণের মধ্যে সচেতনভাবে সামঞ্জস্য রক্ষা করা উচিত।
  6. খুব ছোট বয়স থেকেই ছাত্রদের কোনটি ঠিক এবং কোনটি ভুল, যেটি ঠিক সেটি কেন ঠিক এবং যেটি ভুল সেটি কেন ভুল তা অতি স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া।
  7. বিদ্যালয়ে মহাপুরুষের জন্মদিন পালন করা।

 

কোহলবার্গ-এর তত্ত্বের সমালোচনা

  1. কোহলবার্গের তত্ত্বটি মূলত নৈতিক বিচার-বিশ্লেষণ বা যুক্তির ওপর আলোকপাত করে; অথচ বাস্তবে কী করা উচিত তা জানা এবং প্রকৃতপক্ষে আমরা কী করি- এর মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
  2. সমালোচকদের মতে, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্বটি ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘নৈতিক সিদ্ধান্ত’-র ধারণার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করে।
  3. এই তত্ত্বটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত অধিকারের ওপর জোর দেয়, যেখানে সমষ্টিবাদী সংস্কৃতি, সমাজ ও সম্প্রদায়ের গুরুত্বকে অগ্রাধিকার দেয় না।
  4. তাঁর গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু, যাদের বিবাহিত জীবনের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। (Heinz dilemma)-র বিষয়টি শিশুদের বোঝার জন্য হয়তো অতিরিক্ত বিমূর্ত ছিল; তাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি পরিচালিত হলে হয়তো ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যেত।
  5. ক্যারল গিলিগান (Carol Gilligan)-সহ কোহলবার্গের সমালোচকরা মনে করেন যে তাঁর তত্ত্বটি লিঙ্গ-পক্ষপাতদুষ্ট ছিল, কারণ তাঁর গবেষণার নমুনায় অংশগ্রহণকারীরা সবাই ছিল পুরুষ।

কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্বটি বিভিন্ন বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। কেবল শিক্ষকই নন, বরং অভিভাবকরাও তাঁদের সন্তানদের নৈতিক বিকাশ বোঝার জন্য এই তত্ত্বটি কাজে লাগাতে পারেন। অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যকার অধিকাংশ সমস্যার মূলে থাকে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব। কোহলবার্গের তত্ত্বের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের আরও ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হন।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. Managal, S.K. Advanced Educational Psychology (2nd ed.). PHI Learning Private Limited, New Delhi.
  2. Aggarwal, J.C. Essential of Educational Psychology (2nd ed.). Vikas Publishing House PVT. LTD., New Delhi.
  3. পাল, গোবিন্দ পদ., মিত্র, গঙ্গারাম। শিখনের মনোবিজ্ঞান। নব প্রকাশনী, কলকাতা।
  4. গুপ্ত, অশোক। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান। সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, কলকাতা।
  5. ঘোষ, সনৎ কুমার। শিখনে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। ক্লাসিক বুকস্, কলকাতা।
  6. ইসলাম, নূরুল। শিক্ষামনোবিদ্যার রূপরেখা। শ্রীধর প্রকাশনী, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *