মনোযোগের ধারণা | Concept of Attention

মনোবিজ্ঞান এবং শিক্ষাবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হল মনোযোগের ধারণা (Concept of Attention)। মনোযোগ বলতে নিছক কোনো কিছু দেখা নয়, বরং অসংখ্য উদ্দীপকের মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট একটিকে সচেতনভাবে গ্রহণ করার এক মানসিক প্রক্রিয়া।
মনোযোগের অর্থ (Meaning of Attention)
ইংরেজি “Attention” কথাটির বাংলা অর্থ হল মনোযোগ। প্রাচীনকালে মনোবিদগণ মনোযোগ-কে মনের একটি বিশেষ গুণ হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং তারা ভাবতেন যে, অনুশীলনের দ্বারা মনোযোগের বিকাশ সাধন করা যায়। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান মনে করেন, মনোযোগ হল মানসিক একটি প্রক্রিয়া। মনোযোগ বলতে বোঝায় কোনো বিষয়ের সাথে মনের যোগকে। উদ্দেশ্য লাভের জন্য যখন কোনো বস্তুকে চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে হাজির করা হয় তখন আমরা তাকে বলি মনোযোগ। মনোযোগের জন্য মন কোনো একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়। আর তার ফলেই আমরা কোনো ঘটনাকে স্পষ্ট ভাবে অনুধাবন করতে পারি।
মনের স্তর (Levels of the Mind)
মনোযোগ সম্পর্কে জানবার আগে সবার প্রথমে আমাদের জানা দরকার মনের স্তর সম্পর্কে। মনোবিদ ফ্রয়েড মনের তিনটি স্তরের কথা বলেছেন। সেগুলি হল- চেতন (conscious mind), প্রাকচেতন (preconscious mind) এবং অবচেতন (unconscious mind)। মনের সর্বপ্রথম স্তরটি হল অবচেতন স্তর, এটি মনের সব থেকে বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থান করে, যা কিছু আমরা মনে করতে চাই না, বা ভুলে যাই সেগুলি সবই অবচেতন স্তরে অবদমিত থাকে। মনের পরবর্তী স্তর হল প্রাকচেতন স্তর, যে বিষয়গুলি আমরা কিছুদিন আগে জেনেছি বা পড়েছি, একটু চেষ্টা করলে যেগুলি মনে করা যাবে সেগুলি প্রাকচেতন স্তরের অন্তর্গত থাকে। এবং এর পরবর্তী মনের স্তরটি হল চেতন স্তর, চেতন স্তর আমাদের মনের খুব সামান্য জায়গা জুড়েই অবস্থান করে, বর্তমানে যে ঘটনাগুলি আমাদের সাথে ঘটছে বা যে ঘটনাগুলি সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল থাকছি সেগুলি চেতন স্তরে অবস্থান করে।
মনোবিজ্ঞানের মতে, মনোযোগ হল এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া যার সাহায্যে আমাদের মন অসংখ্য উদ্দীপকের মধ্যে থেকে একটি বিশেষ উদ্দীপককে বেছে নিয়ে ওই বস্তুটিকে চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে হাজির করে। যতক্ষণ না কোনো বস্তু বা ঘটনা আমাদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে হাজির হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সেই বস্তুতে মনোযোগী হওয়া সম্ভব নয়। তাই মনোযোগ-কে একটি কেন্দ্রানুগ প্রক্রিয়াও বলা হয়।
মনোযোগের সংজ্ঞা (Definition of Attention)
বিভিন্ন মনোবিদগণের দেওয়া মনোযোগ সংক্রান্ত কয়েকটি সংজ্ঞা নিম্নে তুলে ধরা হল-
মনোবিদ রস (Ross) বলেছেন – মনোযোগ হল একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা কোনো বস্তু বা ধারণা স্পষ্ট হয়।
মনোবিদ ভুন্ড (Wundt) বলেছেন – স্পষ্ট ও বিশদ চেতনাই হল মনোযোগ।
মনোবিদ ম্যাকডুগাল (MacDougall) বলেছেন – “Attention is a conation which influences our perception.” অর্থাৎ, মনোযোগ হল একটি মানসিক সক্রিয়তা যা আমাদের প্রত্যক্ষণ-এর উপর প্রভাব বিস্তার করে।
মনোবিদ উডওয়ার্থ (Woodworth) বলেছেন – “Attention is the selective activity of consciousness.” অর্থাৎ, মনোযোগ হল চেতন মনের নির্বাচিত প্রক্রিয়া।
উপরের সংজ্ঞাগুলি বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, মনোযোগ হল একটি মানসিক প্রক্রিয়া যার সাহায্যে আমরা অসংখ্য উদ্দীপকের মধ্যে থেকে একটি উদ্দীপক নির্বাচন করে তার প্রতি সচেতন হয়ে থাকি।
মনোযোগের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Attention)
মনোযোগের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ :
কেন্দ্রানুগ প্রক্রিয়া
মনোযোগের দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু আমাদের চেতনার কেন্দ্রে উপস্থাপিত হয়। চেতনার পরিধি থেকে যে উদ্দীপকটি চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে হাজির হয় সেই উদ্দীপকটির প্রতি আমরা মনোযোগী হই। তাই মনোযোগ-কে কেন্দ্রানুগ প্রক্রিয়া বলা হয়।
নির্বাচনধর্মী
মনোযোগ হল একটি নির্বাচনধর্মী প্রক্রিয়া। কারণ এই প্রক্রিয়ার সাহায্যে আমাদের মন বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে থেকে বিশেষ একটি বিষয় নির্বাচন করে এবং সেই বিষয়ের প্রতি আমাদেরকে মনোযোগী করে তোলে।
পরিবর্তনশীলতা
মনোযোগ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। এটি পেন্ডুলামের মতো সবসময় আন্দোলিত হতে থাকে। অর্থাৎ, এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে সঞ্চালিত হয়। পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে আমাদের মনোযোগ গড়ে, প্রতি ২ সেকেন্ডে স্থানান্তরিত হতে থাকে। তবে উদ্দীপকের শক্তি যত বেশি হবে মনোযোগের পরিবর্তনশীলতার পরিমাণও তত হ্রাস পাবে।
অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া
মনোযোগ হল এক অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া। সব সময় মনোযোগ নতুন নতুন জিনিস অনুসন্ধান করে বেড়ায়। যেখানে নতুনত্ব আছে স্বাভাবিকভাবে আমাদের মন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়।
উদ্দেশ্যমূলক প্রক্রিয়া
মনোযোগ একটি উদ্দেশ্যমূলক প্রক্রিয়া। কোনো অনির্দিষ্ট বস্তুকে সুনির্দিষ্ট এবং কোনো অস্পষ্ট বস্তুকে সুন্দর ও সুস্পষ্ট করে তুলতে সাহায্য করে মনোযোগ।
মনোযোগের পরিসর
আমরা আমাদের ইচ্ছামত যত খুশি তত বস্তুর ওপর একসাথে মনোযোগ দিতে পারি না। কারণ এক সঙ্গে চেতনার কেন্দ্রস্থলে একাধিক বস্তু উপস্থাপন করতে পারি না। ব্যক্তিগত এই সীমাকে বলা হয় মনোযোগের পরিসর। বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে যে আমরা একসময় চার থেকে পাঁচটি বস্তুর প্রতি মনোযোগ দিতে পারি।
ইচ্ছামূলক প্রক্রিয়া
মনোযোগ হল একটি ইচ্ছামূলক প্রক্রিয়া। মনোবিদ ষ্টাউট এর মতে, আমরা যখন কোনো বস্তুকে চেতনার কেন্দ্রীভূত করি তার ফলেই সেই বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
সংশ্লেষণাত্মক ও বিশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়া
মনোযোগ একই সাথে সংশ্লেষণাত্মক ও বিশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়া। যখন আমরা কোনো বস্তুকে খণ্ড খণ্ড অংশে বিশ্লেষণ করে দেখি, তখন মনোযোগ-কে বিশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়া বলা হয়। আর সংশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়া হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার সাহায্যে আমরা বিশ্লেষিত বিষয়গুলিকে একসাথে জুড়ে তার সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা গঠন করি।
প্রচেষ্টামূলক প্রক্রিয়া
কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিতে হলে প্রচেষ্টার দরকার তাই মনোযোগ হল একটি প্রচেষ্টামূলক প্রক্রিয়া। কারণ জানার ইচ্ছা যত তীব্র হবে প্রচেষ্টার মাত্রা তত প্রবল হবে আর তার ফলে মনোযোগ ও তত গভীর হবে।
বিভাজন ধর্মিতা
মনোযোগের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল বিভাজন ধর্মিতা। দুটি ভিন্ন ধর্মী উদ্দীপকের প্রতি মনোযোগ দিতে বলা হলে তখনই মনোযোগের বিভাজন সম্ভব। যেমন- শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের বক্তব্য শুনে সেটা খাতায় লেখা। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে একই সাথে দুটো উদ্দীপকের প্রতি মনোযোগ দিতে হয়।
মনোযোগের শ্রেণীবিভাগ (Classification of Attention)
মনোযোগের প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে শিক্ষাবিদগণ মনোযোগের শ্রেণীবিভাগ করেছেন। মনোবিদ রস (Ross) মনোযোগ-কে মূলত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যথা-
ইচ্ছা প্রণোদিত মনোযোগ
যে সকল মনোযোগ আমাদের ইচ্ছার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাকে ইচ্ছা প্রণোদিত মনোযোগ বলা হয়। এই মনোযোগ-কে আবার ঐচ্ছিক মনোযোগও বলে। এই ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ মানসিক ইচ্ছা বা প্রেরণার তাড়নায় কোনো বিশেষ বস্তুর প্রতি মনোযোগী হই। যেমন- পরীক্ষার সময় ইচ্ছে করেই পড়তে বসা। মনোবিদ রস ইচ্ছা প্রণোদিত মনোযোগ-কে দু’ভাগে ভাগ করেছেন। যথা- গুপ্ত মনোযোগ এবং ব্যক্ত মনোযোগ।
যে মনোযোগের ক্ষেত্রে আমরা অল্প পরিমাণ ইচ্ছে শক্তি প্রয়োগ করে বস্তুর প্রতি মনোযোগী হতে পারি তাকে গুপ্ত মনোযোগ বলে। যেমন- পরীক্ষার সময় পড়ার প্রতি মনোযোগী হওয়া।
অপরদিকে, যে মনোযোগের ক্ষেত্রে বারবার ইচ্ছে শক্তি প্রয়োগ করে কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় তখন তাকে ব্যক্ত মনোযোগ বলে। যেমন- শিক্ষার্থীকে তার অপছন্দের বিষয়টি বারবার পড়তে বলা।
ইচ্ছা-নিরপেক্ষ মনোযোগ
যে মনোযোগ মানুষের ইচ্ছা শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না কিন্তু, মূলত মানসিক সংগঠন দ্বারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তাকে ইচ্ছা-নিরপেক্ষ মনোযোগ বলে। অর্থাৎ, এখানে ইচ্ছাশক্তির কোনো প্রভাব থাকে না। মনোবিদগণ ইচ্ছা-নিরপেক্ষ মনোযোগ-কে আবার দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যথা – আরোপিত বা প্রবৃত্তি প্রসূত মনোযোগ এবং স্বতঃস্ফূর্ত মনোযোগ।
যে সকল মনোযোগ মানুষের প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত হয় তখন তাদের আরোপিত বা প্রবৃত্তি প্রসূত মনোযোগ বলে। যেমন- খিদে পেলে খাদ্য বস্তুর প্রতি মনোযোগী হওয়া।
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের নতুন এক ধরনের জৈব মানসিক সংগঠন তৈরি হয় যাকে আমরা সেন্টিমেন্টও বলে থাকি যে সকল মনোযোগ সেন্টিমেন্ট দ্বারা পরিচালিত অথবা নিয়ন্ত্রিত হয় তাকে স্বতঃস্ফূর্ত মনোযোগ বলে। যেমন- কোনো বস্তু বা ব্যক্তির প্রতি যদি সেন্টিমেন্ট গড়ে ওঠে তাহলে সেদিকে আমাদের মনোযোগ গড়ে ওঠে।
মনোযোগের নির্ধারক (Determinants of Attention)
মনোযোগ হল একটি নির্বাচনধর্মী প্রক্রিয়া। যে শর্ত বা বৈশিষ্ট্যগুলি কোনো বস্তু নির্বাচনে সাহায্য করে। কিংবা যে শর্তগুলির জন্য আমরা কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগী হই, তাদেরকে সাধারণত মনোযোগের নির্ধারক বলা হয়। মনোযোগের নির্ধারক-কে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-
মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারক
অনেক সময় বস্তুর বিশেষ কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্যর জন্য আমাদের মনোযোগ আকর্ষিত হয়, তাকে মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারক বলা হয়। এই ধরনের নির্ধারকগুলি ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারকগুলি হল-
তীব্রতা
কোনো বস্তু বা উদ্দীপকের তীব্রতা আমাদের বস্তুর প্রতি মনোযোগী করে তোলে। যেমন- উজ্জ্বল রং, তীব্র শব্দ সহজেই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
আকার
মনোযোগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেখা যায় যে, ছোট বস্তুর তুলনায় বড় বস্তু তাড়াতাড়ি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। যেমন- সংবাদপত্রের শিরোনাম।
পুনরাবৃত্তি
কোনো উদ্দীপকের পুনরাবৃত্তি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। অনেক সময় কোনো ক্ষুদ্র উদ্দীপকের পুনরাবৃত্তির জন্য আমরা তার প্রতি মনোযোগী হই। যেমন- শিশুর কান্নার শব্দ।
নতুনত্ব
অভিনবত্ব কোনো বিষয়ের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিশেষ। হঠাৎ করে দেখা কোনো নতুন জিনিস সহজেই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। যেমন- অভিনব পোশাক।
গতিশীলতা
স্থির বস্তুর তুলনায় গতিশীল বস্তু সহজেই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। যেমন- চলমান বিজ্ঞাপন।
স্পষ্টতা
কোনো উদ্দীপকের স্পষ্টতা মনোযোগের নির্ধারক হিসেবে কাজ করে। অস্পষ্ট উদ্দীপক কখনই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে না। যেমন- স্পষ্ট হাতের লেখা।
পরিবর্তনশীলতা
আকস্মিক পরিবর্তন আমাদের মনকে সহজেই আকর্ষণ করে। যেমন- শান্ত পরিবেশে হঠাৎ জোরে কোনো শব্দ হলে সেই দিকে মনোযোগ চলে যায়।
বৈসাদৃশ্য
মনোযোগ আকর্ষণের অন্যতম অপর একটি কারণ হল বৈসাদৃশ্য। কোনো দম্পতির ক্ষেত্রে যদি স্ত্রী লম্বা এবং স্বামী বেটে হয় তাহলে সেই বিষয়ের প্রতি আমাদের মনোযোগ চলে যায়।
বিভিন্নতা
একই ধরনের উদ্দীপকের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ আলাদা কোনো উদ্দীপক অবস্থান করলে সেটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। যেমন- শ্রেণীকক্ষে সবথেকে দুষ্টু শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করতে অসুবিধা হয় না।
অবস্থিতি
কোনো বস্তুর বিশেষ অবস্থান আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। যেমন- খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠার খবরগুলি ভিতরে পৃষ্ঠার খবরে তুলনায় বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে।
রং বা বর্ণ
কোনো বস্তু বা উদ্দীপকের রং আমাদের মনোযোগী করে তোলে। যেমন- পরীক্ষক যখন খাতা পরীক্ষা করেন তখন লাল কালি ব্যবহার করেন যেটা সহজেই আমাদের ভুলটাকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
দীর্ঘ-স্থায়িত্ব
কোনো উদ্দীপকের দীর্ঘক্ষণ উপস্থিতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। যেমন- কোনো শিশু যদি দীর্ঘক্ষণ ধরে কান্না করে তবে সেদিকে আমরা মনোযোগী হই।
সুসংবদ্ধতা
বিচ্ছিন্ন বা অসংবদ্ধ জিনিসের থেকে সুসংবদ্ধ জিনিসের প্রতি আমরা মনোযোগ দিয়ে থাকি। যেমন- একটি সুন্দরভাবে গোছানো আলমারি সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক
ব্যক্তি নিজস্ব কিছু গুণ বা বৈশিষ্ট্য বা অভ্যাসের দরুন ব্যক্তি কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগী হয়ে থাকে যাকে মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক বলা হয়। আমাদের আন্তরিক বা আভ্যন্তরীণ মানসিক চাহিদা মনোযোগের বস্তু নির্বাচনে সাহায্য করে। মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক গুলি হল-
আগ্রহ
মনোযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে আগ্রহ এর যথেষ্ট ভূমিকা আছে। যে বস্তুর প্রতি আমাদের আগ্রহ আছে তার প্রতি আমরা সহজেই মনোযোগী হই। যার খেলার প্রতি আগ্রহ আছে সে স্বাভাবিকভাবেই সংবাদপত্রে খেলার পৃষ্ঠায় মনোযোগী হয়।
অভ্যাস
অভ্যাস মনোযোগের একটি ব্যক্তিগত নির্ধারক হিসেবে কাজ করে। অভ্যাসের বসেই আমরা কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগী হয়ে থাকি। যেমন- যাদের সকালে চা খাবার অভ্যাস থাকে সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপের প্রতি তাদের মনোযোগ যায়।
আবেগ
মনোযোগ আবেগের মাধ্যমেও নির্ধারিত হয়। যাকে আমরা ভালোবাসি তার ভালো গুণ গুলির প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষিত হয়।
মন:প্রকৃতি
বিভিন্ন ধরনের মেজাজগত বৈশিষ্ট্য বা মনোপ্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের জন্য মানুষ বিভিন্ন বস্তুর প্রতি মনোযোগ দেয়। যেমন- ধার্মিক মানুষ ধর্মীয় আলোচনার প্রতি মনোযোগী হয়।
প্রবৃত্তি
প্রবৃত্তি হল মনোযোগের অন্যতম ব্যক্তিগত নির্ধারক। প্রবৃত্তির তাড়নায় আমরা অনেক ক্ষেত্রে কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগী হই। যেমন- খিদে পেলে খাদ্য বস্তুর প্রতি মনোযোগী হই।
অভিজ্ঞতা
বিভিন্ন বিষয়গত অভিজ্ঞতা আমাদের মনোযোগ সৃষ্টির একটি ব্যক্তিগত নির্ধারক।
মনোযোগের শিক্ষাগত গুরুত্ব (Education Implication of Attention)
শিক্ষণ ও শিখন প্রক্রিয়ায় মনোযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মনোযোগ ছাড়া শিখন কার্যকর হতে পারে না। এটি শিশুকে বিষয়বস্তু আরও ভালোভাবে অনুধাবন করতে সহায়তা করে। কোনো দক্ষতা অর্জনের জন্য মনোযোগ অপরিহার্য। অধিক মনোযোগ সহকারে পঠিত বিষয়গুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়। সুতরাং, শিখনের ক্ষেত্রে মনোযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনোযোগের শিক্ষাগত গুরুত্ব নিম্নে উল্লেখ করা হল-
- শিক্ষণ-শিখন পরিস্থিতিতে শিক্ষককে অবশ্যই শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে হবে।
- পাঠদানের সময় শিশুদের পূর্ণ মনোযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষককে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
- শিখনের পরিবেশকে সম্ভাব্য সকল প্রকার মনোযোগ-বিঘ্নকারী উপাদানমুক্ত রাখতে হবে।
- মনোযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষককে পাঠদানের প্রতিটি পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করতে হবে।
- প্রয়োজন অনুযায়ী রেখাচিত্র, নকশা এবং ছবি অঙ্কন বা প্রদর্শন করতে হবে।
- দৃশ্য-শ্রাব্য শিক্ষণ উপকরণগুলোর (Audio-visual aids) যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- পাঠদানের সময় শিক্ষককে অঙ্গভঙ্গি, শারীরিক ভঙ্গি, বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ এবং প্রদর্শন পদ্ধতির সহায়তা নিতে হবে।
- শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
- শাস্তির ভয় প্রদর্শন এবং শিক্ষকদের রূঢ় আচরণ পরিহার করতে হবে।
- শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষের সকল শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায়সঙ্গত ও নিরপেক্ষ আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।
আলোচিত পদক্ষেপগুলো শিক্ষণ-শিখন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে মনোযোগ সৃষ্টিতে নিশ্চিতভাবেই সহায়তা করবে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- ঘোষ, সনৎ কুমার। শিখনে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। ক্লাসিক বুকস্, কলকাতা।
- পাল, গোবিন্দ পদ এবং মিত্র, গঙ্গারাম। শিখনের মনোবিজ্ঞান। নব প্রকাশনী, কলকাতা।
- Aggarwal, J.C. Essentials of Educational Psychology (2nd Ed.). Vikas Publishing House PVT LTD., New Delhi.
- Mangal, S.K. Advanced Educational Psychology. PHI Learning Private Limited, New Delhi.
- চট্টোপাধ্যায়, প্রীতিভূষণ। মনোবিদ্যা। মর্ডাণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।


