ফ্রয়েড-এর মনোযৌন বিকাশ তত্ত্ব_লিবিডো | Psychosexual Stages of Development

ফ্রয়েড-এর মনোযৌন বিকাশ তত্ত্ব (Psychosexual Stages of Development) মানব মনের জটিল রহস্য উন্মোচনে এক বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud)-এর মতে, মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ শৈশবের কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের মধ্যদিয়ে ঘটে, যাকে মনোযৌন বিকাশ তত্ত্ব (Psychosexual Development Theory) বলা হয়। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হল লিবিডো (Libido) বা যৌন শক্তি, যা শৈশবে বয়সের সাথে সাথে শরীরের ভিন্ন ভিন্ন সংবেদনশীল অংশে (Erogenous Zone) স্থানান্তরিত হয়।
ফ্রয়েড-এর মনোযৌন বিকাশ তত্ত্ব
মানুষের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে এই প্রশ্নটি মনোবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ও চিরন্তন প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে যাঁরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের মধ্যে সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud) অন্যতম। তিনি মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশকে ব্যাখ্যা করার জন্য যে তত্ত্ব প্রদান করেন, তা হল মনোযৌন বিকাশ তত্ত্ব (Psychosexual Development Theory)। ফ্রয়েড ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে যৌনশক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মানসিক শক্তি বা লিবিডো (Libido) জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশকে কেন্দ্র করে কাজ করে। এই শক্তি যদি কোনো পর্যায়ে যথাযথভাবে সন্তুষ্ট না হয় বা অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে পরবর্তী জীবনে ব্যক্তিত্বে বিভিন্ন সমস্যা বা বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে যাকে তিনি বলেন Fixation। তাঁর মতে, যৌন অনুভূতি বা যৌন চাহিদা ব্যক্তির মৌলিক জৈবিক বৈশিষ্ট্য। এই কাজে দেহের যেসকল অঙ্গগুলি সক্রিয় হয় সেগুলিকে ফ্রয়েড Erogenous zone বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, একটি শিশুর জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন ভাবে তার যৌন ক্ষমতার বিকাশ হয় এবং বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে শিশু যৌন পরিতৃপ্তি লাভ করে।
মনোযৌন বিকাশের পর্যায়সমূহ
ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশকে পাঁচটি প্রধান ধাপে ভাগ করেছেন। যথা-
- মৌখিক পর্যায় (Oral Stage)
- পায়ু পর্যায় (Anal Stage)
- লিঙ্গকেন্দ্রিক পর্যায় (Phallic Stage)
- সুপ্ত পর্যায় (Latency Stage)
- যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক পর্যায় (Genital Stage)
নিম্নে এই স্তরগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল-
মৌখিক পর্যায় (Oral Stage)
এই স্তরটি জন্ম থেকে 1 বছর বয়স পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরে শিশুর যৌন আকাঙ্ক্ষা তার মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে অর্থাৎ কোন জিনিস চুষে, কামড়ে বা চিবিয়ে সে যৌন পরিতৃপ্তি পায়। এই স্তরে শিশুর সংবন্ধন ঘটলে তারমধ্যে ধূমপান, নখ কামড়ানো, কাউকে আঘাত করা ইত্যাদির মতো অপসংগতিমূলক আচরণ দেখা যায়।
পায়ু পর্যায় (Anal Stage)
Anal-এর বাংলা প্রতিশব্দ হল ‘পায়ু’। এই স্তরে লিবিডোর প্রকাশ ঘটে পায়ু এবং মূত্রাশয়ে। এই স্তরটি 1-3 বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরে শিশুরা দেহে মল-মূত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে যৌন পরিতৃপ্তি লাভ করে। এই স্তরের লিবিডোর সংবন্ধন ঘটলে ব্যক্তি উৎশৃঙ্খল ও ছন্নছাড়া হয়।
লিঙ্গকেন্দ্রিক পর্যায় (Phallic Stage)
এই স্তরটি সময়সীমা 3-6 বছর। এই স্তরে লিবিডোর প্রকাশ ঘটে জননেন্দ্রিয়ে। এই বয়সের শিশুদের মধ্যে দুই ধরনের complex দেখা যায়, যেমন- ছেলেদের মায়ের প্রতি ভালোবাসা যাকে বলে Oedipus complex অন্যদিকে মেয়েদের বাবার প্রতি ভালোবাসা যাকে বলে Electra complex.
সুপ্ত পর্যায় (Latency Stage)
এই স্তরটির সময়সীমা 6 বছর থেকে বয়ঃসন্ধিক্ষণ পর্যন্ত। এই স্তরে ব্যক্তির Ego এবং Superego বিকাশ লাভ করে। এই সময়ের শিশুরা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, মেয়েরা মেয়েদের সাথে খেলতে পছন্দ করে সেখানে ছেলেদের দলে নেওয়া হয় না। আবার ছেলেদের ক্ষেত্রেও বিপরীত ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়।
যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক পর্যায় (Genital Stage)
এই স্তরটির বিস্তার বয়ঃসন্ধি থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যন্ত। এই স্তরে সঠিক যৌন ক্ষমতার বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ছেলেমেয়েরা আকর্ষিত হয়, যা স্বাভাবিক যৌন বৈশিষ্ট্য কি ? নির্দেশ করে। এটি পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের সাহায্য করে।
তত্ত্বটির গুরুত্ব ও সমালোচনা
ফ্রয়েডের এই তত্ত্ব আধুনিক মনোবিজ্ঞানে পথপ্রদর্শক হলেও এটি পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নয়, এই কারণে অনেক সমালোচনাও রয়েছে। ফ্রয়েডের তত্ত্বটি মূলত প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের কেস স্টাডির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত; এতে প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা শিশুদের নিয়ে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদী গবেষণালব্ধ প্রমাণের অভাব রয়েছে। অধিকন্তু, মানববিকাশের সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে কেবল যৌনশক্তি বা ‘লিবিডো’-র নিরিখেই ব্যাখ্যা করাকে অনেকেই একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে গণ্য করেন। তবুও শিশু বিকাশ, ব্যক্তিত্ব গঠন, সাইকোথেরাপি এবং অবচেতন মনের ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের অবদান অনস্বীকার্য।
উপসংহার
ফ্রয়েডের মনোবৈজ্ঞানিক যৌন বিকাশ তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলো মানুষের ব্যক্তিত্বের ওপর এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। যদিও আধুনিক মনোবিজ্ঞান এই তত্ত্বটিকে এখন আরও পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে, তবুও মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি আজও একটি মাইলফলক হিসেবেই গণ্য হয়। একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন অভিভাবক কিংবা সচেতন পাঠক হিসেবে এই তত্ত্ব আমাদের মানুষকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- সরকার, অধ্যাপক (ড.) বিজন। শিক্ষা মনোবিদ্যা। আহেলি পাবলিশার্স, কলকাতা।
- পাল, ড. দেবাশিষ। প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণে শিশু শিক্ষা। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।
- https://www.bdpsychologist.com/
- https://www.psychologynoteshq.com/





