শিখন সম্পর্কে গেস্টাল্ট মতবাদ | Gestalt Theory of Learning

আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘গেস্টাল্ট শিখন তত্ত্ব’ (Gestalt Theory of Learning) একটি বৈপ্লবিক ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জার্মান মনোবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়ার্দিমার (Max Wertheimer), উলফগ্যাং কোহলার (Wolfgang Kohler) এবং কার্ট কফকা (Kurt Koffka)-র কাজের মধ্য দিয়ে এই তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। ‘প্রচেষ্টা ও ভুল’ (trial and error) কিংবা মুখস্থ অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রথাগত তত্ত্বগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেস্টাল্ট মনোবিদগণ প্রমাণ করেন যে, শিখন কেবল অন্ধ অনুকরণ নয়; বরং এটি একটি সচেতন মানসিক প্রক্রিয়া, যার মধ্যে উদ্দীপক ও পরিস্থিতির সামগ্রিক প্রকৃতি বা রূপ অনুধাবন করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
গেস্টাল্ট-এর অর্থ
শিখন সংক্রান্ত ‘গেস্টাল্ট তত্ত্ব’ (Gestalt theory) যা ‘অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে শিখন’ (Learning by insight) নামেও পরিচিত মূলত জার্মান মনোবিজ্ঞানীদের অবদান, যারা প্রত্যক্ষণের (Perception) প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ম্যাক্স ওয়ার্দিমার (১৮৮০–১৯৪৩) ছিলেন গেস্টাল্ট মনোবিজ্ঞানের জনক।
ওয়ার্দিমার সাথে যুক্ত অন্যান্য জার্মান মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন উলফগ্যাং কোহলার এবং কার্ট কফকা। গেস্টাল্ট শিখন তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রত্যক্ষণের বিষয়গুলোকে একটি ‘সমগ্র’ বা ‘গেস্টাল্ট’ হিসেবে অনুভব করা হয়। এই তত্ত্বের মূল কথা হল, শিখন কোনো এলোমেলো ধাপ, ‘প্রচেষ্টা ও ভুল’ (trial and error) পদ্ধতি বা ‘অনুবর্তন’ (conditioning)-এর মাধ্যমে ঘটে না; বরং এটি অন্তর্দৃষ্টি, আত্ম-পর্যবেক্ষণ এবং উপলব্ধির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
গেস্টাল্ট মনোবিজ্ঞান মূলত প্রত্যক্ষণের প্রকৃতি নিয়ে কাজ করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো বস্তুকে বিচ্ছিন্ন অংশের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি ‘সমগ্র’ সত্তা হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন। এখানে শিখন-কে একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ, অনুসন্ধানমূলক, কল্পনাপ্রসূত এবং সৃজনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, যেখানে শিক্ষার্থী সমগ্র পরিস্থিতিটি বিবেচনা করে।
গেস্টাল্ট তত্ত্বের মূল ধারণা
গেস্টাল্ট মনোবিজ্ঞানীরা তাদের বেশিরভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান প্রত্যক্ষণের স্বরূপ নির্ণয়ে। এবং এইসব পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁরা প্রত্যক্ষণজনিত সংগঠনের কিছু নীতি গড়ে তোলেন। এইসব সূত্র বা নীতিগুলি বিশ্লেষণে গেস্টাল্ট তত্ত্বের মূল ভাবনাটি ফুটে ওঠে। কয়েকটি সূত্র বা নীতি নিম্নে আলোচনা করা হল-

Pragnanz-এর সূত্র (Law of Pragnanz)
Pragnanz-এর সূত্রকে প্রায়শই “সরলতার সূত্র” (Law of Simplicity) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই নীতি অনুযায়ী, যখন ব্যক্তি কোনো অস্পষ্ট বা জটিল আকৃতি কিংবা বিন্যাসের মুখোমুখি হন, তখন সেই ব্যক্তির মস্তিষ্ক সেটিকে সম্ভাব্য সবচেয়ে সরল রূপে ব্যাখ্যা করে। অলিম্পিক লোগো এর একটি উদাহরণ। লোগোটির দিকে তাকিয়ে সেটিকে কেবল বাঁকানো ও পরস্পর সংযুক্ত রেখার সমষ্টি হিসেবে না দেখে; বরং সেটিকে আংশিকভাবে একে অপরের ওপর উপরিপাতিত (overlapping) কয়েকটি বৃত্তের সারি হিসেবে দেখায়।
আকৃতি-পটভূমি (Figure-Ground)
‘Figure-Ground’ বা ‘আকৃতি-পটভূমি’ নীতিটি হল কোনো পটভূমি থেকে মূল বস্তু বা ধারণাকে আলাদা করে চিনে নেওয়ার সক্ষমতা। Special Educational Needs and Disabilities (SEND) সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বিশৃঙ্খল দৃশ্যমান বিন্যাস, কম বৈপরীত্যের (low-contrast) ফন্ট এবং আলংকারিক বর্ডার মূল কাজটিকে অস্পষ্ট করে তুলতে পারে। রুবিনের ফুলদানির (Rubin’s vase) উদাহরণটি এই ধারণাটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে: দর্শক হয় দুটি মুখমণ্ডল অথবা একটি ফুলদানি দেখতে পান, কিন্তু একই সাথে দুটিই দেখতে বা উপলব্ধি করতে পারেন না।
সাদৃশ্যের সূত্র (Law of Similarity)
সাদৃশ্যের সূত্র অনুযায়ী, অন্যান্য সব বিষয় অপরিবর্তিত থাকলে, একে অপরের সাথে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ উদ্দীপকগুলোকে সাধারণত একটি দল বা গোষ্ঠীভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই, অসদৃশ বিষয়ের তুলনায় সদৃশ বিষয়গুলো শেখা সহজতর।
নৈকট্যের সূত্র (Law of Proximity)
নৈকট্যের সূত্র অনুযায়ী, প্রত্যক্ষণ বা উপলব্ধির সময় উপাদানগুলোর পারস্পরিক নৈকট্য বা স্থানিক সান্নিধ্যের ওপর ভিত্তি করেই সেগুলোকে দলভুক্ত করা হয়। এর অর্থ হল, কাছাকাছি অবস্থিত বিষয়গুলোকে আমরা একটি একক দল বা ইউনিট হিসেবে প্রত্যক্ষ করি।
সম্পূর্ণতার সূত্র (Law of Closure)
সম্পূর্ণতার সূত্রটি বলে যে, বদ্ধ বা পূর্ণাঙ্গ আকৃতিগুলো অধিকতর স্থিতিশীল এবং তাই প্রত্যক্ষণের সময় সহজেই একটি সুনির্দিষ্ট ও শনাক্তযোগ্য রূপ বা কাঠামো গঠন করে। এটি থর্নডাইকের ‘ফললাভের সূত্র’ (Law of Effect)-এর অনুরূপ। কোনো কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তি সন্তুষ্টি বোধ করেন না; তিনি এক ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন এবং কাজটি শেষ হলেই কেবল সেই চাপের উপশম ঘটে।
ধারাবাহিকতার সূত্র (Law of Continuity)
এই সূত্র অনুযায়ী, যদি কোনো প্রত্যক্ষণের বিন্যাস বা সংগঠনকে একটি নির্দিষ্ট অভিমুখে অগ্রসর হতে দেখা যায়, তবে সেটিকে সেই একই অভিমুখে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ, প্রত্যক্ষণের বিন্যাস বা সংগঠনগুলোর মধ্যে দিক-নির্দেশনা, গতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা আরোপ করার একটি প্রবণতা কাজ করে।
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের তত্ত্ব
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন তত্ত্ব হল গেস্টাল্ট মতবাদের সবচেয়ে প্রধান এবং ব্যবহারিক রূপ। এই তত্ত্বটিকে সাধারণত আমরা কোহলারের তত্ত্ব বলেই জানি। গেস্টাল্ট মতবাদের মূল ভিত্তি হল অন্তর্দৃষ্টি (Insight)। এই অন্তর্দৃষ্টির জন্য প্রয়োজন দুটি মানসিক প্রক্রিয়ার- পৃথকীকরণ (Differentiation) এবং সামান্যীকরণ (Generalisation)। ‘পৃথকীকরণ’ (Differentiation) হল এমন এক মানসিক ক্ষমতা, যার মাধ্যমে কোনো জটিল পরিস্থিতি বা সমস্যা থেকে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোকে বর্জন করে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোকে আলাদা করা যায়। অন্যদিকে, ‘সাধারণীকরণ’ (Generalization) হল পৃথকীকৃত উপাদানগুলোর মধ্যে কোনো সাধারণ সূত্র, সাদৃশ্য বা যৌক্তিক সম্পর্ক খুঁজে বের করা এবং সেই অভিজ্ঞতাকে একটি সর্বজনীন নিয়মে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া।
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন সম্পর্কে কোহলারের পরীক্ষা
কোহলার এবং কফকা শিম্পাঞ্জিদের ওপর অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন এবং ১৯২৫ সালে “Mentality of Apes” নামে একটি বই প্রকাশ করেন (যা ১৯১৩ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল ছিল)। এই পরীক্ষাগুলো প্রমাণ করে যে, শিখন কোনো ‘প্রচেষ্টা ও ভুল’ পদ্ধতির ফল নয়, বরং তা অন্তর্দৃষ্টি এবং কোনো পরিস্থিতিতে জড়িত বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। কোহলার ১৯১৩-১৭ সালের মধ্যে শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তার মধ্যে থেকে দুটি পরীক্ষার বর্ণনা নিচে দেওয়া হল-
Experiment- 1
তাঁর একটি পরীক্ষায়, কোহলার ‘সুলতান’ নামের একটি শিম্পাঞ্জিকে একটি বড় খাঁচায় আটকে রাখেন। খাঁচার বাইরে কিছুটা দূরে একটি কলা রাখা ছিল। খাঁচার ভেতরে দুটি লাঠি ছিল একটি লম্বা এবং অন্যটি কিছুটা ছোট। ছোট লাঠিটিকে লম্বা লাঠির সাথে জুড়ে দেওয়া বা সংযুক্ত করা সম্ভব ছিল। শুধু লম্বা লাঠিটি দিয়ে কলা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব ছিল না, কিন্তু সেটির সাথে ছোট লাঠিটি জুড়ে দিলে ফলটি স্পর্শ করা সম্ভব হতো। সুলতান কলাটি পাওয়ার চেষ্টা করল। সে লম্বা লাঠিটি দিয়ে কলাটির নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ফলটি স্পর্শ করতে ব্যর্থ হল। অন্য লাঠিটি ছিল আরও ছোট। সে বসে পড়ল এবং লাঠিগুলো নিয়ে খেলা করতে লাগল, যদিও তখনও সে সমস্যাটি নিয়ে ভাবছিল। হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি এল। সে লম্বা লাঠির ফাঁপা প্রান্তের ভেতর ছোট লাঠিটি ঢুকিয়ে দিল এবং জোড়া লাগানো লাঠিটি ব্যবহার করে কলাটিকে নাগালের মধ্যে নিয়ে এল।
Experiment- 2
এই পরীক্ষায় শিম্পাঞ্জিটিকে এমন একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল যার দেওয়াল বেয়ে ওঠা অসম্ভব ছিল। ছাদ থেকে একটি কলার কাঁদি ঝুলছিল। প্রাণীটি ক্ষুধার্ত ছিল। ফলটি নাগাল পাওয়ার জন্য সে লাফ দিল, কিন্তু সেটি অনেক উঁচুতে ছিল। ব্যর্থ হয়ে সে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ল। ঘরের এক কোণে একটি বাক্স পড়ে ছিল। প্রাণীটি বাক্সটি নিয়ে খেলা করতে শুরু করল। এরপর হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল, বাক্সটিকে ঠেলে ঘরের মাঝখানে ঠিক কলার নিচে নিয়ে এল এবং বাক্সের ওপর দাঁড়িয়ে ফলটি ধরার জন্য লাফ দিল। এবং শেষ পর্যন্ত কলার কাঁদির নাগাল পেয়ে গেলো।

গেস্টাল্টবাদীদের মতে, প্রাণীরা সবসময় ভুল প্রচেষ্টার মাধ্যমে শেখে না যেমনটা থর্নডাইক মনে করতেন। কোনো সমস্যার সামগ্রিক রূপ বা পরিস্থিতিটি পুরোপুরি অনুধাবন করার পরেই কেবল তারা সমস্যার-সমাধান করতে পারে। তাঁদের মতে, এই বোধ বা উপলব্ধি হঠাৎ করেই ঘটে এবং একবার আয়ত্ত হয়ে গেলে তা সহজে বিস্মৃত হয় না। তাই গেস্টাল্টবাদীরা শিখন-পরিস্থিতির বিন্যাস এবং এর বিভিন্ন অংশের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের বোঝাপড়ার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। গেস্টাল্ট তত্ত্বের মূল কথা হল, আমরা কোনো পরিস্থিতিকে খণ্ড খণ্ড অংশে নয়, বরং একটি সামগ্রিক ক্ষেত্র বা পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবেই প্রত্যক্ষ করি ও তার প্রতি সাড়া দিই। এই সামগ্রিক উপলব্ধির মাধ্যমেই পরিস্থিতির প্রকৃত অর্থ বা তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের বৈশিষ্ট্য
অন্তর্দৃষ্টি যেসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে কিংবা অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-
- শিক্ষার্থী পরিস্থিতিটিকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করে।
- শিক্ষার্থী পরিস্থিতি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করে।
- এই সম্পর্কগুলো অনুধাবন করার মাধ্যমে শিক্ষার্থী হঠাৎ করেই সমস্যার সমাধানটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।
- অতীতের অভিজ্ঞতা কোনো সমস্যা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভে সহায়তা করে।
- অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সাধারণ বুদ্ধিমত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
- সাধারণত দেখা যায় যে, শিখন পরিস্থিতিতে যখন পর্যবেক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে, তখনই অন্তর্দৃষ্টির উদয় হয়।
- ‘প্রচেষ্টা ও ভুল’ (trial and error)-এর মাধ্যমে গৃহীত প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলোই অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের পথ প্রশস্ত করে।
- কোনো একটি পরিস্থিতিতে অর্জিত শিখন শিক্ষার্থীকে অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিতে অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ আচরণ করতে সহায়তা করে।
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের সোপান
অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন বা গেস্টাল্ট শিখন প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। সেই ধাপ বা সোপানগুলি হল-
- শিক্ষার্থী সমস্যাটির সমগ্র পরিস্থিতিকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করে;
- সে সমস্যাটির মূল উদ্দেশ্যের প্রতি সামগ্রিক সাড়া দেয়;
- পরিস্থিতির বিভিন্ন অংশের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে সে একটি সুসংহত কাঠামো বা বিন্যাস গড়ে তোলে;
- পৃথকীকরণ ও সাধারণীকরণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থী সমস্যাটির অন্তর্নিহিত সূত্র বা মূল বিষয়টি অনুধাবন করে;
- সর্বশেষ ধাপে শিক্ষার্থীরা হঠাৎ তাদের আচরণ পরিবর্তন করে আর এটাই হল অন্তর্দৃষ্টি।
শিক্ষাক্ষেত্রে গেস্টাল্ট তত্ত্বের প্রয়োগ
আধুনিক শিক্ষাক্ষেত্রে গেস্টাল্ট মতবাদ বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এই তত্ত্বটি নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণি শিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
- কোনো বস্তুর সামগ্রিক রূপ তার অংশগুলোর সমষ্টির চেয়েও অধিক অর্থবহ বা গুরুত্বপূর্ণ। তাই, শিক্ষকদের উচিত কোনো বিষয় বা উপ-বিষয়কে প্রথমে সামগ্রিকভাবে উপস্থাপন করা। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, ফুলের বিভিন্ন অংশ শেখানোর সময়, শিক্ষককে প্রথমে শিক্ষার্থীদের সামনে সম্পূর্ণ ফুলটি তুলে ধরতে হবে এবং এরপর এর পৃথক অংশগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে। একইভাবে, কোনো কবিতাও শুরুতে সামগ্রিকভাবে পড়ানো যেতে পারে।
- এই তত্ত্বটি মুখস্থবিদ্যা বা যান্ত্রিক শিখন পদ্ধতিকে বর্জন করে। এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেয়। শিক্ষার্থীদের এমন পরিস্থিতিতে রাখা উচিত যেখানে তারা আবিষ্কারকের ভূমিকা পালন করতে পারে। বিভিন্ন প্রশ্ন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য তাদের প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় কেবল ‘কী’ বা ‘কখন’-এর পরিবর্তে ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’-র ওপর মূল গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শিক্ষকের কাছ থেকে সরাসরি তৈরি তথ্য গ্রহণ বা ‘স্পুন-ফিডিং’ (spoon-feeding) কখনোই গঠনমূলক ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটায় না। এর পরিবর্তে, প্রগতিশীল ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেমন- অনুসন্ধানভিত্তিক পদ্ধতি (heuristic approach), বিশ্লেষণধর্মী চিন্তন এবং সমস্যা-সমাধান পদ্ধতির প্রয়োগ করা উচিত।
- পাঠ্য বিষয়বস্তুকে কেবল বিচ্ছিন্ন তথ্যের সমষ্টি হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এই উপাদানগুলোকে একটি সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে নিবিড়ভাবে সমন্বিত করা যেতে পারে। একইভাবে, পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত বিষয় ও কার্যকলাপের মধ্যে ঐক্য ও সামঞ্জস্য বজায় থাকা প্রয়োজন।
- শিশুর মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ জাগিয়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। কোনো কাজ শুরু করার আগে, শিশুটিকে সেই কাজের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়া এবং সেগুলোর সাথে পরিচিত করা উচিত।
গেস্টাল্ট তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
গেস্টাল্ট তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা হল-
- বলা হয়ে থাকে যে, সব ধরনের শিখনই অন্তর্দৃষ্টির (insight) ফল নয়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনেক অভিজ্ঞতাই অন্তর্দৃষ্টির পরিবর্তে আকস্মিক ও তাৎক্ষণিক অনুষঙ্গ বা সংযোগ থেকে উদ্ভূত হয়।
- অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনের ক্ষেত্রেও ‘প্রচেষ্টা ও ভুল’ (trial and error) পদ্ধতির মাধ্যমে শেখার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না; কারণ ভুল থেকে শেখার প্রক্রিয়াটিও এখানে ভূমিকা রাখে।
- সব শিশু স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম নয়; যারা ধীরগতিতে শেখে, তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে নির্দেশনার প্রয়োজন হতে পারে।
- অনেক ক্ষেত্রে নিয়মকানুন যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করারও প্রয়োজন পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, গেস্টাল্ট মনোবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অবদান হল প্রত্যক্ষণ (perception), বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যকার সম্পর্ক অনুধাবন এবং সামগ্রিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করা। এটি সবকিছু হাতে ধরে শিখিয়ে দেওয়া এবং তোতাপাখির মতো মুখস্থ করার ভূমিকার নিন্দা করে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- Managal, S.K. Advanced Educational Psychology (2nd ed.). PHI Learning Private Limited, New Delhi.
- Aggarwal, J.C. Essential of Educational Psychology (2nd ed.). Vikas Publishing House PVT. LTD., New Delhi.
- পাল, গোবিন্দ পদ., মিত্র, গঙ্গারাম। শিখনের মনোবিজ্ঞান। নব প্রকাশনী, কলকাতা।
- গুপ্ত, অশোক। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান। সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, কলকাতা।
- ঘোষ, সনৎ কুমার। শিখনে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। ক্লাসিক বুকস্, কলকাতা।
- ইসলাম, নূরুল। শিক্ষামনোবিদ্যার রূপরেখা। শ্রীধর প্রকাশনী, কলকাতা।






