মাদকাসক্তি বলতে কী বোঝো? | What do you mean by Drug Abuse?

মাদকাসক্তি বলতে কী বোঝো? (What do you mean by Drug Abuse?) আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্র যা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। মূলত, মাদকাসক্তি বলতে ক্ষতিকর সব নেশাজাতীয় দ্রব্যের ওপর কোনো ব্যক্তির তীব্র শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতাকে বোঝায়। এটি এমন এক অভিশাপ যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকাসক্তি কেবল একজন ব্যক্তির জীবনই ধ্বংস করে না, বরং এটি পুরো পরিবার ও সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। তাই মাদকাসক্তির সাধারণ লক্ষণ এবং কারণগুলি আজকের সময়ে সকলের জেনে রাখা প্রয়োজন।
মাদকাসক্তির ধারণা
মাদকাসক্তি বর্তমান সমাজ জীবনের এক অতি জটিল সমস্যা। এটি জেলা, রাজ্য কিংবা দেশের সমস্যা নয়, এটি এখন আন্তর্জাতিক সমস্যা রূপে চিহ্নিত হয়েছে। দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং ভাবী নাগরিকদের জীবন রক্ষায় ভারতের মানব সম্পদ মন্ত্রক ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাদকাসক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রূপে বর্ণনা করেছে।
সাধারণত মাদক দ্রব্য হল এমন একটি পদার্থ, যা অল্পমাত্রায় গ্রহণ করলে দেহে এবং মনে নানান বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়ে থাকে, এবং এছাড়া এমন কিছু মাদক রয়েছে যা ব্যক্তির জীবনে প্রতিষেধক রূপে কিংবা সাময়িক নিরাময় প্রদান করে থাকে। কিন্তু এই মাদক দ্রব্য প্রতিদিন গ্রহণ করলে তার প্রতি আসক্তি জন্মায়। বস্তুত, মাদক হল এমন একটি পদার্থ যেটি প্রতিদিন গ্রহণ করলে, তার প্রতি আসক্তি জন্মায় এবং এই আসক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের মানসিক বিকার দেখা দেয়।
একাকীত্ব, অবসাদ, কেরিয়ারে ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, বন্ধুবিচ্ছেদ, প্রেমে আঘাত ইত্যাদি নানান কারণে যেমন মানুষ ড্রাগের নেশায় পড়ে তেমনি নিছক কৌতূহলের বশে বা মজা করার ঝোঁকে (Fun loving) কমবয়সী ছেলে-মেয়েরা ড্রাগের নেশার কবলে পড়ে।
ড্রাগ বা মাদক দ্রব্য গ্রহণের ফলে ব্যথা দূর হয় (কেউ কেউ বলেন শারীরিক আবার কেউ কেউ বলেন শারীরিক ও মানসিক তবে, আদেও মানসিক ব্যথা দূর হয় কি না তা নিয়ে অনেকের মনে দ্বন্দ্ব আছে, তবে হ্যাঁ কিছু সময়ের জন্য ব্যথার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়), খিদে লাগা বা সাধারণ জৈবিক প্রবৃত্তিগুলো দমন করা যায় এবং নিদ্রাচ্ছন্নতা বোধ হয়। এর ফলে মাদক সেবনকারী ব্যক্তি তার নিজস্ব পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাময়িকভাবে কল্পনার জগতে বিচরণের আনন্দ উপভোগ করে থাকে। সে বাস্তব জগতের বেদনা, কামনা, অতৃপ্ত হতাশা সব কিছুকে কাটিয়ে এক কাল্পনিক মানসিক পরিতৃপ্তি লাভ করে।
মাদকের ধরন
মাদক বা ড্রাগ প্রধানত ছয় প্রকার। যথা-
- চেতনা-নাশক এবং বেদনা উপশমকারী। যেমন- আফিম, মরফিন, হেরোইন, পেথিডাইন (Pethidine)
- উত্তেজক মাদকদ্রব্য। যেমন- কোকেন, অ্যামফেটামিন, ক্যাফেইন।
- অবসাদ সৃষ্টিকারী মাদক। যেমন- ডাইজেপাম, ক্লোনাজেপাম, ট্রায়াজোলাম।
- উত্তেজনা প্রশমনকারী ড্রাগ। যেমন- ডাইজেপাম, টেমাজেপাম, আলপ্রাজোলাম।
- বিভ্রম সৃষ্টিকারী মাদক। যেমন- LSD, ক্যানাবিস (গাঁজা, হাসিস, ভাং, মারিজুয়ানা)।
- প্রশ্বাসের সাথে গৃহীত বা বাষ্প জাতীয় মাদক। যেমন- থিনার, সিগারেট, পেন্ট, আঠা, নেইল পলিশ রিমুভার।
মাদকাসক্তির লক্ষণ
বয়স, সামাজিক সন্মান ও প্রতিপত্তি, আর্থিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে ড্রাগ ব্যবহারকারীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মায়েরা মনে করেন আমাদের পরিবারের ছেলে/মেয়েরা এমন কাজ করতেই পারে না, সেক্ষেত্রে তাঁরা ভুল করবেন। এই নেশা যেকোনো কাউকে যেকোনো সময়েই আঁকড়ে ধরতে পারে। এর সাধারণ কিছু লক্ষণগুলি হল-
- কর্মক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজে বিনা কারণে কামাই।
- পড়াশোনায় ক্রমশ ফল খারাপ করা।
- যেকোনো কাজেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলা।
- মিথ্যে বলা, টাকা বা দামি জিনিস চুরি যাওয়া/হারিয়ে যাওয়া।
- পারিবারিক কাজে অংশ না নেওয়া, ভুলে যাওয়া।
- সাজপোশাক, পরিচ্ছন্নতা ব্যাপারে লক্ষ্য না থাকা।
- একা থাকা, বাথরুমে বা গোপনস্থানে বেশী সময় কাটানো।
- নতুন নতুন বন্ধু পাতানো ও রহস্যজনক আচরণ করা।
মাদকাসক্তির কারণ
পারিবারিক সচেতনতার অভাব, মানসিক হতাশা এবং সঙ্গদোষ মাদকাসক্তির প্রধান কারণ। প্রায়শই তরুণ প্রজন্ম কৌতূহলবশত কিংবা সমবয়সীদের চাপে পড়ে মাদক গ্রহণ শুরু করে, যা পরবর্তীতে মারাত্মক আসক্তির রূপ নেয়। এছাড়া পারিবারিক কলহ, একাকীত্ব, বেকারত্ব, প্রেমের ব্যর্থতা বা অন্যান্য মানসিক চাপ থেকে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার ভুল উপায় হিসেবেও অনেকে মাদকের আশ্রয় নেয়। একই সঙ্গে, মাদকের সহজলভ্যতা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব সমাজে এই মরণঘাতী ব্যাধির বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
এই ড্রাগের নেশা ক্রমশ মারাত্মক আকার ধারণ করার আগেই বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এর পেছনে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও ড্রাগ ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক লাভ জড়িত এরা কাউকে ড্রাগ-এর নেশা ছাড়তে দিতে চায় না। কাজেই পরিবারের সদস্যদের উচিত এই বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- https://www.cancer.gov/publications/
- https://www.mayoclinic.org/
- https://journalajmah.com/
- https://medlineplus.gov/






