শিখনের অপারেন্ট বা সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব | Operant Conditioning Theory of Learning

শিখনের অপারেন্ট বা সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব (Operant Conditioning Theory of Learning) শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের আচরণবাদী ধারায়, মানুষের ও প্রাণীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ও অত্যন্ত প্রভাবশালী মতবাদ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৩৮ সালে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী বি.এফ. স্কিনার (B.F. Skinner) প্যাভলভের ‘ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং’ বা ‘প্রাচীন অনুবর্তন’ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাগুলো বিবেচনা করে এই নতুন তত্ত্বটি প্রবর্তন করেন। স্কিনারের মতে, কোনো প্রাণী পরিবেশের উদ্দীপকের প্রতি কেবল নিষ্ক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না; বরং সে পরিবেশের সাথে সক্রিয়ভাবে মিথস্ক্রিয়া করে এবং নিজের কাজের ফলাফল যেমন পুরস্কার বা শাস্তির ওপর ভিত্তি করে নতুন নতুন আচরণ আয়ত্ত করে। এই নিবন্ধে স্কিনারের বিখ্যাত তত্ত্ব, ‘স্কিনার বক্স’ ব্যবহার করে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এর ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব (Theory of Operant Conditioning)
স্কিনার তাঁর তত্ত্বের নাম দিয়েছিলেন ‘অপারেন্ট কন্ডিশনিং’ (Operant Conditioning) বা ‘সক্রিয় অনুবর্তন’, কারণ এটি এমন কিছু নির্দিষ্ট কাজ বা কার্যকলাপের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যা কোনো জীবকে সম্পন্ন করতে হয়। ‘অপারেন্ট’ শব্দটি এই বিষয়টির ওপর জোর দেয় যে, কোনো আচরণ সৃষ্টি শুধুমাত্র উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার সাযুজ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, বহুক্ষেত্রে আচরণ পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে এবং এর ফলে নিজস্ব কিছু ফলাফল বা পরিণতির সৃষ্টি হয়। ‘অপারেন্ট’ বলতে এমন একগুচ্ছ কাজকে বোঝায় যা কোনো জীবকে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনের জন্য প্রস্তুত (Condition) করে তোলে। সক্রিয় অনুবর্তন প্রক্রিয়ায়, ‘রিইনফোর্সমেন্ট’ বা ‘শক্তিদায়ক সত্তা’র মাধ্যমে সক্রিয় প্রতিক্রিয়াগুলোকে পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত করা হয়। শক্তিদায়ক সত্তা হল অনুবর্তনের একটি বিশেষ দিক, যেখানে কোনো প্রয়োজন বা তাড়না (Drive) হ্রাসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো উদ্দীপকের (Stimulus) প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রবণতা বৃদ্ধি করা হয়।
অধিকাংশ S-R (উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়া) তত্ত্ববিদ মনে করেন যে, প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির জন্য উদ্দীপকের উপস্থিতি একটি পূর্বশর্ত। বাহ্যিক উদ্দীপকের অনুপস্থিতিতেও তাঁরা ধরে নেন যে, প্রতিক্রিয়াটি ঘটানোর জন্য কোনো অভ্যন্তরীণ উদ্দীপক কাজ করছে। স্কিনার এই “no stimulus–no response” তত্ত্বের বিরোধিতা করেন; তিনি বিশ্বাস করতেন যে, অধিকাংশ প্রতিক্রিয়াকেই কোনো শনাক্তযোগ্য উদ্দীপকের সাথে যুক্ত করা সম্ভব নয়। তিনি দুই ধরনের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন- শনাক্তযোগ্য উদ্দীপক দ্বারা সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া, যা ‘রেসপন্ডেন্ট’ (Respondent) বা ‘রিফ্লেক্সিভ’ (Reflexive) আচরণ নামে পরিচিত; এবং কোনো শনাক্তযোগ্য উদ্দীপক ছাড়াই উদ্ভূত প্রতিক্রিয়া, যা ‘অপারেন্ট’ (Operant) আচরণ নামে পরিচিত।
রেসপন্ডেন্ট আচরণ প্যাভলভীয় অনুবর্তন (Pavlovian Conditioning) মডেল অনুযায়ী শেখা হয়। যেহেতু এটি কোনো উদ্দীপকের সাথে যুক্ত, তাই একে ‘S-টাইপ কন্ডিশনিং’ বলা হয়। স্কিনার অপারেন্ট আচরণের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন; যেহেতু এটি উদ্দীপকের পরিবর্তে মূলত প্রতিক্রিয়ার সাথেই সংশ্লিষ্ট, তাই একে ‘R-টাইপ কন্ডিশনিং’ বলা হয়। এক্ষেত্রে পরীক্ষকের প্রধান সমস্যা হল জীবের সম্ভাব্য কাজের ভাণ্ডার থেকে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়াটি বের করে আনা এবং কার্যকরভাবে সেটিকে শক্তিশালী করা (Reinforce) করা। এভাবেই স্কিনার প্রচলিত ‘S-R’ সূত্রটিকে ‘R-S’ সূত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন।
স্কিনারের পরীক্ষা (Skinner’s Experiments)
স্কিনারের প্রাথমিক পরীক্ষামূলক কাজগুলো ইঁদুর নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল; একটি বিশেষ খাঁচায় (যা ‘স্কিনার বক্স’ (Skinner box) নামে পরিচিত) ইঁদুরগুলো খাবার পাওয়ার জন্য একটি লিভার বা দণ্ডে চাপ দিত। সময়ের সাথে সাথে এই গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়, এর আওতায় অন্যান্য প্রাণী ও মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং মূল প্রেক্ষাপট থেকে ভিন্ন নানা পরিস্থিতি ও আচরণ (যেমন- ‘শিক্ষণ যন্ত্র’ বা ‘Teaching Machines’) নিয়ে কাজ করা হয়। স্কিনারের শিখন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই প্রোগ্রাম শিখন (Programmed Learning)-এর ধারণাটি গড়ে উঠেছিল।
স্কিনার এমন একটি বাক্স তৈরি করেছিলেন যাতে একটি লিভার (Lever) এবং একটি খাবারের পাত্র (Tray) ছিল। লিভারটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেটি চাপ দেওয়া যায়। তিনি একটি ক্ষুধার্ত ইঁদুরকে সেই বাক্সের ভেতর রাখতেন; বাক্সের ভেতর ঘোরাঘুরির সময় ইঁদুরটি মাঝেমধ্যে লিভার বা দণ্ডটিতে চাপ দিত। লিভারটি চাপামাত্রই খাবারের একটি টুকরো পাত্রে এসে পড়ত। যেহেতু খাবারের টুকরোটি ইঁদুরের আচরণকে শক্তিশালী বা সুদৃঢ় (Reinforce) করত, তাই সেটি দ্রুতই বারবার লিভার চাপার বিষয়টি শিখে নিত। পরবর্তীতে স্কিনার এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন আনেন: খাবারের টুকরোটি কেবল নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হতো অর্থাৎ, কেবল তখনই খাবার পাওয়া যেত যখন লিভার চাপার পাশাপাশি একটি বিশেষ শব্দ বা ‘টোন’ (Tone) বাজানো হতো; অন্য সময়ে লিভার চাপলে কোনো খাবার পাওয়া যেত না। বিষয়টি বুঝতে পেরে ইঁদুরটি সাধারণীকরণের (Generalization) মাধ্যমে বিষয়টি আয়ত্ত করে নেয় এবং যখনই সেই বিশেষ শব্দটি বা টোনটি বাজত, তখনই সে লিভারটি চাপতে শুরু করত।

স্কিনার তাঁর গবেষণায় পায়রাকেও পরীক্ষাধীন প্রাণী হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন; এক্ষেত্রে ‘অপারেন্ট’ বা কাঙ্ক্ষিত আচরণ ছিল একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঠোকর দেওয়া, যা শক্তিদায়ক সত্তা বা উদ্দীপক-ফললাভের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করত। তিনি মানুষের ওপরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন, যেখানে সমস্যা সমাধানের বিষয়টি ছিল ‘অপারেন্ট’ আচরণ। বাক্সের ভেতর রাখা ইঁদুরগুলোর মতোই পায়রাদের ক্ষেত্রেও খাদ্য শক্তিদায়ক সত্তা হিসেবে কাজ করত; আর মানুষের ক্ষেত্রে সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া কিংবা মৌখিক অনুমোদন লাভ ছিল শক্তিদায়ক সত্তা। যদিও শুরুর দিকের শক্তিদায়ক সত্তাগুলো তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর ছিল, তবুও সময়ের সাথে সাথে সাড়া প্রদানের হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
সক্রিয় অনুবর্তনের নীতিসমূহ (Principles of Operant Conditioning)
সক্রিয় অনুবর্তন প্রক্রিয়া সাথে বেশ কিছু কার্যকলাপ জড়িত থাকে। অর্থাৎ, সক্রিয় অনুবর্তন কিছু কৌশলের মধ্য দিয়ে সাধিত হয়। যা সম্বন্ধে নিম্নে বিস্তারিত তুলে ধরা হল-
শেপিং (Shaping)
‘শেপিং’ বা আচরণ গঠন হল অপারেন্ট কন্ডিশনিং বা সক্রিয় অনুবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোনো প্রাণীর আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট ও নির্বাচিত আচরণের জন্য সচেতনভাবে ‘শক্তিদায়ক সত্তা’ (reinforcement) বা উদ্দীপক ব্যবহার করা হয়। শেপিং-এর মূল প্রক্রিয়াটি হল ধাপে ধাপে successive approximation-এর মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত আচরণটি অর্জন করা। কুমোর যেমন কাদা দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো পাত্রের আকৃতি তৈরি করেন, ঠিক তেমনই একজন পরীক্ষক কোনো প্রাণীর আচরণকে নির্দিষ্ট রূপ দেওয়ার জন্য তা গঠন বা পরিবর্তন করেন। এই প্রক্রিয়ায় একাধিক সক্রিয় আচরণ যুক্ত হয়ে একটি শক্তিশালী শৃঙ্খলের সৃষ্টি করে, এক্ষেত্রে সৃষ্ট শৃঙ্খলটি হল-
S1 (অজানা উদ্দীপক) → R1 (সক্রিয় প্রতিক্রিয়া) → S2 (শক্তিদায়ক উদ্দীপক) → R2 (স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া)
শেপিং-এর সাথে জড়িত নীতিসমূহ : সফলভাবে আচরণ গঠনের প্রক্রিয়ায় তিনটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক নীতি কাজ করে। এগুলো হল-
- সাধারণীকরণ (Generalization);
- অভ্যাসের প্রতিযোগিতা (Habit competition);
- আচরণগত শৃঙ্খল বা ক্রমের প্রতিটি অংশকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা (Each segment in the chain must be linked to the other)।
বিলুপ্তি (Extinction)
‘বিলুপ্তি’ বলতে বোঝায় কোনো আচরণের ক্ষেত্রে শক্তিবর্ধক উদ্দীপক প্রদান না করার ফলে সেই আচরণটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। প্রেষণার ক্ষেত্রে এটিকে ‘বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি’ (external approach) বলা হয়।
স্বতঃস্ফূর্ত পুনরুদ্ধার (Spontaneous Recovery)
শক্তিদায়ক সত্তার অনুপস্থিতি বা কোনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের বাধার কারণে কোনো প্রতিক্রিয়া বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে; তবে পরবর্তীতে সেই প্রতিক্রিয়াটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুনরায় দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে বিলুপ্তি সাময়িক হয়ে থাকে।
শক্তিদায়ক সত্তা (Reinforcement)
Reinforcer বা শক্তিবর্ধক হল এমন যেকোনো ঘটনা যা কোনো আচরণের ঠিক পরপরই ঘটে এবং সেই আচরণকে শক্তিশালী বা বৃদ্ধি করে। শক্তিদায়ক সত্তা দুই ধরনের হতে পারে:
ইতিবাচক শক্তিবর্ধক (Positive Reinforcers)
এগুলো হল এমন অনুকূল ঘটনা বা ফলাফল যা কোনো আচরণের পরে উপস্থাপন করা হয়। ইতিবাচক শক্তিবর্ধকের ক্ষেত্রে, প্রশংসা বা সরাসরি পুরস্কারের মতো কোনো কিছু যুক্ত করার মাধ্যমে কোনো প্রতিক্রিয়া বা আচরণকে শক্তিশালী করা হয়।
নেতিবাচক শক্তিবর্ধক (Negative Reinforcers)
কোনো আচরণ প্রদর্শনের পর কোনো প্রতিকূল ঘটনা বা ফলাফল সরিয়ে ফেলার বিষয়টি এর অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে, অপ্রীতিকর বলে বিবেচিত কোনো কিছু অপসারণের মাধ্যমে কোনো প্রতিক্রিয়াকে শক্তিশালী করা হয়।
শক্তিবর্ধকের উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট আচরণটি বৃদ্ধি পায়।
শাস্তি (Punishment)
শাস্তি (Punishment) হল এমন কোনো প্রতিকূল ঘটনা বা ফলাফল উপস্থাপন করা যা সংশ্লিষ্ট আচরণকে হ্রাস করে। শাস্তি আচরণকে দুর্বল করে দেয়। শাস্তি দুই ধরনের হতে পারে, যথা-
ইতিবাচক শাস্তি (Positive Punishment)
যাকে প্রায়শই Punishment by application বলা হয় এক্ষেত্রে কোনো প্রতিক্রিয়াকে দুর্বল করার জন্য একটি প্রতিকূল ঘটনা বা ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
নেতিবাচক শাস্তি (Negative Punishment)
যা Punishment by removal নামেও পরিচিত। তখন ঘটে যখন কোনো আচরণ সংঘটিত হওয়ার পর কোনো অনুকূল ঘটনা বা ফলাফল সরিয়ে নেওয়া হয়।
শক্তিদায়ক উদ্দীপক উপস্থাপনের সময়সূচি (Schedules of Reinforcement)
এই বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে স্কিনার শক্তিদায়ক সত্তার নিম্নলিখিত কার্যকর সময়সূচিগুলো চিহ্নিত করেছেন:
নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক শক্তিদায়ক সত্তা (Fixed-Interval Reinforcement)
একটি নির্দিষ্ট সময়ের অন্তরে যে রিইনফোর্সমেন্ট বা শক্তিদায়ক সত্তা প্রদান করা হয়, তাকে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক শক্তিদায়ক সত্তা বলা হয়।
নির্দিষ্ট অনুপাতভিত্তিক শক্তিদায়ক সত্তা (Fixed-Ratio Reinforcement)
নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিক্রিয়ার পর যে শক্তিদায়ক সত্তা প্রদান করা হয়, তাকে নির্দিষ্ট অনুপাতভিত্তিক শক্তিদায়ক সত্তা বলা হয়।
পরিবর্তনশীল সময়ভিত্তিক/অনুপাতভিত্তিক শক্তিদায়ক সত্তা (Variable-Interval/Ratio Reinforcement)
পরিবর্তনশীল সময়ের অন্তরে বা পরিবর্তনশীল সংখ্যক প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে যে শক্তিদায়ক সত্তা প্রদান করা হয়, তাকে পরিবর্তনশীল সময়ভিত্তিক/অনুপাতভিত্তিক শক্তিদায়ক সত্তা বলা হয়।
যখনই কোনো নির্দিষ্ট আচরণ বা প্রতিক্রিয়া ঘটে তখনই যদি তার জন্য শক্তিদায়ক সত্তা (Reinforcement) প্রদান করা হয়, তবে সেই আচরণটি দ্রুত আয়ত্ত করা সম্ভব হয়; কিন্তু শক্তিদায়ক সত্তার সরবরাহ বন্ধ করে দিলে আচরণটি সহজেই বিস্মৃত হয়ে যায়। বিপরীতক্রমে, যদি বিভিন্ন সংখ্যক প্রতিক্রিয়ার পর বা অনিয়মিত সময়ের ব্যবধানে শক্তিদায়ক সত্তা প্রদান করা হয়, তবে সেই আচরণটি সহজে বিলুপ্ত হয় না।
অপারেন্ট অনুবর্তনে শক্তিদায়ক সত্তা দুই ধরনের, যথা- উদ্দীপক বিভেদকরণ (stimulus discrimination) এবং প্রতিক্রিয়া বিভেদকরণ (response discrimination)। উদ্দীপক বিভেদকরণ ঘটে তখন, যখন দুটি উদ্দীপকের মধ্যে একটির প্রতি নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখানো হয় কিন্তু অন্যটির প্রতি নয়। অন্যদিকে, প্রতিক্রিয়া বিভেদকরণ (বা পার্থক্যকরণ) ঘটে তখন, যখন পরিস্থিতির সাথে মানানসই করার জন্য প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা হয়।
স্কিনারের তত্ত্বের শিক্ষাগত তাৎপর্য (Educational Implications of Skinner’s Theory)
সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্বের শিক্ষাগত তাৎপর্য নিম্নরূপ:
- শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলো আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা উচিত।
- উদ্দেশ্যগুলোকে এমন একটি ক্রম বা ধারায় সাজানো উচিত যা সরল থেকে জটিলের দিকে অগ্রসর হয়।
- শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বা অনুপ্রেরণা সৃষ্টির জন্য উদ্দীপক বা ‘শক্তিদায়ক সত্তা’ যেমন- প্রশংসা, তিরস্কার, গ্রেড ইত্যাদির ব্যবহার করা উচিত।
- ইতিবাচক ও নেতিবাচক অঙ্গভঙ্গির যথাযথ ব্যবহারও শিখন প্রক্রিয়ায় উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।
- কাঙ্ক্ষিত আচরণটি যাতে বিলুপ্ত হয়ে না যায়, তা রোধ করতে উদ্দীপকের প্রয়োগ সুশৃঙ্খল হওয়া প্রয়োজন।
- শ্রেণিকক্ষের পরিবেশে immediacy of reinforcement-র নীতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করার ঠিক পরেই প্রাপ্ত প্রশংসা অনেক পরে দেওয়া গ্রেডের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী উদ্দীপক বা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে।
- স্কিনারের শিখন নীতিগুলো ব্যক্তির নিজস্ব গতিতে শিখনের বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে। স্কিনারের প্রতিষ্ঠিত শিখন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই ‘শিক্ষণ যন্ত্র’ (teaching machines) এবং ‘প্রোগ্রাম শিখন’ (programmed learning)-এর মতো উদ্ভাবনগুলো গড়ে উঠেছে।
সক্রিয় অনুবর্তন-এর সীমাবদ্ধতা (Limitations of Operant Conditioning)
সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা হল-
- প্রাণীদের ওপর নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল সামাজিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মানুষের ওপর একইভাবে প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
- সমালোচকদের মতে, ভাষা সম্পর্কিত মানসিক প্রক্রিয়ার বিকাশে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ গঠনগত ও বংশগত বিষয়গুলোকে স্কিনার উপেক্ষা করেছেন।
- সক্রিয় অনুবর্তন-এর ‘Reinforcement’ বা ‘শক্তিদায়ক সত্তা’ ব্যবস্থাটি মানুষের সৃজনশীলতা, কৌতূহল এবং স্বতঃস্ফূর্ততার মতো বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়।
- স্কিনারের মতে, মানুষের সমস্ত আচরণই জীবনকালে অর্জিত হয়; ফলে এতে বংশগতির ভূমিকাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
- মানসিক প্রক্রিয়াকে যান্ত্রিক করে তোলার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করায়, স্কিনারের শিখন তত্ত্বটি শিখন প্রক্রিয়াকে যান্ত্রিক করে তোলে।
- শিখনের সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্বটি মনের গভীরতা বা অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে বিবেচনায় নেয় না; তাই এটি প্রকৃতিগতভাবে কৃত্রিম।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- Managal, S.K. Advanced Educational Psychology (2nd ed.). PHI Learning Private Limited, New Delhi.
- Aggarwal, J.C. Essential of Educational Psychology (2nd ed.). Vikas Publishing House PVT. LTD., New Delhi.
- গুপ্ত, অশোক। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান। সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, কলকাতা।
- ঘোষ, সনৎ কুমার। শিখনে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। ক্লাসিক বুকস্, কলকাতা।
- ইসলাম, নূরুল। শিক্ষামনোবিদ্যার রূপরেখা। শ্রীধর প্রকাশনী, কলকাতা।
- চক্রবর্তী, প্রণব কুমার এবং ব্যানার্জী, দেবশ্রী। শিক্ষার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।






