খেলা ও কাজের ধারণা এবং খেলাভিত্তিক শিক্ষা বা পদ্ধতি | Concepts of Play and Work and Play-way Method

খেলা এবং কাজ দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এদের সার্থক সমন্বয়ে জন্ম নিয়েছে ‘খেলাভিত্তিক শিক্ষা’ (Concepts of Play and Work and Play-way Method) যা আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
প্রত্যহ নিজ বিদ্যালয় বা অফিসে যাওয়ার পথে, আমরা সবাই দেখতে পাই নানান মানুষজন তাদের নিজ নিজ কাজ বা পেশার উদ্দেশ্যে রাস্তায় ছুটে চলেছে। দোকানপাট খুলছে, জীবিকা নির্বাহের তাগিদে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত রয়েছে। একইভাবে, আমরা এও দেখতে পাই যে, আমাদের যে সকল বন্ধুবর্গ যারা কোনো ক্রীড়া একাডেমিতে যোগ দিয়েছে, তারা প্রতিদিন অনুশীলনে যাচ্ছে যাতে তারা তাদের পছন্দের খেলাটিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কাজ ও খেলা আমাদের জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজ ও খেলার মধ্যে ভারসাম্যই হল সাফল্যের চাবিকাঠি।
খেলার ধারণা
‘খেলা’ বলতে শিশুদের এমন সব কার্যকলাপকে বোঝায়, যা তাদের মনে আনন্দ ও প্রফুল্লতার সঞ্চার করে। এটি মূলত এমন সব স্বতঃস্ফূর্ত ও আনন্দদায়ক কার্যকলাপের সমষ্টি, যা শিশুদের আচরণগত, সামাজিক এবং মনোপেশীজ (psychomotor) বিকাশে সহায়তা করে।
খেলা হল একটি স্ব-নির্বাচিত, অভ্যন্তরীণ ভাবে অনুপ্রাণিত এবং আনন্দদায়ক কার্যকলাপ, যা শিশুর বিকাশের জন্য অপরিহার্য; এটি সেই প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যার মধ্যেদিয়ে শিশুরা তার চারপাশের জগতকে অন্বেষণ করে, শেখে এবং জগত সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা গড়ে তোলে। শৈশবের “কাজ” হিসেবে প্রায়শই বর্ণিত এই খেলা স্বাধীনতা, কল্পনাশক্তি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের দ্বারা বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত- যা শিশুর প্রজ্ঞামূলক, সামাজিক এবং প্রাক্ষোভিক দক্ষতা বিকাশে সহায়ক।
খেলার সংজ্ঞা
বিভিন্ন শিক্ষাবিদগণ বিভিন্নভাবে খেলার সংজ্ঞা দিয়েছেন, যার মধ্যে থেকে কয়েকটি নিম্নে তুলে ধরা হল-
নান (Nunn)-এর মতে, “Play is a profound manifestation of creative activity.” অর্থাৎ, খেলা হল সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুগভীর প্রকাশ।
স্টার্ন (Stern)-এর মতে, “Play as, a kind of voluntary self-constrained activity.” অর্থাৎ, খেলা হল এক ধরনের স্ব-প্রণোদিত ও স্ব-নিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ।
ম্যাকডুগাল (MacDougal)-এর মতে, “Play is the outcome of primal libido.” অর্থাৎ, খেলা হল ব্যক্তির জীবনীশক্তির বহিঃপ্রকাশ।
স্ট্যানলি হল (Stanley Hall)-এর মতে, “Play is the purest expression of heredity.” অর্থাৎ, খেলা হল বংশগতির বিশুদ্ধতম প্রকাশ।
খেলার বৈশিষ্ট্য
- খেলার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল সক্রিয়তা। শিশুরা খেলার সময়, পরিবেশ, বিভিন্ন উপকরণ এবং অন্যান্য মানুষের সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে খেলাধুলায় তাদের শরীর ও মনকে কাজে লাগায়।
- খেলায় শিশুরা অজানা বা নতুন ধারণাগুলো অন্বেষণ করে। যখন শিশুরা দুঃসাহসিক বা ঝুঁকিপূর্ণ ‘ভান-করা’ (pretend) খেলায় মগ্ন হয়, তখন তারা একটি নিরাপদ বলয়ের (safety net) সীমানার মধ্যেই নিরাপদে এই ধারণাগুলো যাচাই বা অন্বেষণ করতে সক্ষম হয়।
- খেলা শিশুদের তথ্য ও জ্ঞান বিনিময়ের একটি স্বাভাবিক সুযোগ করে দেয়। শিশুরা মৌখিকভাবে অর্থাৎ শব্দ ব্যবহার করে কিংবা; তাদের শরীর, অঙ্গভঙ্গি এবং অন্যান্য অ-মৌখিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে; আর এই বার্তাগুলো হতে পারে অত্যন্ত সাধারণ কিংবা বেশ জটিল।
- খেলা মানেই আনন্দ! শিশুরা যখন খেলে, তখন সে তা উপভোগ করে; খেলার মাধ্যমে বা খেলার ভেতরেই তারা প্রায়শই উত্তেজনা ও হাস্যরসের সন্ধান পায়।
- খেলা শিশুদের তাদের চারপাশের জগতকে বুঝে নেওয়ার বা অর্থ অনুধাবনের সুযোগ করে দেয়। খেলার মাধ্যমে শিশুরা তাদের দেখা ও শোনা বিষয়গুলো অর্থাৎ, তারা যা জানে এবং যা এখনো জানে না সেগুলোকে নিজেদের মতো করে বিশ্লেষণ ও আত্মস্থ করে। এই অভিজ্ঞতাগুলো শিশুদের তাদের বর্তমান জ্ঞানের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে।
- যদিও শিশুদের জন্য অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য হলেও একাকী বা স্বাধীনভাবে খেলাটা স্বাস্থ্যকর ও প্রয়োজনীয়, তবুও খেলা শিশুদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার এবং অন্যান্য শিশু ও বড়দের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি অনন্য ও গঠনমূলক সুযোগ তৈরি করে দেয়।
- শিশুরা খেলার মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিকা, অনুভূতি, আচরণ এবং পারস্পরিক সম্পর্কগুলো যাচাই করে দেখতে পারে; এমনকি কোনো ঘটনার অর্থ অনুধাবনের জন্য তারা সেই ঘটনাগুলোকে পুনরায় অভিনয় বা পুনরাবৃত্তিও করতে পারে।
- খেলাধুলা আনন্দদায়ক, আকর্ষণীয় এবং অর্থবহ হয়ে ওঠে, তখন তা শিশুদের জন্য অত্যন্ত প্রশান্তিদায়ক বা থেরাপিউটিক হিসেবে কাজ করতে পারে। শিশুদের মানসিক চাপ লাঘব করার এবং বিভিন্ন আবেগ ও অভিজ্ঞতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে খেলাধুলা একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও কার্যকর উপায় হতে পারে।
- খেলা হল একটি স্ব-নির্বাচিত ও স্বতঃস্ফূর্ত কার্যকলাপ, যা শিশুরা নিজেদের ইচ্ছামতো স্বাধীনভাবে পরিবর্তন, পরিমার্জন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শিশুরা তাদের খেলার গল্প, চরিত্র, উপকরণ, ঘটনা, স্থান এবং উদ্দেশ্য ইচ্ছামতো পরিবর্তন করবে এবং করা উচিতও।
- খেলার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল যে খেলা শিশুদের সম্মুখে অন্তর্জাত শৃঙ্খলা-বোধকে মূর্ত করে তোলে।
- খেলা শিশুর সর্বাঙ্গীণ ও সর্বোত্তম বিকাশে সহায়ক।
কাজের ধারণা
‘কাজ’ বলতে এমন কোনো কার্যসম্পাদনকে বোঝায়, যার জন্য শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় এবং যার উদ্দেশ্য হল অর্থ উপার্জন করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা। প্রতিটি শিল্পখাতে বিশেষায়িত দক্ষতার ক্ষেত্রগুলো প্রতিনিয়ত প্রসারিত হওয়ার ফলে কাজের সুযোগও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিনেতা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, শিক্ষক এবং আইনজীবী এরা হলেন এমন পেশাজীবীদেরই কয়েকটি উদাহরণ।
খেলা এবং কাজের মধ্যে পার্থক্য
‘কাজ’-কে এমন এক ক্লান্তিকর শারীরিক বা মানসিক প্রচেষ্টা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যার লক্ষ্য হল বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে এমন কোনো উদ্দেশ্য অর্জন করা যা ব্যক্তি বা সমাজের কাছে মূল্যবান। অন্যদিকে, ‘খেলা’-কে এমন কোনো কার্যকলাপ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে, যা কোনো ব্যক্তির কাছে আনন্দদায়ক ও চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয়। আধুনিক শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুর আগ্রহ, প্রবণতা, সক্ষমতা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই কারণেই শিক্ষাকে অনেক সময় ‘খেলাভিত্তিক’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। কারণ, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করাটাই হল শিশুদের সহজাত প্রবণতা। আর শিশুদের এই সহজাত প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েই শিক্ষাব্যবস্থাকে খেলাভিত্তিক করে তোলার ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এর কারণ হল, নিছক কোনো ‘কাজের’ মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হলে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে পরতে পারে কিংবা শিখনের প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
শিক্ষাক্ষেত্রে ‘খেলা’ এবং ‘কাজ’ হল দুটি পরস্পরবিরোধী ধারণা। খেলা এবং কাজের মধ্যেকার পার্থক্যকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায়; যা নিম্নে তুলে ধরা হল-
| বিষয়বস্তু | খেলা | কাজ |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | খেলার সংজ্ঞায় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নান (Nunn) বলেছেন, খেলা হল সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুগভীর প্রকাশ। | কাজ হল এমন একটি কার্যকলাপ যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনে। |
| উদ্দেশ্য | খেলার উদ্দেশ্য হল শিশুর জন্য আনন্দ ও তৃপ্তি বয়ে আনা। | কাজের উদ্দেশ্য হল অর্থ উপার্জন করা কিংবা কিছু উৎপাদন করা। অর্থাৎ, কাজের পেছনে কোনো না কোনো প্রত্যাশা থাকে। |
| বৈশিষ্ট্য | খেলার বৈশিষ্ট্য হল- স্বাভাবিক বা সহজাত প্রবণতা, স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ, আনন্দদায়ক ইত্যাদি। | কাজের বৈশিষ্ট্য হল- বস্তুগত উদ্দেশ্য, নিয়ন্ত্রিত আচরণ, উৎপাদনমুখী ইত্যাদি। |
| নিয়মনীতি | খেলার কিছু সুনির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত নিয়ম রয়েছে, তবে সেগুলোর প্রকৃতি নমনীয়। | কর্মক্ষেত্রের নিয়মাবলী পূর্বনির্ধারিত এবং প্রকৃতিগতভাবে অনমনীয় বা কঠোর। |
| প্রকৃতি | খেলা প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন ও শিশুকেন্দ্রিক। | কাজটি সম্পূর্ণ বস্তুভিত্তিক। |
| উপযোগিতা | খেলার মাধ্যমেই শিশুদের সৃজনশীলতার বিকাশ সম্ভব। | কাজের মাধ্যমেই কোনো ব্যক্তির উৎপাদনশীলতা বা অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সম্ভব হয়। |
| নেতিবাচক আবেগ | খেলার মাধ্যমে রাগ বা ক্ষোভের সৃষ্টি হয় না। অন্যথায়, খেলা শিশুর মনে ক্ষোভের উদ্রেক করে না; কারণ এটি আনন্দদায়ক। তবে শিশুকে যদি খেলা থেকে বিরত রাখা হয়, তবে তার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হতে পারে। | তবে মাঝে মাঝে কাজের মাধ্যমেই নেতিবাচক আবেগের সৃষ্টি হয়। |
| অবসাদ বা ক্লান্তি | খেলার মাধ্যমে শিশুরা ক্লান্তি বোধ করে না। | কোনো ব্যক্তি বা শিশু কাজ করে সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। |
খেলাভিত্তিক শিক্ষা
খেলার ছলে শিক্ষাদান পদ্ধতি বা খেলাভিত্তিক শিক্ষা হল একটি নমনীয় পদ্ধতি যা শিশুর আগ্রহ এবং প্রবণতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই পদ্ধতি শিশুকে তার ভাব প্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। এই পদ্ধতিতে গৃহের অ্যাসাইনমেন্ট (home assignments) বা কাজের মতো কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে শিশুদের গ্রেডিং বা নম্বর দেওয়া হয় না। এর পরিবর্তে, শিক্ষকরা শিশুর দক্ষতা ও যোগ্যতা মূল্যায়ন করেন এবং সময়ে সময়ে অভিভাবকদের কাছে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেন। সারা ভারতের প্রাক-বিদ্যালয়গুলিতে খেলাভিত্তিক শিক্ষাদান পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।
অন্যান্য পাঠক্রম থেকে ধারণা নিয়ে বা উদ্ভাবনী নির্দেশাবলী ব্যবহার করে শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী খেলাভিত্তিক শিক্ষাদান পদ্ধতিকে পরিবর্তন করা যেতে পারে। মন্তেসরি এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার অন্যান্য পদ্ধতিও এই পদ্ধতির সাথে সমন্বয় করা যেতে পারে। তবে, প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করলে তা খুব সহায়ক হয়। প্রাক-বিদ্যালয় প্রশিক্ষক শংসাপত্রের মাধ্যমে এই পদ্ধতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা যায়। কোনো বিদ্যালয় যদি তার প্রাক-বিদ্যালয় পাঠক্রমে এই পদ্ধতিটি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, তবে তাকে এই পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাঠামো প্রস্তুত করতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে, খেলাভিত্তিক শিক্ষা বা play-way method শিশুদের শিক্ষা প্রদানের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পদ্ধতি। শিশুরা তাদের বাড়ি ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসে এবং শিক্ষক ও অন্যান্য শিশুদের মতো ভিন্ন একদল মানুষের মাঝে থেকে শিক্ষা আহরণ করে।
শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে ‘play-way’ বা খেলাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতিটি মূলত ক্যাল্ডওয়েল কুক (Caldwell Cook)-এর দার্শনিক চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর মতে, কোনো ভালো কাজ সাধারণত জোরজবরদস্তি বা বাধ্য হয়ে করা প্রচেষ্টার চেয়ে বরং স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ এবং স্বাধীন আগ্রহের মাধ্যমেই অধিকতর সফলভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে। খেলা বিষয়টি কেবল কোনো একটি একক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়; বরং এটি এমন একগুচ্ছ বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি, যার মূল ভিত্তি হল সেইসব উদ্দেশ্য বা মানসিক কাঠামো যা খেলার সময় দৃশ্যমান আচরণের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল থাকে।
খেলাভিত্তিক পদ্ধতির নীতিসমূহ
- খেলাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতিটি কার্যকলাপ-ভিত্তিক (Activity Based) শিক্ষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে; এটি সৃজনশীল দক্ষতা এবং আত্মপ্রকাশে সহায়ক।
- এই পদ্ধতিটি জীবনমুখী; এটি বিদ্যালয়কে শিশুদের জন্য দ্বিতীয় বাড়ির মতো করে তোলে।
- শিশুদের বিবিধ চাহিদা পূরণ ও বৃদ্ধি করা যায়।
- এটি শিশু ও শিক্ষকদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনে।
- উপযুক্ত শিখন পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক।
- স্মৃতিশক্তিকে উন্নত করে।
- সকল শিশুকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়।
খেলাভিত্তিক শিক্ষার বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
যে সকল শিক্ষাদান পদ্ধতিতে খেলাভিত্তিক শিক্ষার বিভিন্ন নীতি অনুসৃত হয়। সেগুলি হল-
- প্রকল্প পদ্ধতি (Project Method)
- কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতি (Kindergarten Method)
- মন্টেসরি পদ্ধতি (Montessori Method)
- বুনিয়াদি শিক্ষা (Basic Education)
- ডাল্টন পদ্ধতি (Dalton Method)
বিভিন্ন খেলাভিত্তিক কার্যক্রম
যে সকল কার্যক্রমের মধ্যেদিয়ে খেলাভিত্তিক শিক্ষা পরিচালিত হয়। সেগুলি হল-
- নাটকীয় অভিনয় (Dramatic Play)
- খেলাধুলা (Games)
- টেলিভিশন দেখা (Watching the Television)
- প্রকল্প কাজ (Projects)
- বিশেষ দিবস উদযাপন (Celebration of Days)
- শিক্ষামূলক ভ্রমণ ও পরিদর্শন (Educational Tours and Excursion)
খেলাভিত্তিক পদ্ধতির সুবিধা
খেলাভিত্তিক পদ্ধতির (Play-way Method) সুবিধা হল-
- খেলা শিশুদের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই, শিশুরা এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। এটি তাদের মনে আনন্দ ও তৃপ্তি এনে দেয়।
- খেলাভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ শিখন প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়।
- এই পদ্ধতি শিশুদের পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণের সুযোগ-কে সুনিশ্চিত করে।
- খেলাভিত্তিক শিক্ষা কেবল শিশুদের জ্ঞান ও দক্ষতাকেই বিকশিত করে না, বরং তাদের মানসিক ও বৌদ্ধিক স্তরে গভীর তৃপ্তিবোধ জাগিয়ে তোলে।
- খেলাভিত্তিক শিক্ষা শিশুদের মধ্যে আত্ম-শৃঙ্খলার ভিত্তি স্থাপন করে।
- শিশুদের আত্মোপলব্ধি ও মননশক্তির সার্থক সমন্বয়ে শিখনে অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করে।
খেলাভিত্তিক পদ্ধতির অসুবিধা
খেলাভিত্তিক পদ্ধতির (Play-way Method) অসুবিধা হল-
- খেলাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতিটি কেবল প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্যই অধিকতর উপযোগী।
- এই পদ্ধতির মাধ্যমে সকল বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা সম্ভব নয়।
- বহুক্ষেত্রে শিশুরা খেলাভিত্তিক শিক্ষার চেয়ে খেলাধুলাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
- খেলাভিত্তিক শিক্ষা সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয় বহুল।
- এই পদ্ধতির সার্থক প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে।
বর্তমানে, ‘খেলাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি’ (Play-way method)-এর গুরুত্ব এবং শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে এর উপযোগিতা অনুধাবন করে, প্রাক-বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই এটি প্রবর্তন করা হয়েছে। সুপরিকল্পনা এবং শিক্ষকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাই এই পদ্ধতির প্রয়োগকে সফল করে তোলে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
- হালদার, গৌরদাস., শর্মা, প্রশান্তকুমার। শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষানীতি। ব্যানার্জী পাবলিশার্স, কলকাতা।
- নূরুল, ইসলাম। শিক্ষাতত্ত্বের রূপরেখা। শ্রীধর প্রকাশনী, কলকাতা।
- চন্দ, বিনায়ক। শিক্ষার প্রারম্ভিক ধারণা ও দার্শনিক ভিত্তি। আহেলি পাবলিশার্স, কলকাতা।
- ব্যানার্জী, কে। শিক্ষাবিজ্ঞান। বাণী প্রকাশন, কলকাতা।






