শিখনের ধারণা ও বৈশিষ্ট্যাবলী | Concept and Characteristics of Learning

শিখনের ধারণা ও বৈশিষ্ট্য (Concept and Characteristics of Learning) মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় শিখছি, যা আমাদের আচরণ ও চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনে। সহজ কথায়, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ফলে আচরণে যে তুলনামূলক স্থায়ী পরিবর্তন আসে যার মাধ্যমে আমরা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম হই তাই হল শিখন। শিখন প্রক্রিয়াটি মানবসভ্যতার অগ্রগতি এবং ব্যক্তির নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধির পেছনে একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

 

শিখনের অর্থ

শিখন জীবনের একটি স্বাভাবিক ও সাধারণ অভিজ্ঞতা; সকল জীবই শেখে। এটি মানুষের আচরণের একটি মৌলিক প্রক্রিয়া। সাধারণত, এই প্রক্রিয়াটি জন্মলগ্নে শুরু হয় এবং মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সচেতন বা অবচেতনভাবে শৈশব থেকেই শিখন প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটে। শিখনকে এক ধরনের ব্যক্তিগত বিকাশ বা রূপান্তর হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে, যা কোনো ব্যক্তির আচরণ ধারায় পরিবর্তন আনে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে শিখন হল সবচেয়ে অপরিহার্য উপাদান; বস্তুত, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান হল মানুষের সেই আচরণেরই অধ্যয়ন যা শিখনের মাধ্যমে পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত হয়। পরিবেশের সংস্পর্শে আসার মুহূর্ত থেকেই একটি শিশু শিখতে শুরু করে, এটি এমন একটি বিষয় যা জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়। শিখনের পরিস্থিতিগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নিত্যনৈমিত্তিক; মানুষ যখন সচেতনভাবে কোনো কিছু শেখার চেষ্টা করে না, তখনও তারা প্রতিনিয়ত নতুন কিছু না কিছু শিখতে থাকে।

আমাদের জীবনে শিখনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অধিকাংশ কাজ বা কোনো কাজ থেকে বিরত থাকাও, আমরা কী শিখেছি এবং কীভাবে শিখেছি, তার দ্বারা প্রভাবিত হয়। এভাবেই শিখন একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও আচরণের ভিত্তি গড়ে তোলে। মানুষ জন্মের পরপরই, কিংবা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে, মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অবস্থাতেই শিখতে শুরু করে। একেবারে শুরু থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতা মানুষের আচরণ গঠন ও পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিশু যদি জ্বলন্ত দিয়াশলাই কাঠি স্পর্শ করে, তখন তার হাত পুড়ে যায় এবং দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়। পরের বার যখন সে কোনো জ্বলন্ত দিয়াশলাই কাঠির মুখোমুখি হয়, তখন সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেকে সরিয়ে নেয়। সে কেবল জ্বলন্ত দিয়াশলাই কাঠিই নয়, বরং যেকোনো জ্বলন্ত বা অগ্নিময় বস্তু এড়িয়ে চলতে শেখে। যখন এমনটি ঘটে, তখন আমরা বলি যে শিশুটি শিখেছে জ্বলন্ত শিখা বা আগুন স্পর্শ করলে শরীরের অংশ পুড়ে যাবে। এভাবেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির আচরণ পরিবর্তিত হয়। অভিজ্ঞতার ফলে আচরণের এই পরিবর্তনকেই সাধারণত ‘শিখন’ বলা হয়। সুতরাং, ব্যাপক অর্থে ‘শিখন’ বলতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন ব্যক্তির আচরণে যে পরিবর্তন ও পরিমার্জন ঘটে, তাকেই বোঝানো হয়।

 

শিখনের সংজ্ঞা

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, শিখন হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অনুশীলন বা অভিজ্ঞতার ফলে সম্ভাব্য আচরণে তুলনামূলকভাবে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে। এটি অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান জ্ঞান, দক্ষতা, অভ্যাস বা প্রবণতা অর্জন, পরিবর্তন কিংবা সুদৃঢ় করার একটি প্রক্রিয়া। মানুষ, প্রাণী এবং নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রের মধ্যে শেখার বা শিখন ক্ষমতা বিদ্যমান; এমনকি কিছু উদ্ভিদের মধ্যেও এক ধরনের শিখন প্রক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। শিখন প্রক্রিয়াকে বিভিন্ন মনোবিদগণ ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যক্ত করেছেন, তাঁদের দেওয়া সংজ্ঞাগুলি নিম্নে তুলে ধরা হল-

গেটস (Gates)-এর মতে, “Learning is the modification of behaviour through experience.” অর্থাৎ, শিখন হল অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আচরণের পরিবর্তন।

হেনরি পি. স্মিথ (Henry, P. Smith)-এর মতে, “Learning is the acquisition of new behaviour or strengthening or weakening of old behaviour as a result of experience.” অর্থাৎ, শিখন হল অভিজ্ঞতার ফলে নতুন আচরণ আয়ত্তকরণ কিংবা বিদ্যমান আচরণকে শক্তিশালী বা দুর্বল করার প্রক্রিয়া।

ক্রো এবং ক্রো (Crow and Crow)-এর মতে, “Learning is the acquisition of habits, knowledge and attitudes. It involves new ways of doing things, and it operates in an individual’s attempt to overcome obstacles or to adjust to new situations.” অর্থাৎ, শিখন হল অভ্যাস, জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করার প্রক্রিয়া। এর অন্তর্ভুক্ত হল কোনো কাজের নতুন পদ্ধতি রপ্ত করা; আর যখন কোনো ব্যক্তি বাধা অতিক্রম করতে কিংবা নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে সচেষ্ট হন, তখনই এই প্রক্রিয়াটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

স্কিনার (Skinner)-এর মতে, “Learning is the process of progressive behaviour adaptation.” অর্থাৎ, শিখন হল আচরণের প্রগতিশীল অভিযোজনের প্রক্রিয়া।

 

শিখনের বৈশিষ্ট্য

পরিবেশের সাথে সার্থক সংগতিবিধানের জন্য উপযুক্ত পরিনমন ও প্রেষণা অনুযায়ী বিশেষ গতিপথ ধরে পরিবেশের সাপেক্ষে আচরণের পরিবর্তন করাকে শিখন বলে। তাই শিখনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আমরা শিখনকে উল্লেখ করতে পারি। ডব্লিউ.আর. ম্যাকল (W.R. McLaw)-এর মতে, শিখনের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

  1. শিখন হল আচরণের একটি ধারাবাহিক পরিবর্তন, যা জীবনব্যাপী চলতে থাকে।
  2. শিখন সর্বব্যাপী; এটি মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
  3. শিখনের সাথে ব্যক্তির সামগ্রিক সত্তা (সামাজিক, প্রাক্ষোভিক ও বৌদ্ধিক) জড়িত থাকে।
  4. শিখন প্রায়শই আচরণের ধরন বা বিন্যাসে পরিবর্তন আনে।
  5. শিখন একটি বিকাশমূলক প্রক্রিয়া; সময় এর অন্যতম একটি মাত্রা।
  6. শিখন উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক উদ্দীপক (যেমন- শাস্তি)-এর তুলনায় ইতিবাচক উদ্দীপক (যেমন- পুরস্কার) অধিক কার্যকর।
  7. শিখন সর্বদা লক্ষ্যাভিমুখী। এই লক্ষ্যগুলো সর্বদাই দৃশ্যমান আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব।
  8. আগ্রহ ও শিখনের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান। ব্যক্তি সেই বিষয়গুলো ভালোভাবে শেখে যাতে তার আগ্রহ রয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ভগ্নাংশের যোগফল নির্ণয় শেখার চেয়ে ফুটবল খেলা শেখা অনেক সহজ মনে হয়।
  9. শিখন পরিপক্বতা ও প্রেষণার ওপর নির্ভর করে।

 

শিখন রেখা

‘শিখন রেখা’ হল একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শিখন প্রক্রিয়াটি কীভাবে অগ্রসর হয়, তার একটি গ্রাফিক্যাল বা চিত্রভিত্তিক উপস্থাপনা। সব ধরনের শিখনের ক্ষেত্রেই, X এবং Y অক্ষের সাপেক্ষে একটি রেখা অঙ্কন করে শিখনের গতিপথ বা ক্রমবিকাশকে তুলে ধরা ও বর্ণনা করা সম্ভব।

Fig : Learning Curve

উপরের চিত্রে একটি সাধারণ ‘শিখন রেখা’ দেখানো হয়েছে যা বিভিন্ন শিখন প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। এই রেখায় বেশ কিছু অনিয়ম বা ওঠানামা লক্ষ্য করা যায়, কারণ শিখনের অগ্রগতি সবসময় সুষম বা ধারাবাহিক হয় না। বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝার সুবিধার্থে এই রেখাটিকে পাঁচটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে (a, b, c, d এবং e)।

 

শিখন সংক্রান্ত তত্ত্বসমূহ

শিখন প্রক্রিয়ার স্বরূপ সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আচরণবাদীদের মতে, শিখন প্রক্রিয়া হল বিচারবুদ্ধি বিবর্জিত যান্ত্রিক প্রক্রিয়া মাত্র। মনোবিজ্ঞানী থর্নডাইক মনে করেন, যে শিখন প্রক্রিয়া উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে যথাযথ সম্পর্ক স্থাপন করে। ম্যাকডুগাল প্রমুখ উদ্দেশ্য সাধনবাদীদের মতে উদ্দেশ্য সাধনের উপযোগী উপায় নির্বাচন করার ক্ষমতা অর্জন করাই হল শিখন। আবার গেস্টাল্টবাদীদের মতে, অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে কোনো এক পরিস্থিতিকে সমগ্রভাবে প্রত্যক্ষ করে প্রতিক্রিয়া করাই হল শিখন।

শিখনের স্বরূপ সম্পর্কে এই ধরনের মতভেদ থাকার ফলে শিখন প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয় বা ব্যক্তি কীভাবে বিভিন্ন বিষয় ঘটনা, দক্ষতা, অভ্যাস ইত্যাদি শেখে বা আয়ত্ত করে সে বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়, এরই ফলশ্রুতি হিসাবে শিখন সংক্রান্ত বিভিন্ন মতবাদের জন্য বিভিন্ন মনোবিদ বিভিন্ন বিষয়, শিখন কৌশল সম্বন্ধে অনুসন্ধান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। শিখন সংক্রান্ত বিবিধ তত্ত্বগুলি নিম্নে একটি চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হল-

Fig : Classification of Learning Theories

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. Managal, S.K. Advanced Educational Psychology (2nd ed.). PHI Learning Private Limited, New Delhi.
  2. Aggarwal, J.C. Essential of Educational Psychology (2nd ed.). Vikas Publishing House PVT. LTD., New Delhi.
  3. পাল, গোবিন্দ পদ., মিত্র, গঙ্গারাম। শিখনের মনোবিজ্ঞান। নব প্রকাশনী, কলকাতা।
  4. গুপ্ত, অশোক। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান। সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, কলকাতা।
  5. ঘোষ, সনৎ কুমার। শিখনে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। ক্লাসিক বুকস্, কলকাতা।
  6. ইসলাম, নূরুল। শিক্ষামনোবিদ্যার রূপরেখা। শ্রীধর প্রকাশনী, কলকাতা।
  7. চক্রবর্তী, প্রণব কুমার এবং ব্যানার্জী, দেবশ্রী। শিক্ষার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।

 

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *