মানসিক স্বাস্থ্যের সার্বিক ধারণা | A Comprehensive Overview of Mental Health

মানসিক স্বাস্থ্য (A Comprehensive Overview of Mental Health) হল মানুষের চিন্তা, আচরণ এবং অনুভূতির এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে প্রকাশ করতে পারে এবং জীবনের স্বাভাবিক মানসিক চাপের সাথে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়।

দৈহিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমরা সকলেই কমবেশি সচেতন। শৈশবকাল থেকেই দৈহিক স্বাস্থ্য কী এবং তা রক্ষার জন্য গৃহে পিতামাতা ও অন্যান্য শুভানুধ্যায়ী, বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা, পাড়া-প্রতিবেশী, গুরুজন এমনকি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যদিয়ে আমাদের সচেতন প্রয়াসের কোনো বিরাম নেই। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিন্তু একথা প্রযোজ্য নয়। বস্তুত মানসিক স্বাস্থ্য কী? কীভাবে সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায়? এ সম্পর্কে বেশিরভাগ ব্যক্তিই অজ্ঞ বা আংশিক জ্ঞানসম্পন্ন। অথচ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে দৈহিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই বিচার করা প্রয়োজন। কথায় বলে “Sound mind in a sound body”।

 

মানসিক স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা

আমাদের শরীর সুস্থ থাকলে যেমন বলি সুস্বাস্থ্য তেমনি মন সুস্থ থাকলে বলি মানসিক স্বাস্থ্য। শরীর এবং মন অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত তাই আমরা বলে থাকি সুস্থ দেহে সুস্থ মন-এর আবাস। মানসিক সুস্থতা বজায় থাকলে আমরা পরিবেশের সাথে অভিযোজনে সমর্থ হই এবং আমাদের ব্যক্তিত্বের ভারসাম্যতা বজায় থাকে। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিম্নে তুলে ধরা হল-

WHO-এর মতে, “Mental health is a state of well being in which the individual realizes his or her own abilities, can cope with the normal stresses of life can work productivity and fruitfully and is able to make a contribution to his or her community.” অর্থাৎ, মানসিক স্বাস্থ্য হল সুস্থতার এমন একটি অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকেন; জীবনের স্বাভাবিক চাপগুলো মোকাবিলা করতে পারেন; উৎপাদনশীল ও ফলপ্রসূভাবে কাজ করতে এবং নিজের সমাজে অবদান রাখতে সক্ষম হন।

অধ্যাপক হ্যাডফিল্ড-এর মতে, “Mental Health is the full and free expressions of all our native and acquired potentialities in harmony with one another by being directed towards a common end or aim of the personality as a whole.” অর্থাৎ, মানসিক স্বাস্থ্য হল আমাদের সমস্ত সহজাত ও অর্জিত সম্ভাবনার পূর্ণাঙ্গ ও অবাধ প্রকাশ যা একে অপরের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে, সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের কোনো একটি অভিন্ন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের অভিমুখে পরিচালিত হয়।

 

মানসিক স্বাস্থ্যের বৈশিষ্ট্য

মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিষদ ধারণা আয়ত্ত করতে হলে, এর বৈশিষ্ট্যগুলি জানা দরকার যা নিম্নে উল্লেখ করা হল- 

  1. মানসিক স্বাস্থ্য দেহ ও মন উভয়ের উপরই নির্ভর করে, কারণ দেহ ও মনের মধ্যে এক নিগূঢ় সম্পর্ক বর্তমান।
  2. মানসিক স্বাস্থ্য সমাজ নিরপেক্ষ নয়। সমাজের অনুশাসন, রীতিনীতি, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে।
  3. মানসিক স্বাস্থ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আত্মোপলব্ধি। এর অর্থ হল ব্যক্তি কার্যকরীভাবে লিখতে, পড়তে ও বলতে সক্ষম হবে। 
  4. মানসিক স্বাস্থ্যের আর-একটি বৈশিষ্ট্য হল মানসিক সম্পর্ক স্থাপন। মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তি বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক জীবন উপভোগ করে। 
  5. মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তির আর একটি বৈশিষ্ট্য হল আর্থিক উৎকর্ষতা। আর্থিক উৎকর্ষতার দুটি দিক আছে- একজন শিক্ষিত উৎপাদক ও ভোক্তা হওয়া।
  6. দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়া সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ।

 

মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা

প্রতিটি ব্যক্তিসত্তারই দুটি জীবনধারা- ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবন। এই দুটির উপরই মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভরশীল।

ব্যক্তিজীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক বিকাশ ঘটতে থাকে। পিতামাতা, ভাইবোন ও পরিবারের অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে অবিরত মিথস্ক্রিয়ার (Interaction) ফলে তাদের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটে শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে। স্নেহ-প্রীতি-ভালোবাসা, যত্ন ও উদ্দীপনাযুক্ত পারিবারিক পরিবেশ শিশুর সুষম ব্যক্তিত্ব বিকাশের অনুকূল পরিস্থিতি গড়ে তোলে। এই সুষম ব্যক্তিত্ব বিকাশ থেকেই সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য গড়ে ওঠে যা সার্থক অভিযোজনে অপরিহার্য।

সমাজজীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা

অপসংগতির কারণে ব্যক্তি সামাজিক নীতি ও আদর্শকে সবসময় মেনে চলে না। সামাজিক অনুশাসন বহির্ভূত চিন্তা ও কর্মের দ্বারা সে সমাজজীবনের শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য বিঘ্নিত করে। তাই ব্যক্তির অসুস্থ মানসিকতা সমাজ মানসিকতাকেও আঘাত করে, যার ফলে ব্যক্তির সমাজজীবনও বিষাক্ত হয়ে ওঠে।

 

মানসিক স্বাস্থ্যের উপাদান 

যে বিষয়গুলি আমাদের মানসিক অবস্থাকে সুস্থ বা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে তাকে আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান বলে থাকি। যেমন-

  1. আমাদের কিছু প্রাথমিক চাহিদা থাকে। যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এগুলি যথাযথ পূরণ হলে মানসিক স্বাস্থ্য বজায় থাকবে।
  2. শরীর সুস্থ থাকলে মন সুস্থ থাকবে।
  3. শিশু যদি পরিবারের সকলের কাছ থেকে যথাযথ ভালোবাসা পায় তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বজায় থাকবে।
  4. শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠলে তার মানসিক স্বাস্থ্য বজায় থাকবে।
  5. পারিবারিক অবস্থা স্থিতিশীল হলে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য বজায় থাকবে।
  6. শিশু নিজেকে নিরাপদ বোধ করলে তার মানসিক স্বাস্থ্য বজায় থাকবে।

 

উত্তম মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে পরিবারের ভূমিকা

একটি শিশু পরিবারে জন্মগ্রহণ করে পরিবারেই বড় হয়, পরিবারই তাকে লালন পালন করে তাই একজন শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে তার পরিবারের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে পরিবার যে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেগুলি হল –

  1. পরিবার প্রতিটি শিশুর সঠিক পুষ্টির দায়িত্ব নেবে।
  2. উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।
  3. সঠিক লালন পালন করবে।
  4. অতিরিক্ত শাসন বা অতিরিক্ত আদর কোনটাই কাম্য নয়।
  5. পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যে কোন ভেদাভেদ করবেন না।
  6. পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করবে।

 

মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

শিশুরা বড় হবার সাথে সাথে শিক্ষাগ্রহণের জন্য বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করে এবং তারা দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যালয়ে অতিবাহিত করে। তাই সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে বিদ্যালয়ও অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন –

  1. বিদ্যালয় শিক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ থাকবে।
  2. বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
  3. শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শিক্ষক মন দিয়ে শুনবেন।
  4. পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ বর্জনীয়।
  5. শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে।
  6. প্রত্যেক ব্যক্তি একে অপরের থেকে আলাদা তাই শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যক্তিবৈষম্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।
  7. সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের সুযোগ দিতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ নবনির্মাণের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আর এই ভিত্তিটি গড়ে ওঠে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই। পরিবার যেখানে ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং মানসিক আশ্রয় প্রদানের মধ্যদিয়ে শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়তা করে, সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সুস্থ প্রতিযোগিতা, সহমর্মিতা ও শৃঙ্খলার চর্চার মাধ্যমে তাদের মানসিকতাকে আরও সুদৃঢ় ও পরিপক্ব করে তোলে। তাই, বর্তমান যুগের ব্যাপক মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে তরুণ প্রজন্মকে সহায়তা করতে এবং তাদের আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিতে পরিণত করতে এই উভয় প্রতিষ্ঠানকেই সমান দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি শিশুকে মানসিক দিক থেকে সুস্থ এবং মানবিক মূল্যবোধে দীক্ষিত একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. দাস, কৌশিক। নির্দেশনা ও পরামর্শদানের মৌলিক নীতিসমূহ। গ্লোবাল নেট পাবলিকেশন, কলকাতা।
  2. সরকার, অধ্যাপক (ড.) বিজন। শিক্ষা মনোবিদ্যা। আহেলি পাবলিশার্স, কলকাতা।
  3. পাল, ড. দেবাশিষ। প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণে শিশু শিক্ষা। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *