যোগ দর্শন এবং শিক্ষাতত্ত্বে এর প্রভাব | Yoga Philosophy and Its Impact in Education

প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক দর্শন হিসাবে যোগ দর্শন এবং শিক্ষাতত্ত্বে এর প্রভাব (Yoga Philosophy and Its Impact in Education) এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। ষড়দর্শনের অন্যতম প্রভাবশালী ধারা হল যোগ দর্শন। আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বে শিক্ষার্থীর একাগ্রতা বৃদ্ধি, নৈতিক উন্নয়ন এবং সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের বিকাশে যোগ দর্শনের প্রভাব অপরিসীম।

ভারতীয় বৈদিক ষড়দর্শনের অন্যতম হল যোগ দর্শন। ঋষি পতঞ্জলি এই দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। প্রকৃতপক্ষে যোগ দর্শন হল সাংখ্য দর্শনের ব্যবহারিক দিক। মানুষের জীবনযাত্রা, জীবন পদ্ধতি কেমন হবে, সেটাই যোগ দর্শনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ঋষি পতঞ্জলি যোগের উদ্দেশ্য, প্রকৃতি, প্রক্রিয়া, প্রভাব, মানুষের মুক্তি পরলোক ইত্যাদি নিয়ে বহু আলোচনা করেছেন। ব্যাসদেব এবং ভোজরাজ এই যোগ দর্শনের নানা ভাষ্য ও টীকা রচনা করেছেন। পরবর্তীকালে বাচস্পতি, বিজ্ঞান ভিক্ষু, ব্যাসদেবের ভাষ্যের উপর বহু টীকা রচনা করেছেন। সাংখ্য এবং যোগ এই দুটি দর্শনে reality হিসাবে পুরুষ বা আত্মা এবং জড়প্রকৃতি এই দুটিকে স্বীকার করা হয়েছে। তাই সাংখ্য এবং যোগ দর্শনকে বলা হয় আদি দর্শন।

 

যোগ দর্শনের বৈশিষ্ট্য

যোগ দর্শনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল অচেতন, বুদ্ধিহীন, জড় প্রকৃতির কবল থেকে পুরুষের বা আত্মার মুক্তির উপায় ঠিক করা। যোগ দর্শনের প্রমা বা জ্ঞানের উৎস হিসাবে প্রত্যক্ষ, অনুমান এবং শব্দ এই তিনটিকে গ্রহণ করা হয়। যোগ দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হল সমস্ত যন্ত্রণা ও দুঃখের হাত থেকে জীবাত্মা বা পুরুষের মুক্তি। সেজন্য যোগ দর্শন ব্যবহারিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক।

সাংখ্য দর্শনে বিবেক জ্ঞানের মাধ্যমে আত্মজ্ঞান বা উপলব্ধির কথা বলা হয়েছে। সেই উপলব্ধির জন্য দরকার ধ্যান বা অভ্যাস। এর ফলে পুরুষ বা আত্মা জীবনের সমস্ত রকম দুঃখ, দুর্দশা, সুখ, ব্যথা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে থাকে। তখন জগতের কোনো কিছু তাকে আর স্পর্শ করে না। এই ব্যবহারিক পরিণতি হল যোগ। সাংখ্য এবং যোগ দর্শনে মনে করা হয় আত্মা, মন, বুদ্ধি ইন্দ্রিয় থেকে আলাদা। কিন্তু মন, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি প্রভৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাইরের বাস্তব সংস্পর্শে আসে এবং সেই আকার ধারণ করে। পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনে অর্থাৎ বলা হয় আত্মা এবং জড় প্রকৃতির মিলনে প্রাণী বা বস্তু সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে সত্ত্ব গুণ থাকার জন্য জীবাত্মা তার উপর ছায়া ফেলে। তখন চেতন আত্মা ঐ বস্তু সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করে। অজ্ঞানতার জন্য আত্মাকে বোঝা যায় না কারণ, আত্মা পাঁচ ধরনের ক্লেশ দ্বারা ঢাকা থাকে। সেগুলি হল- ১) অনিত্য-কে নিত্য বলে ভুল করা, ২) আত্মা এবং মনকে এক বলে ভুল করা, ৩) সুখ ভোগের ইচ্ছা, ৪) দুঃখে বিরাগী হওয়া এবং ৫) সর্বজীবে মৃত্যু ভয়।

চিত্তবৃত্তি হল পাঁচ রকমের। প্রথমটি হল প্রমার তিনটি উৎস- প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ, দ্বিতীয়টি হল- ভ্রান্তজ্ঞান, তৃতীয়টি বৃত্তি হল- বিকল্প, চতুর্থটি হল- স্বপ্নহীন নিদ্রা, এবং পঞ্চম বৃত্তি হল- স্মৃতি।

এই পাঁচ ধরনের চিত্তবৃত্তির জন্য আত্মাকে পুরুষের ভয়, রাগ, দুঃখ প্রভৃতি অভিজ্ঞতা হয়। এই অভিজ্ঞতাকে বলা হয় বন্ধন। এই বন্ধন থেকে মুক্ত হতে গেলে চিত্তবৃত্তির বন্ধনকে ছিন্ন করতে হবে। এই বন্ধন ছিন্ন হলে আত্মার স্বরূপটি বোঝা যাবে।

যোগ শাস্ত্রে এই চিত্তবৃত্তির নিরোধের উপায় বলা হয়েছে। চিত্তবৃত্তির পাঁচটি অবস্থা। সেগুলি হল- ১) ক্ষিপ্ত, ২) মূঢ়, ৩) বিক্ষিপ্ত, ৪) নিরুদ্ধ এবং ৫) একাগ্রতা। প্রথম চারটি যোগের পক্ষে অনুকূল নয়। এইগুলিতে চিত্ত স্থির থাকে না, কিন্তু একাগ্রের মধ্যে সত্ত্বগুণ বেশি থাকার জন্য কোনো বিষয়ে মন নিবিষ্ট হয়। তখন শান্ত সমাহিত অবস্থার সৃষ্টি হয়, একে বলা হয় সমাধি। সমাধি দীর্ঘস্থায়ী হলে সমস্ত রকম কামনা, বাসনা থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এই সমাধি লাভের বা যোগ সাধনার আটটি পথ। সেই জন্য একে বলা হয় অষ্টমার্গ বা অষ্টাঙ্গিক মার্গ। সেই আটটি পথ হল- ১) যম, ২) নিয়ম, ৩) আসন, ৪) প্রাণায়াম, ৫) প্রত্যাহার, ৬) ধারণা, ৭) ধ্যান, ৮) সমাধি।

  1. যম : কয়েকটি ব্রত পালনের নির্দেশ দেয়। যথা- সত্য কথা বলা, সৎ চিন্তা করা, ইন্দ্রিয় দমন, ব্রহ্মচর্য পালন করা, মনের পবিত্রতার জন্য মানসিক অভ্যাস, কারুর জিনিস চুরি না করা, কারুর দান না নেওয়া। এগুলিকে বলা হয় অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ।
  2. নিয়ম : নিয়মের অন্তর্গত হল- শৌচ অর্থাৎ স্নান, সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ ইত্যাদি। এছাড়া মনের পবিত্রতা রক্ষার জন্য কতকগুলি মানসিক অভ্যাস গঠনের কথাও বলা হয়েছে, যেমন- মৈত্রী, করুণা, পরনিন্দা বর্জন ইত্যাদি।
  3. আসন : মানবদেহে নানা ধরনের কোষ, স্নায়ু, গ্রন্থি ইত্যাদি রয়েছে। সেই সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সুস্থতা নির্ভর করে আসনের উপর। আসন হল বিভিন্ন রকমের ভঙ্গী।
  4. প্রাণায়াম : এর পরের মার্গটি হল প্রাণায়াম। প্রাণায়াম অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ। শ্বাস গ্রহণ করা (পূরক), শ্বাস ত্যাগ করা (রেচক) এবং দীর্ঘক্ষণ শ্বাস রক্ষা করা (কুম্ভক)-প্রাণায়াম প্রক্রিয়ার তিনটি দিক। এর ফলে ব্যক্তির একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।
  5. প্রত্যাহার : এটি হল আসন ও প্রাণায়ামের অন্তর্মুখী। আসন এবং প্রাণায়ামের ফলে মন অন্তর্মুখী হয়। তখন বাইরের বিষয় থেকে ইন্দ্রিয়কে প্রতিনিবৃত্ত করার নাম হল প্রত্যাহার।
  6. ধারণা : ধারণা হল দেহের বিশেষ কোনো অংশে মনোনিবেশ করা। যোগের প্রাথমিক অবস্থায় দুই চক্ষুর ঠিক মাঝখানে বা নাসাগ্রে মনটিকে স্থির করা যেতে পারে, বা কোনো অভিপ্রেত বিষয়ে বা কোনো মূর্তিতে মনটিকে স্থির করা যায়।
  7. ধ্যান : পরের ধাপ হল ধ্যান। ধ্যান হল মনকে কোনো বিশেষ মূর্তিতে স্থির করা। তখন বাইরের কোনো বিষয় মনকে স্পর্শ করে না।
  8. সমাধি : ধ্যানের শেষ ধাপ হল সমাধি। তখন মন আপন স্বরূপ বুঝতে পারে অর্থাৎ, প্রকৃতি এবং পুরুষের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে এবং পুরুষকে চিনতে পারে। এর ফলে যোগই অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করে। তখন তার বাইরের বিষয় সম্পর্কে কোনো অনুভূতি থাকে না।

সুতরাং, যোগ দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হল সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন গঠন করে জাগতিক সুখ, দুঃখ, রোগ, শোক থেকে মুক্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ লাভ।

 

শিক্ষাক্ষেত্রে যোগ দর্শনের প্রভাব

শিক্ষাতত্ত্বে ও প্রয়োগে এই বৈশিষ্ট্য কতখানি প্রাসঙ্গিক কিংবা শিক্ষার যেসব ক্ষেত্রে যোগ দর্শনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, তা নিম্নে তুলে ধরা হল-

শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে

যোগ দর্শন শিক্ষার লক্ষ্য হিসাবে শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ-কে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন, ব্যক্তিসত্তার বিকাশসাধন, মানবিক গুণাবলীর বিকাশ, সংস্কৃতির সংরক্ষণ, জ্ঞানেন্দ্রিয়ের প্রশিক্ষণ, মনের নিয়ন্ত্রণ তথা ধ্যান করা ইত্যাদিকে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করে থাকে।

পাঠক্রম

যোগ দর্শনের পাঠক্রমের মূল বিষয় হল ‘যোগ’ (yoga)। শিক্ষার্থীরা যাতে বিভিন্ন মানসিক চাপ-কে জয় করে নির্বিঘ্নে এবং শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারে তার জন্য যোগ দার্শনিকদের মতে যোগের নীতি, যোগের অনুশীলন, প্রাণায়াম, ধ্যান ইত্যাদি বিষয় পাঠক্রমে থাকলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, মানবিক মূল্যবোধ ইত্যাদি বিষয়কেও পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

শিক্ষাদান পদ্ধতি

যোগদর্শনে শিক্ষাদান পদ্ধতি হিসাবে প্রমার তিনটি উৎস যথা- প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। সেই সঙ্গে যোগ দর্শনের বিভিন্ন প্রায়োগিক পদ্ধতি যথা- বিজ্ঞানভত্তিক পদ্ধতি, সক্রিয়ভিত্তিক পদ্ধতি ইত্যাদির অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষক

শিক্ষক হবেন আদর্শবাদী, জ্ঞানী এবং উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যাকে শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করবেন এবং মুক্তির যথার্থ পথ সম্বন্ধে অবহিত হবে।

শিক্ষার্থী

যোগ দর্শনে আত্ম-শৃঙ্খলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে শিক্ষার্থী আত্মস্বরূপ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারে।

 

যোগ দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা / উপসংহার

আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য হল মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সাধন। এই বিকাশ সাধনায় ‘যোগ’ অপরিহার্য। জন লক্ বলেছিলেন, ‘সুস্থ দেহ হল সুস্থ মনের আধার’। তাই প্লেটো তাঁর শিক্ষা চিন্তায় শরীরের সুস্থতার জন্য শরীর চর্চা এবং মনের সুস্থতায় সঙ্গীতের চর্চার কথা বলেছেন। আর আজকের পৃথিবীতে যোগ সাধন সর্বজন স্বীকৃত। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর শিক্ষা পদ্ধতিতে বারংবার এই একাগ্রতা ও চিত্তবৃত্তি সাধনার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন মনঃসংযোগ এবং ধ্যানই হল শিক্ষার অন্যতম পদ্ধতি। তিনি নিজের জীবনে তা প্রমাণ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের আশ্রমের নাম দিয়েছিলেন ব্রহ্মচর্য আশ্রম। পাশ্চাত্য শিক্ষাবিদেরা শিশুর ইন্দ্রিয় পরিমার্জনার কথা বলেছেন। রুশো থেকে মন্তেসরি প্রত্যেকেই শিশুর জ্ঞানলাভের জন্য ইন্দ্রিয় পরিমার্জনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। গান্ধিজি তাঁর শিক্ষাভাবনায় যোগের যে ব্রত পালন করেছেন তা হল অহিংসা ও সত্য।

আজকের পৃথিবীতে যে নৈতিক শিক্ষার অধঃপতন ঘটেছে তার জন্য সমাজে এত বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি। এই প্রেক্ষাপটে মূল্যবোধের শিক্ষায় যোগের অষ্টাঙ্গিক মার্গ বিশেষ করে প্রথম মার্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দার্শনিক হার্বাট তাঁর আগ্রহ বিকাশের তত্ত্বে ও জ্ঞান আহরণের ফলে মনের সুস্থতা-কে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আজ থেকে বহু যুগ আগে যোগ দর্শন সেই কথাগুলি অত্যন্ত গভীরভাবে বলেছে। সুতরাং, ভারতবর্ষে এই যোগ দর্শনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতীয় দর্শনের এই শাখা আজও বিশ্বের কাছে বিস্ময় হয়ে আছে।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্চনা। শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষানীতি। বি. বি. কুণ্ডু গ্র্যান্ড সন্স, কলকাতা।
  2. পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *