নারীশিক্ষার বর্তমান অবস্থা | Present Status of Women’s Education

নারীশিক্ষার বর্তমান অবস্থা (Present Status of Women’s Education) কেবল কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা জাতির অগ্রগতির সূচকই নয়, বরং এটি বিশ্ব উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি। যে নারীদের জীবন একসময় চার দেয়ালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, তাঁরা আজ শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত; মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে করপোরেট জগৎ সর্বত্রই তাঁরা নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান, তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেগুলোর বিস্তারিত আলোচনা অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে নারীশিক্ষার গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী ও বালিকাদের কেবল শিক্ষিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক দেশে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের সাক্ষরতার হার কম। নারীদের মধ্যে এই নিরক্ষরতার প্রধান কারণ হল উপযুক্ত সম্পদের অভাব। ভারতে নারীশিক্ষার পরিস্থিতি খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতীয় নারীদের সাক্ষরতার হার ছিল ৬৪.৬%। পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৮০.৯% হওয়ার তুলনায় এই সংখ্যাটি বেশ কম।
মহিলাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা
সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভারত সরকার নারীশিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি নীতি ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর বাস্তবায়নও সম্ভব হয়েছে। এর ফলে স্বাধীনতার ঠিক পরেই নারীশিক্ষার প্রসার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের দেশে নারীরা যথাযথ সামাজিক মর্যাদা পাচ্ছেন না; বরং প্রায়শই তারা সহিংস আক্রমণের শিকার হচ্ছেন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে লিঙ্গবৈষম্যের কারণে নারীরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। লিঙ্গবৈষম্যের বীজ পরিবারের মধ্যেই রোপিত হয়; পারিবারিক শিক্ষা শিশুর মনে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। পারিবারিক মিথস্ক্রিয়াই নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের উৎস। তাই আমাদের দেশে প্রায়শই নির্যাতন, জুয়া এবং নারী পাচারের মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই নারী। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার ক্ষেত্রেও লিঙ্গবৈষম্য স্পষ্ট।
জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি
সমাজের নারীদের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্যকে একটি মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, সমাজে নারীদের দুর্বল অবস্থানের একটি বহিঃপ্রকাশ হল জনসংখ্যাগত বিন্যাস। সাধারণত নারী ও পুরুষের অনুপাত ৫০:৫০ হওয়ার কথা; তবে অধিকাংশ উন্নত দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি থাকে, কারণ নারীরা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে বেশিদিন বেঁচে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী প্রতি হাজার পুরুষে নারীর সংখ্যা ছিল ৯৩৩, যা ১৯৯১ সালে ছিল ৯২৭। বিশেষ করে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত রাজ্যগুলোতে ০-৬ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মেয়েশিশুর সংখ্যা কম। এর কারণ সবসময় অর্থনৈতিক নয়, বরং অনেক সময় সামাজিক ব্যবস্থাও এর জন্য দায়ী। পণ-প্রথার কারণে কন্যাসন্তানকে কাঙ্ক্ষিত মনে করা হয় না বলে প্রায়শই কন্যাশিশু হত্যার মতো ঘটনার কথা শোনা যায়। তাছাড়া পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুত্রসন্তানদের প্রতি অধিক যত্ন নেওয়া হয় এবং দরিদ্র পরিবারগুলোতে অবহেলা ও অপুষ্টির কারণে কন্যাসন্তানদের মৃত্যু ঘটে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ
সমাজে নারীর অবস্থানের আরেকটি মাপকাঠি হল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণের প্রকৃতি। অযত্ন ও অবহেলার কারণে আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যু বা প্রসূতি মৃত্যুর (maternal death) হার এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতি ১ লাখ প্রসূতির মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৪০৭ জন। নারীদের স্বাস্থ্যের আরেকটি সমস্যা হল রক্তাল্পতা। এছাড়া মেয়েদের মধ্যে অপুষ্টি, যক্ষ্মা, যৌনবাহিত রোগ, ম্যালেরিয়া এবং জলবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও বেশি দেখা যায়। ‘জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য জরিপ’ (National Family Health Survey)-এর তথ্যমতে, সন্তান প্রসব-পরবর্তী পর্যায়ে থাকা প্রায় ৪৬ শতাংশ তরুণী রক্তাল্পতায় ভোগেন। পুষ্টির অভাবজনিত কারণে ৫১ শতাংশ নারী রক্তাল্পতার শিকার।
মহিলা সাক্ষরতা
যদিও আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার তুলনামূলকভাবে কম, তবুও গত কয়েক বছরে এই হার বেশ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে নারী ও পুরুষের সাক্ষরতার হারের মধ্যকার পার্থক্যটি সমাজে নারীর অবস্থান বা মর্যাদার অপর্যাপ্ততার আরেকটি নির্দেশক। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নারী সাক্ষরতার হার ছিল ৫৪.১৬ শতাংশ, যা ১৯৮১ সালে ছিল ২৯.৭৬ শতাংশ। কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৪-০৫ সালে ভারতের সাক্ষরতার হার ছিল ৬৭.৩০ শতাংশ; এর মধ্যে পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৭৭.০০ শতাংশ এবং নারীদের সাক্ষরতার হার ৫৭.০০ শতাংশ। নারী ও পুরুষের শিক্ষার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান সমাজে নারী-পুরুষের অসমতা বা বৈষম্যকে নির্দেশ করে।
নারীশিক্ষা ও তথা নারী প্রগতির জন্য বিশেষ কর্মসূচী
- আইসিডিএস (ICDS) বা সমন্বিত শিশু বিকাশ প্রকল্প।
- সর্বজনীন টিকাদান কর্মসূচি।
- জাতীয় জনসংখ্যা নীতির আওতাধীন বিভিন্ন কর্মসূচি, যেমন- শিশু ও প্রসূতি মৃত্যুর হার হ্রাস করা।
- ১৯৮৮ সালে সূচিত ‘জাতীয় সাক্ষরতা মিশন’-এর (NLM) মূল লক্ষ্য ছিল ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নিরক্ষর ব্যক্তিদের সাক্ষর করে তোলা। নারীশিক্ষার প্রসার এবং মেয়েদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল এই মিশনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তৎকালীন সমাজে নারীদের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং তাদের স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করার লক্ষ্যে এই মিশনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ ও বিভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।
- বিবিধ প্রথাবহির্ভূত শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে ৭৩ লক্ষ মানুষ উপকৃত হয়েছে এবং এদের মধ্যে ৬১ শতাংশই নারী।
- Post Literacy Campaign (PLC) বা সাক্ষরোত্তর কর্মসূচী। এই কর্মসূচি হল নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পর্যায়। এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় Total Literacy Campaign (TLC) বা পূর্ণাঙ্গ সাক্ষরতা কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই এই কার্যক্রমটি শুরু হয়।
- প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প হলো ‘ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর এডুকেশন অফ গার্লস অ্যাট এলিমেন্টারি লেভেল’ (NPEGEL)। ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’-এর অংশ হিসেবে ২০০৩ সালের জুলাই মাসে NPEGEL গঠিত হয়। যেসব এলাকায় তফসিলি জাতি বা উপজাতির মানুষের সংখ্যা বেশি এবং সাক্ষরতার হার ৫% বা ১০%-এর মতো কম অর্থাৎ শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়া ব্লক (EDD) বা অনগ্রসর অঞ্চলগুলোতে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
- আর্থিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য নারীর সমতা বিধানকারী বিভিন্ন প্রকল্প। যেমন- মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC), বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ইত্যাদি।
- ২০০০ সাল নাগাদ প্রায় ২০ লক্ষ নারী SHG (Self Help Groups) বা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর স্ব-কর্মসংস্থান প্রকল্পের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। (SHG) আন্দোলন লক্ষ লক্ষ নারীর জীবনে এক ব্যাপক পরিবর্তন আনে। ক্ষুদ্র পরিসরে সঞ্চয়ের মাধ্যমে নারীরা মহাজনদের চড়া সুদের বোঝা থেকে নিজেদের মুক্ত করেন। তাঁরা সেলাইয়ের কাজ, হস্তশিল্প, পশুপালন, কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপার্জনের পথ তৈরি করতে শুরু করেন।
- নারীর শিক্ষার সাথে প্রত্যক্ষভাবে নয়, বরং পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত অন্যান্য বিশেষ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্বর্ণজয়ন্তী গ্রাম স্বরোজগার যোজনা, রাষ্ট্রীয় মহিলা কোষ, সাপোর্ট ফর ট্রেনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট (STEP) ইত্যাদি। এগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা।
- জাতীয় কৃষি নীতি (National Agricultural Policy 2000)-তে দেশের কৃষি খাতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং তাঁদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও পদক্ষেপের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
- তফসিলি জাতি ও উপজাতির কল্যাণে আরেকটি প্রকল্প হল ‘কস্তুরবা গান্ধী বালিকা বিদ্যালয়’ (KGBV) প্রকল্প। এই প্রকল্পে ভারতের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বালিকাদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার আবাসিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেছেন।
সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপের ফলে নারীশিক্ষার অগ্রগতি নিশ্চিত হয়েছে। নারীরা শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তবুও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও অনেক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হল সমাজে নারীর অবস্থান। যদিও নীতিগতভাবে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে, তবুও একথা সত্য যে নারীর অধিকার বা ক্ষমতা অনেকাংশেই সীমিত; আর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ছাড়া মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার পুরোপুরি কার্যকর হবে না।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- Sengupta, Madhumala (May, 2018). Study Material. Netaji Subhas Open University.
- Manzoor, Shaista (2023). Recent Trends In Education. AkiNik Publications, ISBN: 978-93-5570-732-1.
- Kumar, J. & Sangeeta (April 2013). Status of Women Education in India. Educationia Confab, 2 (4), 162-176.
- Ingole, K. (2015). Recent trends and status of women in Higher Education in India. Headache. https://doi.org/10.4995/HEAD15.2015.541






