রিয়েলিটি থেরাপি, দ্বিমেরু ব্যাধি, টার্মিনাল অসুস্থতার সংক্ষিপ্ত ধারণা | A Brief Overview of Reality Therapy, Bipolar Disorder and Terminal Illness

রিয়েলিটি থেরাপি, দ্বিমেরু ব্যাধি, টার্মিনাল অসুস্থতা (A Brief Overview of Reality Therapy, Bipolar Disorder and Terminal Illness)- এই শব্দগুলোর গভীরতা আমাদের জীবনের তিনটি অত্যন্ত জটিল অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবন সবসময় মসৃণ গতিতে চলে না; কখনও কখনও তা ক্যান্সার-এর মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, আবার কখনও বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো তীব্র মানসিক উত্থান-পতনের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। কিন্তু চরম মানসিক ও শারীরিক সংকটের এই মুহূর্তে মানুষ কীভাবে তার বর্তমানকে মেনে নেবে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার পথ খুঁজে পাবে? ঠিক এখানেই ‘রিয়েলিটি থেরাপি’-র গুরুত্ব ফুটে ওঠে; এটি আমাদের কাল্পনিক অতীত বা ভীতিজাগানো ভবিষ্যতের চিন্তায় মগ্ন না থেকে বরং বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি হতে এবং জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে শেখায়। আজকের নিবন্ধে আমরা এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে ও সহজবোধ্যভাবে আলোচনা করব।
রিয়েলিটি থেরাপি এবং এর মূলনীতি
রিয়েলিটি থেরাপি
রিয়েলিটি থেরাপি একটি পরামর্শগ্রহীতাকেন্দ্রিক আচরণগত মনোচিকিৎসা যা বর্তমান সমস্যা ও পরিস্থিতির উন্নতিকরণে চেষ্টা করে এবং অতীতের ঘটনা সম্পর্কিত আলোচনাগুলিকে এড়িয়ে চলে। এই পদ্ধতিটি এমন একটি ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে সবথেকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় আমাদের অবস্থা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ভালোবাসাকে এবং এক্ষেত্রে ব্যক্তির মৌলিক চাহিদাগুলি পূর্ণ হয় পারস্পরিক সহযোগী এবং এক দৃঢ় সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। রিয়েলিটি থেরাপি আমাদের শেখায়, যখন আমরা কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তখন আমরা কীরূপ অনুভব করি এবং যেটিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি সেক্ষেত্রে আমরা কীরূপ অনুভব করি এবং এখানে আমাদের চিন্তাশক্তি ও সম্পাদিত আচরণ কীরূপ হবে। রিয়েলিটি থেরাপির লক্ষ্য হল ব্যক্তির জীবনশৈলীকে উন্নত করা এবং নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতিগুলি আয়ত্ত করানো।
রিয়েলিটি থেরাপি অতীতের সন্ধানে সময় ব্যয় করে না, এরা শুধু বর্তমান আচরণগুলি এবং ভবিষ্যতে এদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে থাকে। যেহেতু এটি একটি সমস্যাসমাধানভিত্তিক থেরাপি সেহেতু পরামর্শগ্রহীতা অনুভব করতে পারেন কীভাবে ওই সমস্যাটি তার জীবনকে প্রভাবিত করছে এবং কী কী পরিবর্তন আনলে সেখান হতে মুক্তি সম্ভব। যেমন- কোনো ব্যক্তি যদি তার নিকটস্থ কারোর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, সেখানে কী কারণে তা ঘটলো এবং কীভাবে আবার নতুন করে সংযোগ স্থাপন করা যেতে পারে তা এই থেরাপিতে শেখা সম্ভব।
রিয়েলিটি থেরাপির মূলনীতি
The relative strengths of these five needs give people their different personality.
–Wubbolding, R.E. (1991)
- Belonging : ভালোবাসা, অন্তরঙ্গতা, পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, পারস্পরিক সম্পর্ক।
- Power / Achievement : সাফল্য ও অর্জনের অনুভূতি, আত্মমর্যাদা, সাফল্য ও নিজ জীবনশৈলীকে নিয়ন্ত্রণ।
- Fun / Enjoyment : হাসতে, খেলতে এবং পরিণত মানুষ হয়ে ওঠার মর্মকে উপলব্ধি করা।
- Freedom / Independence : পছন্দ নির্বাচনের দক্ষতা, কোনটি জীবনের জন্য দরকারি এবং কোনটির প্রয়োজন নেই।
- Survival : জীবনের জন্য অপরিহার্য, যেমন- সুস্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান, শুদ্ধ বায়ু, নিরাপত্তা, এবং শারীরিক স্বস্তি।
দ্বিমেরু ব্যাধির ধারণা এবং ম্যানিক পর্যায়ের বিবরণ
ইংরেজি “Bipolar” বা “বাইপোলার”-এর বাংলা প্রতিশব্দ হল “দ্বিমেরু”, অর্থাৎ এখানে মানুষের মানসিক সমস্যার দুটি মেরু বা পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক আচরণ বা অভিব্যক্তি দুটি ভিন্ন সময়ে পুরোপুরি ভিন্ন হয়ে ওঠে। বাইপোলার ডিসঅর্ডারে যারা ভুগছেন তাদের মেজাজ বা ‘মুড’ বিশাল পরিবর্তন চক্রে আবর্তিত হয়। এক এক সময় উত্তেজনা ও উন্মত্ততায় মন বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে (Manic Phase), আবার অন্য সময়ে অহেতুক দুঃখের ভারে অবসাদগ্রস্ত (Depression) হয়ে পড়ে।
এই প্রকার ডিসঅর্ডার (Manic Phase) খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়। ম্যানিক অবস্থায় রোগী আনন্দ ও উত্তেজনায় ভরপুর থাকে। বাড়াবাড়ি রকমের আত্মবিশ্বাসের ফলে নানান অসম্ভব এবং ভয়াবহ কাজেও আত্মনিয়োগ করতে পারে। ঘুমানোর প্রয়োজন বোধ করে না, টাকার অপব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করে না। এই অবস্থাটা চলে গিয়ে মনটা হয় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, অথবা উল্টো দিকে চলে গিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়। নৈরাশ্য তখন পেয়ে বসে, কোনোকিছু তখন পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা বা কোনো ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া তখন কঠিন হয়। স্মৃতিশক্তিও তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। আগে যা ভালো লাগতো, তখন আর তা ভালো লাগে না। এই পর্যায়ে লক্ষণগুলো এক একজন ব্যক্তির কাছে প্রায় ভিন্নভাবে প্রদর্শিত হয়। এই স্তরে লক্ষণগুলি হল-
- অনেকবেশি কথা বলা এবং কথার মাঝে কাউকে কথা বলতে দেয় না।
- গল্প ও আড্ডায় মূল বিষয়বস্তু থেকে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
- সর্বদাই ভিন্ন ভিন্ন চিন্তায় মগ্ন থাকে।
- যেকোনো কাজে অতিরিক্ত আগ্রহ এবং পারদর্শিতার পরিচয় দেওয়া।
- অনেক বেশি আবেগ প্রবণ হয়ে পরা।
- হিসেব ছাড়া খরচা করা বা সব অর্থ উজাড় করে দেওয়া।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে এই পর্যায় তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই পর্যায়ে ব্যক্তির স্বতন্ত্রতা এবং বিচারশক্তি হ্রাস পায়। যে কেউ তাকে দিয়ে যেকোনো কাজ করিয়ে নিতে পারে। এই প্রকার ব্যাধি নিরন্তর চিকিৎসার প্রয়োজন, এমনকি মন যখন ফুরফুরে থাকে তখনও ওষুধ না বন্ধ করে চালিয়ে যেতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে নিরন্তর পরামর্শদান প্রক্রিয়া চালিয়ে গেলেও সুফল পাওয়া যেতে পারে।
টার্মিনাল অসুস্থতা এবং এক্ষেত্রে পরামর্শদানের সমস্যা
টার্মিনাল অসুস্থতা বা জীবন সমাপ্তি অসুস্থতা
টার্মিনাল অসুস্থতা (Terminal Illness) এমন একটি রোগ বা অবস্থা যা নিরাময় করা যায় না এবং এটি কারো মৃত্যুর কারণও হতে পারে। একে কখনও কখনও জীবন সমাপ্ত অসুস্থতাও বলা হয়ে থাকে। চূড়ান্ত অসুস্থতা বা রোগের শেষ পর্যায় হল এমন একটি অসুস্থতা যেখান হতে কোনো পর্যাপ্ত চিকিৎসাও রোগীকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
কোনো ট্রমা জনিত রোগ দীর্ঘ বিষণ্ণতা কিংবা যেকোনো প্রকার মনোবিকার জনিত বৈকল্য এই অসুস্থতার কারণ হতে পারে না। তবে এক্ষেত্রে যে প্রকার রোগগুলি অসুস্থতার কারণ হতে পারে, সেগুলি হল-
- Advance Cancer
- Dementia (including Alzheimer’s)
- Motor Neuron Disease
- Lung Disease
- Neurological Disease like Parkinson’s
- Advance Heart Disease
টার্মিনাল অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা দিন, সপ্তাহ, মাস কিংবা কখনও বছর ধরেও বেঁচে থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পক্ষেও ভবিষৎবাণী করা কঠিন হয়ে পরে, যে কে কতদিন বেঁচে থাকবেন। এটি তারা তাদের পরীক্ষা এবং কতটুকু চিকিৎসা তারা গ্রহণ করতে পারছে তার উপরও নির্ভর করে।
পরামর্শদানে সমস্যা
যদি কেউ টার্মিনাল অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকেন এর অর্থ এই নয় যে তারা পূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন না। সাধারণ কিছু পরামর্শ ও যত্ন একজন রোগীকে সুস্থ জীবনযাপনে সক্রিয় হতে সহায়তা করে থাকে। তবে এদের পরামর্শদান কিংবা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানাপ্রকার সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, সেগুলি হল-
- এই প্রকার অবস্থায় সঠিক পরামর্শদানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকের অভাব আছে।
- এই অবস্থায় রোগীদের মানসিক অবস্থা একেবারে ভেঙে পরে, সেহেতু তারা কোনো প্রকার চিকিৎসাতেই আর ইচ্ছা প্রকাশ করে না।
- এক্ষেত্রে রোগীর পাশে তার পারিবারিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং তাদের ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ভীষণভাবে কাজ করে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এর বিপরীত অবস্থা পরিলক্ষিত হয়, অর্থাৎ তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
- রোগী নিজ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অনীহা প্রকাশ করে, সেহেতু কোনো প্রকার চিকিৎসা কার্যকারী হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
- এই প্রকার অসুস্থতায় গাইড করার মতো ক্লিনিকের যথেষ্ট অপ্রতুলতা রয়েছে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- https://www.verywellmind.com/
- https://www.psychologytoday.com/
- https://my.clevelandclinic.org/
- https://www.mayoclinic.org/
- https://www.who.int/
- https://www.mariecurie.org.uk/
- https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/






