অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার | Obsessive-Compulsive Disorder (OCD)

অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (Obsessive-Compulsive Disorder (OCD) হল একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল মানসিক সমস্যা, যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে চলেছে। World Health Organization (WHO)-এর মতে, মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণ হল অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার। দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেকেই এই সমস্যাটির কথা শুনেছি, কিন্তু এর লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। এই নিবন্ধে আমরা সহজ ভাষায় Obsessive-Compulsive Disorder (OCD)-র পেছনের বিজ্ঞান এবং কীভাবে এই সমস্যাটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা করব। মানসিক স্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটি সম্পর্কে সঠিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা বর্তমান সময়ের দাবি।
OCD-র ধারণা
মানসিক রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (Obsessive-Compulsive Disorder)। আমাদের দেশে লাখ লাখ মানুষ এরোগে ভুগছেন। এরোগে তাদের ও অন্যদের পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রকার রোগকে আমরা বাংলায় “শুচিবাই” বলে থাকি। অনেকেই জানেন না যে এটি একটি মানসিক রোগ এবং এর চিকিৎসার দরকার আছে। এজন্য কালের আবহে এরোগ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো কিছু দুইবার চেক করা একটি সাধারণ আচরণ। যেমন ধরা যাক, গেটের তালা লক করেছে কিনা কিংবা বাইরের ঘরের লাইট বন্ধ করেছে কিনা সেটা যাচাই করা। কিন্তু আপনি দরজা বন্ধ করেছেন কিনা বা আলো বন্ধ করেছেন কিনা এমন ঘটনা যদি ২০ বার বা ৩০ বারের মত মনে সন্দেহ জাগায়, তখন এটাকে আর সাধারণ বলা যায় না।
OCD হল একটি চিন্তাবাতিকগ্রস্থ ও বাধ্যতাধর্মী আচরণের (শুচিবাই) একটি উদ্বেগজনিত রোগ। ধরা যাক, কারো মনে হল, তার হাতে বা গায়ে ময়লা লেগে আছে, যদিও তিনি ভালো করেই জানেন কোথাও ময়লা নেই, তারপরও চিন্তাটি বার বার আসতে থাকে এবং তিনি বার বার হাথ ধুতে যান, এমনকি বার বার সাবান ব্যবহার করতে থাকেন। এখানে ময়লার চিন্তাটি হল অবসেশন (Obsession), আর হাত ধোয়া হল কম্পালশন (Compulsion)। এ দুটি মিলিয়ে রোগটির নাম দেওয়া হয়েছে অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (Obsessive-Compulsive Disorder, OCD)। সারাবিশ্বে প্রতি ৫০ জনের ১ জন জীবনে কোনো না কোনো সময়ে এরোগে ভোগে তবে সাধারণত তরুণ তরুণীদের মধ্যেই এরোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
OCD-র লক্ষণ
অত্যাধিক চিন্তা
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সর্বদা আবেশিক (Obsessive) চিন্তা ভাবনায় মথিত হয়। রোগীর মনের ভিতর একই বাক্য ও গানের সুর বার বার তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভেসে আসে, কোনোভাবেই তিনি তার থেকে বের হতে পারে না।
অমূলক ভয়
রোগীর মধ্যে জটিল কিছু ভয় মিশ্রিত চিন্তা বার বার দেখা দেয়। তিনি ভয় পেতে থাকেন যে তার হয়তো ক্যান্সার, এইডস বা সিফিলিস হবে। যদিও এসব তার অমূলক ভয়।
অশ্লীল চিন্তা
অশ্লীল চিন্তা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এদের মনে বাসা বাঁধে।
কাজ করেও না করা ভাবা
চিঠি ডাকবাক্সে ফেলেও কিছুক্ষণ পরে মনে হয়, চিঠি বোধ হয় ফেলা হয়নি। একই কাজ বারবার করেও ভাবে যে, সে তা করেনি।
একই কাজ বারবার করা
এই রোগী সংশয় ও সন্দেহের বশে বাধ্য হয়ে একই কাজ বারংবার করে। বাড়ির বাইরে বেরনোর সময় হয়তো আলো ও পাখা বন্ধ করেছে। কিন্তু কিছু দূর গিয়ে তাদের মনে হয় আলো ও পাখা বন্ধ করা হয়নি এবং আবার বাড়িতে ফিরে এসে পরীক্ষা করে দেখে।
কোনো ব্যক্তির Obsessive thoughts তার মনে বার বার ঘুরে ফিরে আসতে পারে। এক্ষেত্রে যে প্রধান উপাদানগুলি এই Obsessive thoughts-কে বার বার ফিরে আসতে সহায়তা করে, সেগুলি হল-
- Dirt & Contamination
- Aggression
- Sex
- Religion
- Orderliness
- Illness
OCD-র কারণ
অন্য অনেক রোগের মতো OCD-এর সঠিক কোনো কারণ আজও আবিষ্কার হয়নি। কেই বলেন, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সমস্যা কিংবা ঠিকমতো কাজ না হওয়ার কারণে। কেউ বলেন কিছু কিছু নিউরোকেমিক্যাল-এর তারতম্যের কারণে, কেউ আবার জিনগত বিষয়গুলোকে কারণ হিসেবে দার করাতে চেয়েছেন। এসবের মধ্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সামান্য তারতম্যের বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। OCD-এর কিছু কারণ নিম্নে উল্লেখ করা হল-
Genetic
বংশগত কারণে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে, পরিবারের কারোর এই রোগ থাকলে পরবর্তী প্রজন্মে কিংবা তার পরবর্তী প্রজন্মে দেখা দিতে পারে।
Environmental
সাধারণত অতিরিক্ত মাত্রায় সাংসারিক কিংবা কর্মক্ষেত্রে কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে মানসিক চাপের পরবর্তী সময়ে এরোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে।
Neurostructural
মস্তিষ্কের গঠনগত কারণ। Basal ganglia বড় হয়ে যায়, Cortical atrophy বা মস্তিষ্কের Gray matter কমে যায়।
Neurochemical
সেরোটনিন নামক Neurotransmitter-এর সমস্যা হয়।
Medical Cause
Basal ganglia lesion বাচ্ছাদের গলায় Streptococcal গলায় সংক্রমণ হয়। আমরা জানি, আমাদের মস্তিস্কে প্রতি মুহূর্তে অনেক চিন্তাভাবনা আসে। আমাদের মস্তিষ্ক প্রয়োজন অনুসারে এগুলোকে ফিল্টার করতে থাকে। যখন চিন্তাগুলো সঠিক মতো ফিল্টারিং হয় না, তখন মস্তিষ্কে যত চিন্তা আসে তাকে সরানো যায় না, তারফলে OCD বা শুচিবাই দেখা দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিছুদিন পূর্বেও OCD-কে Anxiety Disorder-এর মধ্যে ধরা হতো। সাম্প্রতিককালে এটিকে Anxiety Disorder থেকে আলাদা করা হয়েছে।
Abnormal Personality
দেখা যায় যাদের OCPD (Obsessive Compulsive Personality Disorder) নামক অস্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব থাকে তাদের ২০-৩৫% পরবর্তী সময়ে Obsession হয়।
উপরোক্ত নানা কারণ আলোচনা করা হলেও, প্রকৃত কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আজও অজানা।
OCD-র চিকিৎসা
OCD-তে ব্যবহৃত বেশকিছু চিকিৎসা নিম্নে উল্লেখ করা হল-
Psychological
Exposure and response prevention মানে রোগী ময়লায় হাত দেবে কিন্তু হাত ধুতে পারবে না। Thought stopping চিন্তাকে আটকানোর চেষ্টা, যখন চিন্তা আসবে তখন হাতে লাগানো রাবার ব্যান্ডে টান দেবে। Thought sanitation অস্বাভাবিক চিন্তাকে খাতায় বার বার লেখা, চিন্তার কথাগুলো রেকর্ড করে শোনা যাতে সংবেদনশীলতা কমে যায়।
CBT
Cognitive Behavioral Therapy রোগীর চিন্তার ত্রুটিকে শনাক্ত করে দূর করার চেষ্টা করে Psychotherapy, Relaxation training ও Meditation-এর মাধ্যমে।
Medicine
এক্ষেত্রে বিভিন্ন ঔষধ উচ্চ মাত্রায় দিলে এবং TCA, SSRI বা বিষন্নতা নাশক আস্তে আস্তে দিলে অবসেশন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। Benzodiazepine স্বল্পকালীন সময়ে দেওয়া যেতে পারে যা ৩ সপ্তাহের বেশি নয়, এটা মনের অস্থিরতা কমাবে।
Social
রোগীকে তার বয়স, যোগ্যতা, আগ্রহ অনুসারে একটু কম চাপের কোনো পেশায় আত্মনিয়োগ করা যায়। অন্যান্য চিকিৎসা DBS (Deep Brain Stimulation) কিংবা Psychosurgery- caudate nucleus কেটে ফেলা ইত্যাদি।
ECT
Electroconvulsive Therapy বা বৈদ্যুতিক চিকিৎসা, এটি সাধারণত resistance OCD তে দেওয়া যায়। তবে নিজে নিজে এই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা খুবই বিপদজনক। অবশ্যই একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে কাজটা করাই ভালো।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- Sarason and Sarason. Abnormal Psychology (11th ed.). PHI Learning Private Limited, New Delhi.
- www.mayoclinic.org/
- https://medlineplus.gov/
- my.clevelandclinic.org/
- ঘোষ, সনৎ কুমার। শিক্ষায় সংগতি – অপসংগতি এবং নির্দেশনা। ক্লাসিক বুকস্, কলকাতা।






