ভারতীয় দর্শনের ধারণা, বৈশিষ্ট্য, শ্রেণীবিভাগ এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে পার্থক্য | Indian Philosophical Views

ভারতীয় দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি (Indian Philosophical Views) কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের একটি বিষয়মাত্র নয়; বরং, তা আত্মোপলব্ধি এবং পরম সত্যের সন্ধানে পরিচালিত এক গভীর ও চিরন্তন অভিযাত্রা। প্রাচীন বেদ ও উপনিষদ থেকে শুরু করে চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের বিভিন্ন ধারার বিস্তার জুড়ে। ভারত এমন এক বিচিত্র ও সমৃদ্ধ চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছে, যা জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দেয়।

 

ভারতীয় দর্শনের স্বরূপ

মানুষের জীবন ও শিক্ষা ওতপ্রোতভাবে একে অপরের সাথে জড়িত। জীবনের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে শিক্ষা আর সেই শিক্ষার লক্ষ্য কী হবে? অর্থাৎ, জীবন কোন দিকে এগোবে তা ঠিক করে দেয় দর্শন। দর্শন শব্দটি সাধারণত ইংরেজি “philosophy” কথাটির প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয় যার অর্থ জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ। বিভিন্ন প্রকার দার্শনিক মতবাদ আছে। স্বভাবতই সেই মতবাদগুলির মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। বিভিন্ন প্রকার দার্শনিক মতবাদকে বলা হয় ‘ধারা’ এবং ইংরেজিতে বলা হয় ‘school’ এই ভাবে বিচার করেই আমরা দর্শনের মূল দুটো ধারার সাক্ষাৎ পাই, একটির নাম ভারতীয় দর্শন এবং অন্যটি পাশ্চাত্য দর্শন।

শিক্ষা দর্শনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল ভারতীয় দর্শন। ভারতীয় দর্শন মূলত আধ্যাত্মিক এবং সব সময় সত্যের বাস্তবতার প্রয়োজনের উপর জোর দেয়। ভারতীয় দর্শন এক প্রাচীন দর্শন। ভারতীয় দর্শনকে বলা হয় তত্ত্বদর্শন, তবে শুধু তত্ত্ব আলোচনা নয় তত্ত্বদর্শনের পথও ভারতীয় দর্শন বলে দেয়। দর্শনের সাথে জীবনের যোগ আছে। দার্শনিক সত্যের আলোকে জীবন পরিচালিত হয়। ভারতীয়দের নিকট শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বাস্তববাদী শিক্ষক চান শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত দিকটি অগ্রাহ্য করে পরিবেশের শক্তির নিকট সমর্পণ করাতে। এইভাবে শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়ে ওঠে। তাদের চারিপাশের জগতের এক অংশ হয়ে উঠত। 

 

ভারতীয় দর্শনের বৈশিষ্ট্য

ভারতীয় দর্শন পাশ্চাত্য দর্শন থেকে আলাদা। পাশ্চাত্য দর্শন অপেক্ষা ভারতীয় দর্শন অনেক বেশি জীবনভিত্তিক, সেই তুলনায় পাশ্চাত্য দর্শন জ্ঞানভিত্তিক। ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস লক্ষ্য করলে এর কতকগুলি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যথা-

  1. ভারতীয় দর্শনের অর্থ হল সত্য জ্ঞানের উপলব্ধি।
  2. জ্ঞান অপেক্ষা জীবনের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয়। ঈশ্বর এখানে প্রাধান্য পায়।
  3. ভারতীয় দর্শন শুধুমাত্র জ্ঞানের বৌদ্ধিক অনুশীলন নয়, এটি বস্তুবাদ এবং জীবনের চাহিদা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ভারতীয় দর্শন জীবনের নির্দেশনা হিসাবে বিবেচিত।
  4. ভারতীয় দর্শন আধ্যাত্মিক এবং এর লক্ষ্য হল সমস্ত জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি অর্থাৎ মোক্ষলাভ।
  5. ভারতীয় দর্শনের মতে বিশ্বজগত সম্পর্কে যা কিছু আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সেটা অনিত্য এর বাইরে একটা জগত আছে সেটা অবিনশ্বর, শাশ্বত চিরন্তন।
  6. ভারতীয় দর্শন তার লক্ষ্যগুলিকে philosophically oriented living অর্থাৎ ব্যক্তি ও সমাজের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক প্রয়োগে তৎপর।
  7. ভারতীয় দর্শনে বলা হয়েছে মন, ইন্দ্রিয় সংযত করে আত্মজ্ঞান লাভ করা যায় মৃত্যুকে অতিক্রম করা যায়।
  8. ভারতীয় দর্শন সংশ্লেষাত্মক চিন্তাধারার দ্বারা পরিচালিত হয়।
  9. ভারতীয় দর্শন ও ধর্ম অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত।

 

ভারতীয় দর্শনের শ্রেণীবিভাগ

ভারতীয় দর্শন এক প্রাচীনতম দর্শন। যদি আমরা ভারতীয় দর্শনের দিকে দৃষ্টি রাখি তাহলে দেখব বিভিন্ন দর্শন একে অপরের মতকে গ্রহণ করে না। কিন্তু এই যে মতপার্থক্য আপাত আসলে এদের কারোর সঙ্গে কারোর ভেতরে কোনো বিরোধ নেই। আসলে ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন মতবাদ বা স্কুলগুলি এক একটি বিকল্প ব্যাখ্যাদান করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে একটা মৌলিক ঐক্যের ভিত্তি রয়েছে। এই দর্শনকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এই শ্রেণীবিভাগ নিম্নে একটি চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হল-

চিত্র : ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায়ের শ্রেণীবিভাগ
আস্তিক বা বৈদিক দর্শন

যে সকল দার্শনিক সম্প্রদায়গুলি বেদের উপর আস্থা রেখে গড়ে উঠেছে, তাদের বলা হয় আস্তিক। আস্তিক বা বৈদিক দর্শন বেদের অভ্রান্ততাকে মেনে নয়। আস্তিক দার্শনিক গোষ্ঠী দু’ধরনের। যথা-

বেদানুগ দর্শন

যে সকল দর্শন সম্প্রদায় সরাসরি বেদের উপর প্রতিষ্ঠিত তাদের বলা হয় বেদানুগ দর্শন। বেদানুগ দর্শন দু-ধরনের। যথা- মীমাংসা এবং বেদান্ত দর্শন।

বেদস্বতন্ত্র দর্শন

যে সকল দর্শন সম্প্রদায় বেদের প্রামাণ্য স্বীকার করলেও প্রত্যক্ষভাবে বেদের উপর প্রতিষ্ঠিত নয় তাদের বলা হয় বেদস্বতন্ত্র দর্শন। বেদস্বতন্ত্র দর্শন চার ধরনের। যথা- সাংখ্য, ন্যায়, যোগ এবং বৈশেষিক দর্শন।

নাস্তিক বা অবৈদিক দর্শন

যে সকল দার্শনিক সম্প্রদায়গুলি বেদের প্রামাণ্য-কে বিশ্বাস করে না তাদের বলা হয় নাস্তিক। নাস্তিক বা অবৈদিক দর্শন বেদের অভ্রান্ততাকে মেনে নেয়নি। নাস্তিক দার্শনিক গোষ্ঠী দু’ধরনের। যথা-

চরমপন্থী দর্শন

যে সকল দার্শনিক সম্প্রদায় ঘোরতর বেদ-বিরোধী তাদের চরমপন্থী বলা হয়। চরমপন্থী দর্শন দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত। যথা- চার্বাক ও বৌদ্ধ দর্শন।

নরমপন্থী দর্শন

যে সকল দার্শনিক সম্প্রদায় বেদ-বিরোধী কিন্তু ঘোরতর নয়, তাদের নরমপন্থী বলা হয়। এই দার্শনিক গোষ্ঠীর উদাহরণ হল- জৈন দর্শন।

 

ভারতীয় দর্শন ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে পার্থক্য

ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে পাশ্চাত্য দর্শনের মূল দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য আছে। ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শন এই দুই ধারায় বিকাশলাভ করেছে নিজেদের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে। এই পার্থক্য থাকার কারণ হল দুই ধারা অনুযায়ী কোন লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে সেই সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে লক্ষ্যের সংব্যাখ্যান এবং লক্ষ্য সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এসে পড়েছে। 

  1. ভারতীয় দর্শনের মতানুযায়ী চরম লক্ষ্য ঈশ্বর যিনি সৃষ্টিকর্তা এবং সত্য যার মধ্যে নিহিত। জীবন এই চরম উৎস থেকে উৎসাহিত। ঈশ্বর বা পরম ব্রহ্মকে উপলব্ধি করাই হল সত্য। অপরদিকে, পাশ্চাত্য দর্শনে কিন্তু বিপরীত ছবি দৃশ্য হয়। সেখানে ঈশ্বরই একমাত্র সত্য নয়, গুরুত্বের প্রথম পংক্তিতেও ঈশ্বর কোন বিষয় নয়।
  2. চরম সত্য হল চিরন্তন শাশ্বত, ভারতীয় দর্শন এই অপরিবর্তনীয়তায় বিশ্বাসী। কিন্তু, পাশ্চাত্য দর্শন জ্ঞানের লক্ষ্যকেই গুরুত্ব দেয় এবং জ্ঞানের অনুশীলনের জন্য অধিকতর বিশ্লেষণ পদ্ধতিকে ব্যাখ্যা করে। পাশ্চাত্য দর্শনে চরম সত্যের অপরিবর্তনীয়তা বলতে কিছু নেই।
  3. পাশ্চাত্য দর্শন জীবন প্রণালীর ক্ষেত্রে সার্বিক নির্দেশনা দেয় না। অন্যদিকে, ভারতীয় দর্শন চরম সত্যের উপলব্ধিতে সাহায্য করে।
  4. আবার ঈশ্বরের ব্যাখ্যানেও দুই দর্শনের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। ভারতীয় দর্শনকে ঈশ্বরই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রকৃতির করে তুলেছে। কিন্তু, পাশ্চাত্য দর্শন বিশেষভাবে জড়বাদী প্রকৃতির।
  5. ভারতীয় দর্শন যখন তার লক্ষ্য ও প্রকৃতিতে সার্বজনীনতা প্রদর্শন করেছে যেখানে পাশ্চাত্য দর্শন তার বিভিন্ন প্রকার দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা নিয়ে সত্যের অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক শাখার বিকাশ ঘটিয়েছে।
  6. দর্শনের অর্থ জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ। পাশ্চাত্য দর্শনের অর্থ হল জ্ঞানের অনুসন্ধান করা। কিন্তু, ভারতীয় দর্শন সত্য জ্ঞানের উপলব্ধি করতে চেয়েছে।
  7. ভারতীয় দর্শনের সংশ্লেষাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি পাশ্চাত্য দর্শনে অনুপস্থিত।

পরিশেষে ভারতীয় দর্শন যখন ইউনিফরমেটিক লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে একটি ঐক্যের ছবি তুলে ধরে। পাশ্চাত্য দর্শন সেখানে বহুমুখী চিন্তাধারা পোষণ করে। যা পারস্পরিক বিতর্কিত এবং বহু দার্শনিক তত্ত্বের বিকাশ ঘটায়।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. চন্দ, বিনায়ক। শিক্ষার প্রারম্ভিক ধারণা ও দার্শনিক ভিত্তি। আহেলি পাবলিশার্স, কলকাতা।
  2. পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
  3. বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্চনা। শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষানীতি। বি. বি. কুণ্ডু গ্র্যান্ড সন্স, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *