নারীশিক্ষায় ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা | Role of British Government in Women Education

ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা (Role of British Government in Women Education) এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যুগান্তকারী অধ্যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন এদেশে নারীশিক্ষা সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল, তখন ব্রিটিশ সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নারীদের অগ্রগতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মতাদর্শের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিক্ষানীতি কেবল নারীদের শিক্ষিতই করেনি, বরং তাদের সামাজিক অধিকার অর্জনের পথও সুগম করেছিল।
ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা (Role of British Govt.)
ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে বেশ কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। এ সময় শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক আন্দোলন ছিল পরিবর্তনের এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা বিভিন্নভাবে নারীর মর্যাদাকে প্রভাবিত করেছিল।
ফোর্বস, ২০১২ (Forbes, 2012)-এর তথ্যমতে, ১৮২১ সালে ‘চার্চ মিশনারি সোসাইটি’ কলকাতায় হিন্দু বালিকাদের জন্য ৩০টি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিল; কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকায় উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এগুলোর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও খ্রিস্টান পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। অ্যাডামের প্রথম প্রতিবেদনে (১৮৩৫) বাংলা প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকাদের জন্য বিদ্যালয় থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ‘মেকলে মিনিট’ (Macaulay Minutes)-এ দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করায় স্থানীয় ভারতীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই অসন্তোষ নিরসনে…
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নারীশিক্ষার প্রতি সরকার ও হিন্দু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ১৮৫৪ সালের ‘উডস ডেসপ্যাচ’-এ নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘জেনানা শিক্ষাব্যবস্থা’কে (অন্তঃপুরবাসিনী নারীদের জন্য গৃহভিত্তিক শিক্ষা) গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সরকারি অনুদানের মাধ্যমে একে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। সমাজ সংস্কারক ও বিভিন্ন সংগঠনও নারীশিক্ষার প্রসারে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
১৮৮২ সালের হান্টার কমিশনের প্রতিবেদনে নারীশিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। যারা মূলত গৃহের ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতেন, সেইসব নারীর ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ে ‘জেনানা শিক্ষাব্যবস্থা’ চালুর বিষয়টি এতে উৎসাহিত করা হয়। এর ফলে সমগ্র ভারতজুড়ে বহু স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা ১৮৮১-৮২ সালের ৬ জন থেকে বেড়ে উনিশ শতকের শেষ নাগাদ ২৬৪-এ উন্নীত হয়।
শিমলা সম্মেলন (Shimla Conference) ১৯০২ সালে ‘ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’ (Indian University Commission in 1902) গঠনের পথ প্রশস্ত করে। নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা যে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এই বিষয়টি অনুধাবন করে কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করে। কমিটি সুপারিশ করে যে, নারীশিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের সম্প্রসারণের জন্য সরকারকে আরও অধিক অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। শুধু তাই নয়, বালিকাদের জন্য আরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং অধিক সংখ্যক শিক্ষক ও স্কুল পরিদর্শক নিয়োগের সুপারিশও করা হয়।
লর্ড কার্জনের সংস্কারের পর সরকার ভারতীয় শিক্ষার পেছনে অধিক অর্থ ব্যয় করতে শুরু করে। তা সত্ত্বেও, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার অবস্থার বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। এর কারণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বয়ের অভাব এবং মাত্রাতিরিক্ত ছাত্র সংখ্যা। এই পরিস্থিতি সংশোধনের লক্ষ্যে ‘স্যাডলার কমিশন’ (১৯১৭-১৯) নামে একটি নতুন কমিশন গঠন করা হয়। নারীশিক্ষার উন্নয়নের জন্য এই কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল:
- যেসব পরিবার আগ্রহী, তাদের মেয়েদের শিক্ষার জন্য ‘পর্দা’ প্রথা মেনে চলে এমন স্কুল বা ‘পর্দা স্কুল’-এর ব্যবস্থা করা।
- পৃথক বালিকা বিদ্যালয় না থাকলে সহ-শিক্ষার (Co-education) ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
- নারী শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
- ছাত্রীদের জন্য চিকিৎসা বিষয়ক শিক্ষার (Medical courses) ব্যবস্থা করা।
ভারতীয় শিক্ষার প্রধান সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করার জন্য স্যার ফিলিপ হার্টগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কমিটি ‘হার্টগ কমিটি’ (১৯২৯) নামে পরিচিত ছিল। নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা যে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এই বিষয়টি অনুধাবন করে কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করে। কমিটির সুপারিশগুলি হল-
- ছেলে ও মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব ও সমান অর্থ বরাদ্দ করা।
- স্থানীয় সংস্থাগুলোতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
- গ্রামীণ এলাকায় মেয়েদের জন্য আরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা।
- নারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
অ্যাবট ও উড রিপোর্ট (১৯৩৭) ১৯৩০-এর দশকের অর্থনৈতিক মন্দা কর্মসংস্থানের প্রেক্ষিতে দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং তার ফলে পরিবর্তনের তাগিদ দেখা দেয়। ফলে ১৯৩৭ সালে অ্যাবট ও উডের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়, যা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। নারীশিক্ষার উন্নয়নের জন্যও এই কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল, যেমন- প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া, নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা এবং নারীশিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইত্যাদি।
উপরে উল্লিখিত বিভিন্ন কমিটি ও কমিশনের সুপারিশগুলো বিশ্লেষণ করলে বলা যায় যে, ব্রিটিশ ভারতে নারীশিক্ষার প্রসারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং নারীশিক্ষার উন্নয়নে ব্রিটিশ সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- চট্টোপাধ্যায়, মিহির কুমার এবং সেনগুপ্ত, মধুমালা। নারীশিক্ষা। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।
- Sengupta, Madhumala (May, 2018). Study Material. Netaji Subhas Open University.
- Women Education in British India. https://yoopery.com/women-education-in-british-india/
- Tschurenev, Jana (Sep. 2022). “Women and Education Reform in Colonial India: Trans-regional and Intersectional Perspectives.” New Perspectives on the History of Gender and Empire: Comparative and Global Approaches. Ed. Ulrike Lindner and Dörte Lerp. London:Bloomsbury Academic. 241–268.






