গবেষণার নৈতিকতা | Research Ethics

গবেষণার নৈতিকতা (Research Ethics) কেবল কিছু নিয়ম বা নির্দেশিকার সমষ্টি নয়; বরং এটি গবেষণার সততা ও নির্ভরযোগ্যতার মূল ভিত্তি। যেকোনো সৃজনশীল বা বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সত্যের অনুসন্ধান; আর এই অনুসন্ধান যাতে বিতর্কমুক্ত থাকে এবং মানবকল্যাণের অভিমুখে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য গবেষণার নৈতিকতা মেনে চলা অপরিহার্য।
গবেষণা নৈতিকতার ধারণা
নৈতিকতা বা নীতিবোধ এর অর্থ হল সঠিক এবং ভুলের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারার ক্ষমতা। নীতিবোধের বিস্তৃতি অনেক ব্যাপক এবং গভীর এমন কিছু বিষয় আছে যা আইনে নেই কিন্তু নীতিবিরুদ্ধ। তাই নৈতিকতার বিষয়টি অনেক গভীর। গবেষণা নৈতিকতা হল ‘নৈতিক’ নীতিগুলি যা নির্ধারিত করে যে, কীভাবে একজন গবেষকের গবেষণার কাজ চালানো উচিত। এই নীতিগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি বা সরকারগুলির মতো গোষ্ঠীগুলির দ্বারা একমত হওয়া গবেষণা প্রণিধানগুলিকে আকার দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। সমস্ত গবেষককে তাদের কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো বিধি বিধান অনুসরণ করা উচিত। বছরের পর বছর ধরে, বিভিন্ন ব্যক্তি গবেষকদের জন্য নৈতিক নীতি নির্ধারণ করেছেন।
গবেষণার ক্ষেত্রেও নৈতিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কারণ গবেষণাকারী যদি গবেষণার ক্ষেত্রে নৈতিকতা বজায় না রাখেন তাহলে তা সমাজের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন- গবেষণার স্বার্থে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে কিন্তু, কোনভাবেই ওই ব্যক্তির গোপনীয়তা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকে থেকে গবেষণাকারীকে সতর্ক থাকতে হবে। গবেষকদের কাজটি আদেও নীতিগত কিনা তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করার জন্য, অনেকগুলি সংস্থা তাদের নিজস্ব নির্দেশিকা তৈরি করে: করনীয় বা করনীয় নয়-এর চেকলিস্ট যা গবেষককে তাদের গবেষণাটি নৈতিক কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহারিক পদক্ষেপগুলি নির্ধারণে সহায়তা করে থাকে।
গবেষণার সাধারণ নীতিমালা
গবেষণা নীতিশাস্ত্র গবেষণার দায়িত্বশীল পরিচালনার জন্য গাইডলাইন সরবরাহ করে। নীচে কিছু নৈতিক নীতিগুলির একটি সাধারণ সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হল-
সততা এবং নিষ্ঠা
প্রথম সাধারণ নীতিটি হল সততা এবং নিষ্ঠা; সৎভাবে তথ্য সংগ্রহ, ফলাফল, পদ্ধতি এবং প্রকাশের স্থিতির প্রতিবেদন রচনা করা দরকার। উপাত্তে কোনো প্রকার ভেজাল বা মিথ্যা উপস্থাপন করা যাবে না।
উদ্দেশ্য
পরবর্তী নীতি হল ‘উদ্দেশ্য’। পরীক্ষামূলক নকশা, তথ্য বিশ্লেষণ, উপাত্তের ব্যাখ্যা, সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনা, কর্মীদের সিদ্ধান্ত, অনুদান, বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্য এবং গবেষণার অন্যান্য দিকগুলিতে পক্ষপাত এড়ানোর চেষ্টা করা উচিত।
বৈজ্ঞানিক সততা
একজন গবেষক নিজ প্রতিশ্রুতি এবং চুক্তি বজায় রেখেই সম্পূর্ণ গবেষণা প্রক্রিয়াটি শেষ করবেন এটাই কাম্য। এক্ষেত্রে আন্তরিকতার সাথে গবেষণা কাজ, চিন্তা ও কর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা করা উচিত। গবেষণা নীতিশাস্ত্র বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় এবং তাদের কাজের সততা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখে। গবেষণায় সঠিক তথ্য ব্যবহার করলে জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, ভুল তথ্য সমাজকে বিভ্রান্ত করে।
সাবধানতা
নিজ কাজের প্রতি গাফিলতি বা যেকোনো ত্রুটি বা অবহেলা চলবে না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাহিত্য পর্যালোচনার মাধ্যমে সমবয়সীদের কাজ সাবধানতার সাথে এবং সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা দরকার।
আধ্যাত্মিক সম্পত্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন
পেটেন্টস, কপিরাইটস, পুস্তক, গ্রন্থ এবং আধ্যাত্মিক সম্পত্তির অন্যান্য ধরনের প্রতি অনুমতি ছাড়াই অপ্রকাশিত উপাত্ত, পদ্ধতি বা ফলাফল ব্যবহার করা উচিত নয়, এটি চুরির সমতুল্য।
অংশগ্রহণকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা
গবেষকদের অবশ্যই তাদের গবেষণার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের অধিকার, মর্যাদা এবং গোপনীয়তার প্রতি সম্মান জানাতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অবহিত সম্মতি গ্রহণ, গোপনীয়তা নিশ্চিতকরণ এবং সম্ভাব্য ক্ষতি রোধ।
সামাজিক দায়বদ্ধতা
গবেষকদের তাদের কাজের বৃহত্তর সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা উচিত এবং সামাজিক কল্যাণ প্রচারের জন্য প্রচেষ্টা করা উচিত। গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজের উপকার করা এবং অংশগ্রহণকারীদের ক্ষতি এড়ানো। গবেষণা পরিচালনা করার আগে গবেষকদের অবশ্যই সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সুবিধাগুলি সাবধানতার সাথে বিবেচনা করতে হবে। একজন গবেষককে তার গবেষণার মাধ্যমে সমাজে ভালো কিছুর প্রচার এবং সামাজিক ক্ষতি প্রতিরোধ বা হ্রাস করার প্রচেষ্টা করা দরকার।
গোপনীয়তা
গবেষকদের অবশ্যই অংশগ্রহণকারীদের তথ্য গোপন বা বেনামী রেখে তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। যেমন- প্রকাশের জন্য জমা দেওয়া কাগজপত্র বা অনুদান, কর্মীদের রেকর্ড, বাণিজ্য বা সামরিক গোপনীয়তা এবং রোগীর রেকর্ডগুলি সুরক্ষিত রাখতে হবে।
মানবিক বিষয় সংরক্ষণ
যেসব গবেষণায় মানুষ অংশগ্রহণ করে, সেখানে তাদের সম্মতি, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা জরুরি। সেহেতু, মানবীয় বিষয় নিয়ে গবেষণা করার সময় ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি হ্রাস এবং সর্বাধিক উপকারিতা; মানবিক মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।
বৈষম্যহীনতা
লিঙ্গ, বর্ণ, জাতি বা অন্যান্য কারণগুলির ভিত্তিতে সহকর্মী বা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এড়িয়ে চলুন যা তাদের বৈজ্ঞানিক দক্ষতা এবং অখণ্ডতার সাথে সম্পর্কিত নয়।
সম্পদের যথাযথ ব্যবহার
গবেষকদের সম্পদ (আর্থিক, সময়, ইত্যাদি) দায়িত্বের সাথে ব্যবহার করা উচিত এবং অপচয় বা অপব্যবহার এড়ানো উচিত।
সহকর্মীদের সম্মান
গবেষণার সাথে জড়িত সহকর্মীদের সম্মান করা এবং তাদের সাথে স্বাভাবিক ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা, গবেষণা নৈতিকতার অঙ্গ।
প্রামাণিকতা নিশ্চিতকরণ
নকল, চৌর্যবৃত্তি বা তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে গবেষণা করা অনৈতিক; নীতিশাস্ত্র গবেষণার মান বজায় রাখে।
বৈধতা
প্রাসঙ্গিক আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারী নীতিগুলি জানুন এবং মানুন।
গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা
নীতিগত গবেষণার অনুশীলন গবেষণার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা এবং বৈধতাকে বৃদ্ধি করে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- দাস, কৌশিক এবং সাহা, সঙ্গীতা। শিক্ষামূলক গবেষণার রূপরেখা। গ্লোবাল নেট পাবলিকেশন, কলকাতা।
- Kothari, C. R. Research Methodology: Methods and Techniques. New Age International Publishers, New Delhi.
- Babbie, Earl. THE BASICS OF SOCIAL RESEARCH (4th ed.). Thomson Wadsworth, USA.
- Koul, Lokesh. Methodology of Educational Research. Vikas Publishing House PVT LTD, New Delhi.

