পরিবর্তিত স্কোর | Derived Score

আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্সে পরিবর্তিত স্কোর (Derived Score) হল এমন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা কাঁচা তথ্যকে (raw data) মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তরিত করে। মূলত, কোনো পরীক্ষা, সার্ভে বা উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে সরাসরি প্রাপ্ত কাঁচা স্কোরকে নির্দিষ্ট গাণিতিক, পরিসংখ্যানগত বা যৌক্তিক নিয়মের সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করে যে পরিমার্জিত মান পাওয়া যায়, তাই হল পরিবর্তিত স্কোর। প্রাথমিক স্কোরের নিজস্ব কোনো স্পষ্ট অর্থ অনেক সময় থাকে না; সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য করে তোলার জন্য কিংবা অন্য কোনো স্কোরের সাথে তুলনার উপযোগী করার লক্ষ্যে যখন সেই প্রাথমিক স্কোরকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সমন্বয় বা পরিবর্তন করা হয়, তখন তাকে পরিবর্তিত স্কোর বলে।
পরিবর্তিত স্কোরের ধারণা
যখন কোনো প্রাপ্ত স্কোরকে আমরা প্রয়োজনীয় একটি তুলনাযোগ্য এককে পরিবর্তন করি তখন তাকে বলা হয়, রূপান্তরিত স্কোর বা পরিবর্তিত স্কোর। পরিবর্তিত স্কোর যে পদ্ধতিতে নির্ধারিত করা হয়, তাকে বলা হয় স্কেলিং পদ্ধতি। পরিবর্তিত স্কোরের একটি নির্দিষ্ট গড় (Mean) মান এবং নির্দিষ্ট আদর্শ বিচ্যুতি (SD) থাকে। এই দুটি মানকে স্কোরের প্রাসঙ্গিকতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তিত স্কোর রাশিবিজ্ঞানে ব্যবহার করা হয়। যথা- Z-স্কোর, আদর্শ স্কোর, T-স্কোর, C-স্কোর এবং Stanine Score.
Z-স্কোর (Z-Score)
কোনো প্রাপ্ত বণ্টনে একটি নির্দিষ্ট স্কোর, ঐ বণ্টনের গড়ের কত আদর্শ বিচ্যুতি উপরে বা নীচে আছে তা বোঝানোর জন্য Z-স্কোর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। Z-স্কোরের গড় শূন্য (0) এবং আদর্শ বিচ্যুতি ‘1’ ধরা হয়ে থাকে। তাই 0 ও 1 সম্যক বিচ্যুতির বণ্টনে কোনো প্রাপ্ত স্কোরকে পরিবর্তিত করলে যে স্কোর পাওয়া যায় তাই হল Z-স্কোর।
এই স্কোর নির্ণয়ের সূত্র হল-

এখানে,
X = বণ্টনের কাঁচা স্কোর
M = বণ্টনের গড়
σ = বণ্টনের সম্যক বিচ্যুতি
Z-স্কোর হল সরলতম ও সহজতম পরিবর্তিত স্কোর। প্রাপ্ত স্কোরকে Z-স্কোরে পরিবর্তন করলে প্রাপ্ত স্কোরের তাৎপর্য নির্ণয় করা সহজ হয়। তবে এর প্রধান অসুবিধা হল এই যে এর মান খুব ছোট হয় ও এর সঙ্গে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চিহ্ন যুক্ত থাকে। তাছাড়া প্রাপ্ত বণ্টন যদি স্বাভাবিক না হয় অর্থাৎ স্কুড (skewness) হয় তাহলে Z-স্কোরের বণ্টনটি স্কুড হবে।
Z-স্কোরের সুবিধা
- Z-স্কোর বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত শিক্ষামূলক তথ্যাবলীকে একটি নির্দিষ্ট এককে পরিবর্তন করতে সহায়তা করে।
- শিক্ষামূলক অভীক্ষা প্রস্তুত করার সময়, অভীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত প্রশ্নগুলিকে তাদের কাঠিন্যের মান অনুসারে সাজানোর জন্য Z-স্কোর ব্যবহার করা হয়।
- প্রাপ্ত স্কোরগুলিকে Z-স্কোরে পরিবর্তন করলে, তাদের মধ্যে পারস্পরিক তুলনা করা সহজ হয়।
- কোনো প্রাপ্ত স্কোরকে Z-স্কোরে পরিবর্তন করলে, তার অনেক বেশি তাৎপর্য নির্ণয় করা যায়।
Z-স্কোরের অসুবিধা
- Z-স্কোর গুলির মান হয় খুবই কম। Z-স্কোর নির্ণয় করার সময়, তাই অন্তত পক্ষে দুই দশমিক স্থান পর্যন্ত মান বের করতে হয়।
- যে কোনো প্রাপ্ত বণ্টনকে Z-স্কোরে পরিবর্তন করলে সেই পরিবর্তিত বণ্টনের কতকগুলি স্কোর হবে ধনাত্মক এবং কতকগুলি স্কোর হবে ঋণাত্মক। এই দুই ধরনের স্কোর মান নিয়ে একত্রে কাজ করা ব্যবহারিক দিক থেকে অসুবিধা জনক।
- Z-স্কোর সামগ্রিকভাবে ও সার্বজনীনভাবে প্রাপ্ত স্কোরগুলির স্কেলিং বা সামঞ্জস্য আনতে ব্যর্থ হয়।
- Z-স্কোর সর্বক্ষেত্রে সাধারণভাবে ব্যবহার করা যায় না।
নিম্নে একটি সমস্যার সমাধান করে দেখান হল-

আদর্শ স্কোর (Standard Score)
Z-স্কোরের অসুবিধা দূর করার জন্য আর এক ধরনের পরিবর্তিত স্কোর ব্যবহার করা হয়, তার নাম আদর্শ স্কোর। স্বাভাবিকভাবে এখানে দুটি কাজ করা হয়। যথা-
- Z-স্কোরের মান বৃদ্ধি করা হয়।
- Z-স্কোরের সব মানগুলিকে ধনাত্মক করা হয়।
এখানে পরিবর্তিত বণ্টনের গড় ও সম্যক বিচ্যুতি এমনভাবে নির্বাচন করা হয় যাতে প্রত্যেকটি Z-স্কোরের মান ধনাত্মক ও পূর্ণসংখ্যা হয়।
এই স্কোর নির্ণয়ের সূত্র হল-

এখানে,

Z-স্কোর ও আদর্শ স্কোরের মধ্যে পার্থক্য
- Z-স্কোরের গড় শূন্য (0) এবং আদর্শ বিচ্যুতি ‘1’ হয়ে থাকে। অপরদিকে, আদর্শ স্কোরের গড় বা সম্যক বিচ্যুতি উভয়েই নির্বাচিত। তাই তারা যেকোনো মান সম্পন্ন হতে পারে।
- Z-স্কোরের বণ্টনে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক উভয় ধরনের স্কোর থাকে। অপরদিকে, আদর্শ স্কোর বণ্টনে সব স্কোরগুলিকে ধনাত্মক করার জন্যই প্রয়োজনমত গড় ও আদর্শ বিচ্যুতি নির্বাচিত করা হয়।
- Z-স্কোর গুলির মান খুবই কম হয়। তাই সঠিকভাবে পারস্পরিক তুলনার জন্য, তাদের দুই দশমিক স্থান পর্যন্ত বিচার করতে হয়। অপরদিকে, উপযুক্ত গড় ও আদর্শ বিচ্যুতি নির্বাচন করে পরিবর্তনের সময় আদর্শ স্কোরগুলির ইচ্ছামত মান বৃদ্ধি করা হয়। ফলে আদর্শ স্কোরগুলিকে পূর্ণমান সম্পন্ন হিসাবে ধরা হয়।
- Z-স্কোরের পরিমাপক একক হিসাবে নিজস্ব বণ্টনের সম্যক বিচ্যুতিকেই ধরা হয়। অপরদিকে, আদর্শ স্কোরের ক্ষেত্রে পরিমাপক একক হয়, পরিবর্তিত বণ্টনের আদর্শ বিচ্যুতি।
T-স্কোর (T-Score)
পরিবর্তিত আদর্শ স্কোরের তাৎপর্য স্বাভাবিক বণ্টনের যে সার্বজনীন নিয়মাবলী তার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। এই অসুবিধা দূর করার জন্য, অর্থাৎ পরিবর্তিত স্কোরকে সার্বজনীন ভিত্তিতে বিচার করার সুবিধার জন্য, প্রাপ্ত স্কোরকে একটি আদর্শ স্কোরে পরিবর্তন করার সময় স্বাভাবিক বণ্টনের নিয়মাবলী পরিবর্তন করা হয়। অর্থাৎ, প্রাপ্ত বণ্টনটি স্বাভাবিক বণ্টনের লেখচিত্রের অন্তর্গত ক্ষেত্র অনুযায়ী স্বাভাবিকৃত করা হয়, ওর পরে সেই স্কোরগুলিকে আদর্শ স্কোরে পরিবর্তন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় যে এক ধরনের যে পরিবর্তিত স্কোর পাওয়া যায়, তাকে রাশিবিজ্ঞানে বলে T-স্কোর। T-স্কোর হল এমন এক ধরনের পরিবর্তিত স্কোর যার গড়= 50, আদর্শ বিচ্যুতি= 10 হবে।
T-স্কোর নির্ণয়ের সূত্র হল- T = 10z + 50
এখানে,
T = T-স্কোর
Z = Z-স্কোর
T-স্কোরের বৈশিষ্ট্য
- T-স্কোর হল এক ধরনের আদর্শ স্কোর যার গড় হল 50 এবং সম্যক বিচ্যুতি হল 10।
- T-স্কোরের পরিমাপক স্কেল -5σ বিন্দু থেকে শুরু হয় যার মান ধরা হয় ‘0’ এবং +5σ বিন্দুতে শেষ হয়, যার মান ধরা হয় 100।
- T-স্কোরের বণ্টনটি একটি স্বাভাবিক বণ্টন হয়। কারণ, প্রাপ্ত স্কোরকে T-স্কোরে রূপান্তরিত করার সময় বণ্টনটিকে স্বাভাবিক করে নেওয়া হয়।
- T-স্কেলের শূন্য ‘0’ মান যেহেতু একপ্রান্তে থাকে, সেহেতু T-স্কোরের মানগুলি সবই ধনাত্মক হয়।
C-স্কোর (C-Score)
C-স্কোর (C-Score) হল শিক্ষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক পরিসংখ্যানে ব্যবহৃত এক ধরনের স্ট্যান্ডার্ড স্কোর (Standard Score), যা কাঁচা স্কোরকে C-স্কোরে রূপান্তর করার জন্য, C-স্কেলটি এমনভাবে সাজানো হয় যাতে এর গড় হয় 5.0 (ঠিক মাঝখানে) এবং স্কেলের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বিন্দু হল যথাক্রমে 0 ও 10। এই স্কেলটির পরিসর 0 থেকে 10 পর্যন্ত এবং এতে 11 টি একক রয়েছে। এই স্কেলে, মূল কাঁচা স্কোরের একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসের জন্য 11 টি স্কোর বিভাগ বা গ্রুপ থাকে। এই বিভাগ বা গ্রুপগুলোর প্রত্যেকটিকে 1 থেকে 10 পর্যন্ত একটি পূর্ণসংখ্যার মান দেওয়া হয়।
এটি মূলত প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জে.পি. গিলফোর্ড কর্তৃক (J.P. Guilford) উদ্ভাবিত একটি পদ্ধতি। ‘C-Score’ (C-স্কোর) পরিভাষাটি দিয়ে “Centile Score” বা “Guilford’s C-Scale”-কে বোঝানো হয়। এই পদ্ধতিতে মোট 11 টি ধাপ রয়েছে, যেখানে গড় মান (Mean Score) সর্বদা 5 হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং এতে আদর্শ বিচ্যুতি (Standard Deviation)-র বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকে।
স্ট্যানাইন স্কোর (Stanine Score)
C-স্কেলে সংস্কার আনার প্রয়োজনীয়তা থেকে নতুন একটি স্কেলের জন্ম হয়। এই নতুন স্কেলটির নামকরণ করা হয়েছিল স্ট্যানাইন স্কেল। এই সংক্ষিপ্ত স্কেলে, C-স্কেলে ব্যবহৃত 11 টির পরিবর্তে 9 টি বিভাগ রয়েছে। এই ধরনের সংক্ষিপ্তকরণের জন্য, C-স্কেলের উপরের এবং নিচের উভয় প্রান্তের দশটি বিভাগকে একত্রিত করা হয় এবং এর ফলে বিভাগ 1 এবং 10-এ বণ্টনের 4% থাকে। এইভাবে C-স্কেলের বিভাগ 0 এবং 10-কে 1 থেকে 9 পর্যন্ত সংখ্যায়িত 9 টি বিভাগ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়। এই 9-পয়েন্ট স্কেলটি স্ট্যানাইন (স্ট্যান্ডার্ড নাইন-এর সংক্ষিপ্ত রূপ) স্কেল নামে পরিচিত। স্ট্যানাইন স্কেলের গড় 5 এবং আদর্শ বিচ্যুতি 1.46। স্ট্যানাইন স্কেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি এয়ার ফোর্স এভিয়েশন সাইকোলজি প্রোগ্রাম (Army Air Force Aviation Psychology) দ্বারা তাদের পরীক্ষার স্কোরগুলিকে স্ট্যান্ডার্ড নাইন বিভাগে রূপান্তর করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। এই ধরনের পদ্ধতিতে, তারা সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ 1 থেকে 9 পর্যন্ত পূর্ণসংখ্যা নির্ধারণ করে প্রাপ্ত স্কোরগুলিকে নয়টি বিভাগে দলবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল।
পরিবর্তিত স্কোর ব্যবহারের কারণ
মনোবৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক পরিমাপের ক্ষেত্রে যে সমস্ত কাঁচা স্কোর পাওয়া যায়, তার দ্বারা সঠিকভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। যেমন ধরা যাক, কোনো একটি পরীক্ষায় একটি ছাত্র 100 নম্বরের মধ্যে 80 নম্বর পেয়েছে। তার দ্বারা আমরা বলতে পারি না যে, ছাত্রটি ওই বিষয়ে বেশ ভালো। কারণ এমন হতে পারে যে, ওই পরীক্ষায় প্রশ্নগুলি খুব সহজ ছিল এবং প্রায় সকল ছাত্র 80 এর উপরে পেয়েছে। আবার এমন যদি হয় যে, দুটি ছাত্রের একজন গণিতে 40 এবং অপরজন ভৌতবিজ্ঞানে 35 পেয়েছে। এই দুটি বিষয়ে উভয়েরই প্রাপ্ত নম্বরের যোগফল 80 তার দ্বারা বলতে পারা যায় না যে ঐ দুজন ছাত্রের ঐ দুটি বিষয়ে পারদর্শিতা সমান। এসব অসুবিধা দূর করার জন্য পরিবর্তিত স্কোর ব্যবহার করা হয়।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- Mangal, S.K. Statistics in Education and Psychology. PHI Learning Private Limited, New Delhi.
- Ali, L. Statistics in Education and Psychology. Global Net Publication, New Delhi, India.
- Garrett, H.E. Statistics in Psychology and Education. Surjeet Publications, Delhi, India.
- চক্রবর্তী, ড. অনিরুদ্ধ। শিক্ষায় পরিমাপ ও মূল্যায়ন। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।






