বৌদ্ধ দর্শন এবং শিক্ষাতত্ত্বে এর প্রভাব | Buddhist Philosophy and Its Impact in Education

প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বৌদ্ধ দর্শন এবং শিক্ষাতত্ত্বে এর প্রভাব (Buddhist Philosophy and Its Impact in Education) ছিল এক বৈপ্লবিক জীবনদর্শন। গৌতম বুদ্ধের দর্শনের মূলে ছিল যুক্তি, নৈতিকতা এবং প্রজ্ঞা যা শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।

বৌদ্ধ দর্শনের প্রথম প্রবক্তা ছিলেন গৌতম বুদ্ধ, যিনি আর্ত জনসাধারণের কাছে সিদ্ধার্থ নামে পরিচিত। পরে জ্ঞান লাভ করে তিনি বুদ্ধ নামে বিখ্যাত হন। পালিভাষায় প্রচারিত বুদ্ধদেবের বাণীই হল বৌদ্ধ দর্শনের মূল কথা। ত্রিপিটক অর্থাৎ পালিভাষায় (তখনকার আঞ্চলিক ভাষা) লেখা তিনটি গ্রন্থে তাঁর অভিমত লিপিবদ্ধ করা আছে। ত্রিপিটকে যা লেখা আছে তার মূল বক্তব্য হল জনসাধারণকে কিরূপে রোগ, শোক ও মানসিক দুর্দশা থেকে মুক্ত করা যায়। ত্রিপিটকের তিনটি গ্রন্থের নাম হল- ১) বিনয় পিটক ২) সুত্ত পিটক ৩) অভিধর্ম পিটক। বুদ্ধদেব নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছিলেন যে মানব জীবন দুঃখময়, তাই তার লক্ষ্য ছিল আর্ত জনসাধারণকে দুঃখময় জীবন থেকে মুক্ত করে আদর্শ জীবনযাপনের পথে চালিত করা। তাঁর ব্যবহারিক ও প্রয়োগ ভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতিতে তত্ত্বজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষার কোনো স্থান ছিল না। একমাত্র শাস্তির পথই মানুষকে কিরূপে পবিত্র করে শুধু তারই নির্দেশনা তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন। বুদ্ধদেবের দর্শন ছিল প্রয়োগমূলক ও অভিজ্ঞতা ভিত্তিক বৌদ্ধ দর্শন অবৈদিক তবে কেউ কেউ তাকে পুরোপুরি নাস্তিক না বলে অজ্ঞেয়বাদী বা agnostic বলেন। বৌদ্ধ দর্শন যে চারটি মূল ভাবনার উপর দাঁড়িয়ে আছে সেগুলি হল- ১) প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্ব ২) আত্মার স্বরূপ ৩) সব কিছুর অনিত্যতা ৪) জ্ঞানতত্ত্ব মূলক বৈশিষ্ট্য। এই চারটি মূল ভাবনাকে Four Noble Truth বা চারটি মহাসত্য বলে।

 

চারটি মহাসত্য (Four Noble Truth)

প্রথম মহাসত্য হল- জীবনে দুঃখ আছে। দ্বিতীয় মহাসত্য হল- কার্য কারণ মতবাদ অনুযায়ী দুঃখের কারণ আছে। এই কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বুদ্ধদেব দুঃখের কারণ হিসাবে ১২টি উপাদানকে চিহ্নিত করেছেন। এই কারণগুলি হল- জরা, মরণ, জন্ম, বাসনা, সংযোগ, তৃষ্ণা, বেদনা, স্পর্শ, ষড়ায়তন, নামরূপ, বিজ্ঞান, সংস্কার ও অবিদ্যা। তৃতীয় আর্যসত্য হল- দুঃখ দূর করা সম্ভব, দুঃখের বারোটি কারণকে নিরোধ করতে পারলে মানুষের দুঃখ নিবৃত্তি সম্ভব। মানুষ চেষ্টা করলে বোধি বা আত্মজ্ঞান লাভ করে নির্বাণলাভ করতে পারে। জীবনে কামনা বাসনা থেকে মুক্তিলাভ করাই হল নির্বাণ লাভ করা। এই অবস্থা প্রাপ্ত হলে মানুষ আপার আনন্দ ও শান্তি অবস্থায় বিরাজ করতে পারে। চতুর্থ আর্যসত্য হল- দুঃখ নিবৃত্তির জন্য নির্বাণ লাভের পথ খোলা আছে। এই পথ হল অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এর প্রথমটি সম্যক দৃষ্টি, দ্বিতীয়টি সম্যক্ সংকল্প, তৃতীয়টি সম্যক বাক্, চতুর্থটি সম্যক কর্মান্ত, পঞ্চমটি সম্যক আজীব, ষষ্ঠটি হল সম্যক ব্যায়াম, সপ্তম মার্গটি হল সম্যক স্মৃতি এবং অষ্টম মার্গটি সমাধি। বৌদ্ধ মতে আত্মা হল চেতনার প্রবাহ, যা কখনও থেমে থাকে না। আত্মা অনিত্য। আত্মার অন্তর জগতে যে বিজ্ঞান সৃষ্টি হয় তা থেকে পরবর্তী বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়। বৌদ্ধ দর্শন মতে মানুষের বাসনাও পূর্ব বিজ্ঞান থেকে উত্তর বিজ্ঞানে প্রবাহিত হয়। ভাই বৌদ্ধ দর্শনে পূর্বজন্মের ফল-এ জন্মও ভোগ করার কথা বলা হয়েছে। একমাত্র কর্মফল নিবৃত্ত হলেই মানুষ জন্ম মৃত্যুর প্রবাহ থেকে মুক্ত হতে পারে।

বুদ্ধদেবের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ দার্শনিকগণ মহাযান ও হীনযান নামে দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যায়। হীনযান আবার দুটি ভাগে বিভক্ত। যথা- ১) সৌত্রান্ত্রিক ২) বৈভাষিক। সৌত্রান্ত্রিকদিগের মতে বাহ্যবস্তুকে অনুমানের সাহায্যে জানা যায়। কিন্তু বৈভাষিক মতে বাহ্য বস্তুর জগতকে আমরা সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করতে পারি। বৈভাষিক সম্প্রদায় পরমাণুবাদী। এরা মনে করে প্রত্যেক বস্তুই অসংখ্য পরমাণু দ্বারা গঠিত। এই পরমাণুকে অতীন্দ্রিয়ের দ্বারা উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু পরমাণুগুলি পুঞ্জীভূত হয়ে বস্তুতে পরিণত হলে তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়।

 

জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology)

বৌদ্ধ সম্প্রদায় কেবল প্রত্যক্ষ ও অনুমান-কে প্রমা বা জ্ঞানের উৎস হিসাবে স্বীকার করে। প্রত্যক্ষ আবার দু’ধরনের। সবিকল্প ও নির্বিকল্প। আমাদের অস্তিত্ব ও চিন্তার মাঝে যে আড়াল থাকে তাকে ভভঙ্গুপচ্ছেদ বা মনের দ্বার বলে। মনের যে সাতটি ভালগুণ রয়েছে সেগুলি হল- স্পর্শ, বেদনা, সংজ্ঞা, চেতনা, একাগ্রতা, জীবিতিন্দ্রিয় ও মনোসিকার। এইগুলির মাধ্যমে বিষয় বা বস্তুর সঙ্গে ব্যক্তির একটি সামগ্রিক সম্পর্কের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে বস্তু বা বিষয়ের প্রতি ব্যক্তি একটি বিশেষ মনোযোগের তাগিদ অনুভব করে। এই অবস্থাকে বলে মনোসিকার। অর্থাৎ, মন তখন বিষয় বা বস্তুটিকে মেনে নিয়ে তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। এইবার বস্তুটি ক্রমশ মনের অন্তরে প্রবেশ করে একটি কম্পন বা আলোড়নের সৃষ্টি করে। এই আলোড়নই মনের সঞ্চিত জ্ঞানের সঙ্গে বিষয় বা বস্তুটির নতুন জ্ঞানের মিলন ঘটায়। এই অবস্থাকে বলে জবন যাকে বর্তমানে Psychology-র ভাষায় apperception বা সংপ্রত্যক্ষ বলা হয়। এইভাবে কোনো বিষয় বা বস্তুর জ্ঞান ব্যক্তির মধ্যে আত্তীকৃত হয়। আলোড়ন বা কম্পন যদি ক্ষীণ হয় তবে কোনো বিষয় বা বস্তু সম্বন্ধে জ্ঞান আত্তীকৃত হওয়া সম্ভব নয়।

 

শিক্ষাক্ষেত্রে বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব

শিক্ষাতত্ত্বে ও প্রয়োগে এই বৈশিষ্ট্য কতখানি প্রাসঙ্গিক কিংবা শিক্ষার যেসব ক্ষেত্রে বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, তা নিম্নে তুলে ধরা হল-

শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে

বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্য হল জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি এবং চূড়ান্ত শান্তি বা নির্বাণ লাভ। বুদ্ধদেব মনে করতেন, মানুষের দুঃখের কারণ হল অজ্ঞতা। আর এই অজ্ঞতাকে দূর করতে পারলেই মানুষের মুক্তি ঘটবে। এই জন্য বৌদ্ধ দর্শনে অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের উপর জোর দিয়েছে। এছাড়া বৌদ্ধ দর্শনে, জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে মানবসেবা, বাস্তববাদী, স্বাবলম্বী হওয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।

পাঠক্রম

বৌদ্ধ দর্শনে লৌকিক জ্ঞানের পরিবর্তে ত্রিপিটক পাঠের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ত্রিপিটকের তিনটি অংশ, যথা- ১) বিনয় পিটক (আচরণ বিধি) ২) সুত্ত পিটক (বুদ্ধদেবের উপদেশ ও বানী) ৩) অভিধর্ম পিটক (বৌদ্ধদর্শন ও তত্ত্ব আলোচনা)। এছাড়া; বেদ, ইতিহাস, পুরাণ, ছন্দ, ধ্বনি, ব্যাকরণ, সংগীত, কলা, বিজ্ঞান, কারিগরি বিদ্যা প্রভৃতি পড়ানো হত।

শিক্ষাদান পদ্ধতি

বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায় লিপির ব্যবহার ছিল কম। শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণরূপে মৌখিক। গল্পের মাধ্যমে বাস্তব উদাহরণ-এর সাহায্যে শিক্ষাদান কার্য পরিচালিত হত। শিক্ষণ পদ্ধতিতে অনুকরণ, আবৃত্তি, আলোচনা, হাতে-কলমে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্যক্তিগত শিক্ষাদান ছাড়া শ্রেণি শিক্ষার প্রচলন ছিল।

শিক্ষক

বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী শিক্ষক হবেন সম্যক জ্ঞানের অধিকারী। তিনি হবেন একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব, তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব দ্বারা সকল শিক্ষার্থীদের তাঁর প্রতি আকর্ষিত করবে।

শিক্ষার্থী

শিক্ষার্থী শিক্ষকদের সকল নির্দেশ মেনে চলবে, অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করে চলবে এবং বিহারের সকল নিয়ম শৃঙ্খলা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।

শৃঙ্খলা

বৌদ্ধ দর্শনে শৃঙ্খলা বলতে কেবল বাইরে থাকা কিছু চাপিয়ে দেওয়াকে বোঝায় না, বরং এটি হল আত্ম-সংযম ও নৈতিক উৎকর্ষ। বৌদ্ধ দর্শনে স্বয়ং শৃঙ্খলা (Self-discipline)-এর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধ শৃঙ্খলার মূল ভিত্তি হল শীল (Sila), যা মন ও আচরণের শুদ্ধি ঘটায়।

 

বৌদ্ধ দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা / উপসংহার

বৌদ্ধ শিক্ষা বিস্তারে পালিভাষায় (তখনকার আঞ্চলিক ভাষা) লেখা ত্রিপিটক বর্তমানে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাবিস্তারের প্রতিচ্ছবি। বৌদ্ধ দর্শনে যাকে জবন বলা হয়েছে আধুনিক শিক্ষাশ্রয়ী মনোবিজ্ঞানে সেই জবন মহান দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ ফ্রেড্রিক হার্বাট-এর ভাষায় apperception বা সংপ্রত্যক্ষরূপে শিক্ষক শিক্ষণ পরিকল্পনায় একটি বিশেষ মাত্রা এনে দিয়েছে। বৌদ্ধ দর্শন আত্ম-মুক্তিলাভের পথ হিসাবে শিক্ষাকেই প্রধান হাতিয়ার হিসাবে বেছে নিয়েছিল। অর্থাৎ, বুদ্ধদেব বলতে চেয়েছিল সবার জন্য চাই শিক্ষা। যা বর্তমান শিক্ষা পরিকল্পনায় স্বীকৃত। বৌদ্ধ শিক্ষায় সংগঠন, পাঠক্রমের বৈশিষ্ট্য ও আঞ্চলিক ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা ইত্যাদি আধুনিক শিক্ষাতত্ত্ব ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
  2. বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্চনা। শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষানীতি। বি. বি. কুণ্ডু গ্র্যান্ড সন্স, কলকাতা।
  3. চন্দ, বিনায়ক। শিক্ষার প্রারম্ভিক ধারণা ও দার্শনিক ভিত্তি। আহেলি পাবলিশার্স, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *