জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE)-১৯৮৬ | National Policy on Education (NPE)-1986

ভারতের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE)-১৯৮৬ (National Policy on Education (NPE)-1986) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। একটি জাতির মেরুদণ্ড হল তার শিক্ষা, আর সেই মেরুদণ্ডকে মজবুত ভিত্তি প্রদান করতে ১৯৮৬ সালে প্রবর্তিত হয় জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE)-১৯৮৬।

 

Table of Contents

ভূমিকা

১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE 1986) দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। সেই সময়ে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটছিল ঠিকই, কিন্তু একই সাথে দেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণজনিত সংকটে পুরো জাতি ছিল টালমাটাল। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত-উভয় শ্রেণির মানুষের মধ্যে বেকারত্বের ক্রমবর্ধমান হার দেশের শান্ত ও স্থিতিশীল পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

শিক্ষাব্যবস্থা তখন সমাজের বিদ্যমান ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারছিল না। তাছাড়া, বিশ্ব শিক্ষার অঙ্গনে তখন যেসব পরিবর্তন ঘটছিল, তার অনেক ক্ষেত্রেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ছিল। সমগ্র বিশ্ব তখন প্রযুক্তিগত, বৈজ্ঞানিক এবং কম্পিউটার বিপ্লবের জোরালো প্রভাবে আচ্ছন্ন ছিল।

ঠিক সেই সময়েই, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পেয়েছিল এক অত্যন্ত তরুণ, গতিশীল, ক্যারিশম্যাটিক এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা রাজীব গান্ধীকে। তিনি ভারতকে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন।

 

জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষার ভূমিকা

শুরুতেই, NPE শিক্ষার সারমর্ম ও ভূমিকাকে নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরেছে :

  • আমাদের জাতীয় প্রেক্ষাপটে শিক্ষা হল সকলের জন্য। এটি বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক গুরুত্ব বহন করে;
  • শিক্ষার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে; এটি মানুষের সংবেদনশীলতা ও উপলব্ধিকে পরিমার্জিত করে;
  • শিক্ষা অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরের জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তি গড়ে তোলে;
  • শিক্ষা হল এক অনন্য বিনিয়োগ।

 

জাতীয় শিক্ষানীতি ১৯৮৬ (NPE 1986)-এর প্রধান সুপারিশসমূহ

জাতীয় শিক্ষানীতি (১৯৮৬)-এর প্রধান সুপারিশসমূহ নিম্নরূপ :

সাংবিধানিক নীতির ওপর ভিত্তি করে প্রণীত

এটি আমাদের সংবিধানে বর্ণিত গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ও মূল্যবোধ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে।

শিক্ষার সুযোগ লাভ

‘জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা’র ধারণাটির মূল অর্থ হল- জাতি, ধর্ম, অঞ্চল বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। এটি অর্জনের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন অর্থায়িত কর্মসূচি চালু করে। ‘কমন স্কুল ব্যবস্থা’ (Common School System) প্রবর্তনের লক্ষ্যেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা

১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE) একটি ‘জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা’-র প্রস্তাব করেছিল। এই নীতিতে একটি সাধারণ শিক্ষা-কাঠামোর রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, যা হল ১০+২+৩ কাঠামো; দেশের সকল প্রান্তে এটি গৃহীত হয়েছে। শিক্ষার প্রথম ১০ বছরের বিন্যাস বা বিভাজন প্রসঙ্গে, এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হবে যা ৫ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা, ৩ বছরের উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষা এবং ২ বছরের মাধ্যমিক (হাই স্কুল) শিক্ষা নিয়ে গঠিত। এই জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাটি এমন একটি জাতীয় পাঠক্রম কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গঠিত ছিল, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল কিছু অভিন্ন মূল বিষয়বস্তু (common core) এবং তার পাশাপাশি কিছু নমনীয় উপাদান। এই অভিন্ন মূল বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাসমূহ এবং জাতীয় সত্তা বা পরিচয়কে লালন করার জন্য অপরিহার্য অন্যান্য বিষয়বস্তু।

সমতার শিক্ষা

দীর্ঘকালব্যাপী শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে যে অসমতা চলে আসছে, নতুন শিক্ষানীতি সেগুলি দূর করে সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ শ্রেণির অগ্রগতি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের সম-সুযোগ দানের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।

নারী সমতা বিষয়ক শিক্ষা

নারীদের সামাজিক মর্যাদায় মৌলিক পরিবর্তন আনার একটি মাধ্যম বা হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষাকে ব্যবহার করা হবে। আবাসিক শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন; শিক্ষক, নীতিনির্ধারক ও প্রশাসকদের প্রশিক্ষণ ও অভিমুখীকরণ; এবং শিক্ষাবিষয়ক গবেষণায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটি নতুন মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করবে। বিশেষ সহায়তা সেবার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে নারীদের নিরক্ষরতা দূরীকরণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিভিন্ন স্তরে বৃত্তিমূলক, কারিগরি এবং পেশাগত শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হবে।

সমাজের দুর্বল ও অনগ্রসর শ্রেণির জন্য শিক্ষা

তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি এবং অনগ্রসর অংশের শিক্ষার বিষয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE) সুপারিশ করেছিল যে, উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা, তপশিলি জাতি অধ্যুষিত এলাকা এবং অনগ্রসর এলাকাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে; পাশাপাশি ১৯৯০ সালের মধ্যে ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী তপশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত শিশুদের শতভাগ বিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া, বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণের (Reservation) ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা

জাতীয় শিক্ষানীতি সঞ্চালনমূলক অক্ষমতা বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং অন্যান্য মৃদু প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শিশুদের শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিল এবং অভিমত ব্যক্ত করেছিল যে, সাধারণ শিশুদের মতোই তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। গুরুতরভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য জেলা সদর দপ্তরগুলোতে ছাত্রাবাস সুবিধাসহ বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া, প্রতিবন্ধীদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার প্রসারে স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা (ECCE)

এই নীতিটি ছোট শিশুদের শিক্ষা ও যত্নের ওপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করেছে, বিশেষত যারা তাদের পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী (first generation learner)। এতে শিশুদের জন্য একটি ‘প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা’ (Early Childhood Care and Education, ECCE) কর্মসূচির সুপারিশ করা হয়েছে, যা ‘সমন্বিত শিশু বিকাশ পরিষেবা’ (ICDS), বালওয়াড়ি (Balwadis), রাজ্য সরকার ও পৌরসভা পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং Day-care কেন্দ্রগুলোর সাথে সমন্বিত থাকবে।

প্রাথমিক শিক্ষা এবং অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রাথমিক শিক্ষার তিনটি দিকের ওপর নতুন করে জোর দিয়েছে, যথা:

  1. সর্বজনীন ভর্তি;
  2. ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা (শিক্ষাচক্র সম্পন্ন করা); এবং
  3. শিক্ষার গুণগত মানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন।

এই নীতিতে শিশুকেন্দ্রিকতা ও কার্যকলাপ-ভিত্তিক শিখন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, এবং ‘’শারীরিক শাস্তি’ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা অনুধাবন করে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড’ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল, এমন তিনটি অপেক্ষাকৃত বড় কক্ষের ব্যবস্থা করা যা সব ধরনের আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য; এবং সেই সাথে ব্ল্যাকবোর্ড, মানচিত্র, চার্ট, খেলনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ এবং একটি বিদ্যালয় গ্রন্থাগার প্রদান করা; পাশাপাশি অন্তত তিনজন শিক্ষকের (যাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ হবেন নারী) সংস্থান করা।

প্রথামুক্ত শিক্ষা

বিদ্যালয়-ছুট শিক্ষার্থী, যেসব জনপদে কোনো বিদ্যালয় নেই সেখানকার শিশু, বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে সমস্যা রয়েছে এমন বালিকা এবং কর্মজীবী শিশুদের জন্য সমমানের একটি প্রথামুক্ত শিক্ষা কার্যক্রমের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই প্রথামুক্ত শিক্ষা কার্যক্রম (NFE) পরিচালনার দায়িত্ব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং পঞ্চায়েতি রাজ (Panchayati Raj) প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল।

মাধ্যমিক শিক্ষা

মাধ্যমিক শিক্ষা প্রসঙ্গে নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। অপ্রতুল পরিষেবা প্রাপ্ত এলাকাগুলিতে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা এবং প্রতিভাবান ও উচ্চ কৃতিত্ব সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের নিম্নলিখিত সুপারিশ বা পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল :

  1. মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের, তফসিলি জাতি (SC) এবং তফসিলি উপজাতি (ST)-দের ভর্তির সুযোগ প্রসারিত করার কর্মসূচি, বিশেষ করে অপ্রতুল পরিষেবা প্রাপ্ত এলাকাগুলিতে।
  2. অন্যান্য এলাকায় সংহতকরণের কর্মসূচি;
  3. গ্রামীণ এলাকায় তফসিলি জাতি (SC) এবং তফসিলি উপজাতি (ST)-দের জন্য সংরক্ষণসহ বিশেষ প্রতিভাধর শিশুদের জন্য গতি নির্ধারক আবাসিক বিদ্যালয় এবং নবোদয় বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা।
বৃত্তিশিক্ষা

নতুন শিক্ষানীতিতে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় এবং মাধ্যমিক শিক্ষার ‘+২’ স্তরে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক পাঠক্রম প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়। এতে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, ‘১৯৯৫ সালের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ১০ শতাংশ এবং ২০০০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৃত্তিমূলক পাঠক্রমের আওতাভুক্ত করতে হবে’ (অনুচ্ছেদ ৫.২৩, NPE 1986; ১৯৯২ সালে গৃহীত সংশোধনীসহ)। নতুন শিক্ষানীতিতে সুপারিশ করা হয়, বিভিন্ন ধরনের বৃত্তিমূলক পাঠক্রম বা কোর্সের প্রবর্তন বেকারত্ব সমস্যা লাঘবে সহায়ক হবে; কারণ এর ফলে শিক্ষিত ব্যক্তিরা তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন।

উচ্চশিক্ষা

নতুন শিক্ষানীতিতে বিদ্যমান ব্যবস্থার সার্বিক উন্নতির এবং সেই ব্যবস্থার মান যাতে অবনমিত না হয়, তার সুরক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে; পাশাপাশি ইউজিসি (UGC)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী স্বশাসিত বিভাগ ও স্বশাসিত কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এতে পাঠক্রম নির্বাচনের ক্ষেত্রে অধিকতর নমনীয়তা আনার এবং দৃশ্য-শ্রাব্য উপকরণ ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষণ পদ্ধতির রূপান্তরেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের কর্মদক্ষতার পদ্ধতিগত মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং আন্তঃবিভাগীয় গবেষণাকেও উৎসাহিত করা হয়েছে।

মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও দূরশিক্ষা

নীতিমালায় সুপারিশ করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের অনন্য চাহিদা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে নমনীয়তার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই নীতিমালা দেশের দূরশিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বিত করার দায়িত্ব ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (IGNOU) ওপর অর্পণ করেছে।

শিক্ষণ প্রক্রিয়ার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ

শিক্ষকের উচিত শ্রেণীকক্ষ এবং সামগ্রিকভাবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতার মাধ্যমে বিচিত্র সব বিষয় শিখতে পারে।

নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব

সমাজে কাঙ্ক্ষিত ও ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনে শিক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা ও গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা জাগিয়ে তোলা অপরিহার্য।

পরীক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ

শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ দূর করার লক্ষ্যে, এই শিক্ষানীতিতে পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে ‘বিভাগ’ (Division)-এর পরিবর্তে ‘গ্রেড’ (Grade) প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়াও, এই নতুন শিক্ষানীতিতে পর্যায়ক্রমিক বা নিয়মিত পরীক্ষার (Periodical tests) আয়োজনের সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষককেই একমাত্র ও পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব প্রদান করা উচিত।

বারো মাসব্যাপী প্রাথমিক বিদ্যালয়

নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তত দুটি শ্রেণীকক্ষ এবং অন্তত দুজন শিক্ষক থাকবেন; এই দুজন শিক্ষকের মধ্যে একজন হবেন নারী। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বছরের বারো মাসই সচল থাকবে।

চাকুরী থেকে ডিগ্রির বিচ্ছিন্নকরণ 

জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE) নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চাকরি থেকে ডিগ্রিকে বিচ্ছিন্ন করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। নির্দিষ্ট চাকরির জন্য প্রার্থীদের উপযুক্ততা যাচাইয়ের লক্ষ্যে, স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে পরীক্ষা পরিচালনার উদ্দেশ্যে একটি ‘জাতীয় মূল্যায়ন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

সর্বভারতীয় শিক্ষা পরিষেবা

শিক্ষাপ্রশাসনের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে, এই নীতিতে একটি ‘সর্বভারতীয় শিক্ষা পরিষেবা’ চালু করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই পরিষেবার আওতাভুক্ত কর্মকর্তাদের দেশের যেকোনো স্থানে বদলি করা যেতে পারে। এমনটি মনে করা হয়েছে যে, এ ধরনের বদলি ব্যবস্থা আঞ্চলিকতার অবাঞ্ছিত বন্ধনকে শিথিল করবে এবং শিক্ষাপ্রশাসনে নতুন গতিশীলতা সঞ্চার করবে।

নবোদয় বিদ্যালয় স্থাপন

এই বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পাবে। ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় ছাত্র ও ছাত্রীদের অনুপাত, এবং শহুরে ও গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের অনুপাতের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হবে। এটি একটি সম্পূর্ণ অবৈতনিক ও আবাসিক বিদ্যালয়। জাতীয় সংহতি ও একাত্মবোধ বৃদ্ধির লক্ষ্যে, এই বিদ্যালয়গুলো থেকে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ২৫ শতাংশকে শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য রাজ্যে বদলি করা হবে।

নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

ডিসট্রিক্ট ইন্সটিটিউট অফ এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (DIET) এবং ডিসট্রিক্ট বোর্ড অফ এডুকেশন (DBE)। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যরা সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষাগত চাহিদাগুলো জরিপ করবেন এবং সময়ে সময়ে সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের অবহিত করবেন।

শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ

সাক্ষরতা প্রসারে কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবহার; এবং শিক্ষার উন্নয়নে চিঠিপত্রের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম (correspondence courses), টেলিভিশন, রেডিও, স্যাটেলাইট ও ভিডিও-ভিত্তিক শিক্ষা-সামগ্রীর উপযোগিতাকে স্বীকৃতি ও গ্রহণ করা হয়েছে।

 

উপসংহার

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE) আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি দিকের ওপর সুচিন্তিত সুপারিশমালা প্রদান করেছে এবং সেই সুপারিশগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনাও পেশ করেছে। এই সুপারিশগুলো মূলত শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচিগুলোকে কার্যকর করার উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়েছে।

তবে এই শিক্ষানীতিও ত্রুটিমুক্ত নয়। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের নিরক্ষর মানুষের শতকরা ৫৪.৮ ভাগই হবে ভারতবাসী। এ কথা মনে রেখেও এই রিপোর্টে নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং অবৈতনিক আবশ্যিক প্রাথমিক শিক্ষার আর্থিক দায়িত্ব বহনে কেন্দ্রের বিশিষ্ট ভূমিকার উল্লেখ করা হল না। তা ছাড়া অনেকে মনে করেন শুধু গুটিকয়েক চাকচিক্যময় নবোদয় বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষার গতিকে ত্বরান্বিত করা যাবে না। এই ব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে কুলীন সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করবে মাত্র। মোট কথা, এই শিক্ষানীতির মধ্যে যুগান্তকারী চমকপ্রদ কিছু নেই। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে অন্যান্য কমিশনের মতো এই শিক্ষানীতিও ব্যর্থ হবে।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. Ravi, S. Samuel. A Comprehensive Study of Education. PHI Learning Private Limited, New Delhi.
  2. Banerjee, J.P. (1985). Education in India – Past, Present, Future. Central Library, Kolkata.
  3. Purkail, B.R. (1992). Milestone in Modern Indian Education. New Central  Book agency (P) Ltd, Kolkata.
  4. Saha, Prof. (Dr.) Birbal., Pandit Avijit., Saha, Dr. Gautam., Sinha, Dr. Rudra Prasad. Contemporary India and Education. Aaheli Publishers, Kolkata. 
  5. চট্টোপাধ্যায়, সরোজ। ভারতীয় শিক্ষার বিকাশ ও সমস্যা। নিউ সেন্ট্রাল বুক এজেন্সি (প্রা.) লিমিটেড, কলকাতা।
  6. ভক্তা, ভক্তি ভূষণ। ভারতীয় শিক্ষার রূপরেখা। অ আ ক খ প্রকাশণী, পূর্ব মেদিনীপুর।
  7. হালদার, গৌরদাস., শর্মা, প্রশান্তকুমার। আধুনিক ভারতীয় শিক্ষার বিকাশ। ব্যানার্জী পাবলিশার্স, কলকাতা।
  8. ইসলাম, নূরুল। ভারতীয় শিক্ষা-ইতিহাসের রূপরেখা। শ্রীধর প্রকাশনী, কলকাতা।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *