রর্সা ইঙ্ক-ব্লট অভীক্ষা (Rorschach Inkblot Test)

“একটি কালির দাগ মানুষের অবচেতন মনের কতটা গভীরে পৌঁছাতে পারে?” রর্সা ইঙ্ক-ব্লট অভীক্ষা (Rorschach Inkblot Test) কেবল মনবিজ্ঞান সম্মত অভীক্ষা নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিত্ব মাপার এক রহস্যময় আয়না। আজকের আর্টিকেলে আমরা এই অভীক্ষার খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করবো। 

ব্যক্তিসত্তা পরিমাপের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব দূর করার জন্য প্রতিফলন অভীক্ষা (Projective Test) ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রতিফলন অভীক্ষার মধ্যদিয়ে ব্যক্তি কোনো কিছু সম্পর্কে তার নিজের ধারণা, বক্তব্য, মনোভাব অচেতনভাবে প্রকাশ করে অর্থাৎ বাইরের বস্তু দেখে তার ভেতরের প্রতিক্রিয়া অজান্তে প্রকাশ করে। এই সব কৌশলে ব্যক্তির কাছে কতকগুলি সমস্যা পরোক্ষভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং ব্যক্তিকে ঐগুলির প্রতি প্রতিক্রিয়া করতে বলা হয়। রর্সা ইঙ্ক-ব্লট অভীক্ষা হল একধরনের প্রতিফলন অভীক্ষা (Projective Test)।

 

রর্সা ইঙ্ক-ব্লট অভীক্ষা

প্রচলিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব পরিমাপক কৌশলগুলির মধ্যে অন্যতম হল রর্সা ইঙ্ক-ব্লট অভীক্ষা। এই প্রকার অভীক্ষাটি সুইস মনোচিকিৎসক হারম্যান রর্সা (Hermann Rorschach) 1921 সালে প্রস্তুত করেন। তিনি শতাধিক কালির ছাপ (Ink blots) নিয়ে গবেষণা করেন এবং অবশেষে তিনি ব্যক্তিত্ব পরিমাপের জন্য 10টি কালির ছাপ নির্বাচন করেন। 10টির মধ্যে 5টি হল ধূসর ও কালো রং-এর, 2টি হল ধূসর, কালো ও গাঢ় লাল রং-এর এবং অবশিষ্ট তিনটি বিভিন্ন রং-এর সংমিশ্রণে গঠিত। একটি কাগজের উপর কালি ঢেলে সেটিকে ঠিক মাঝ বরাবর ভাঁজ করা হয়, ফলে কাগজটিতে সমান দুটি ভাগে বিভক্ত একটি অর্থহীন ছবি (কালির দাগ) তৈরি হয়।

এই প্রকার অভীক্ষায় অভীক্ষার্থীকে কতকগুলি কালির ছাপ সম্বলিত কার্ড (11 × 9 ইঞ্চির 10টি কার্ড) একের পর এক দেখানো হয় এবং এই কার্ডগুলো দেখে তার কী মনে হচ্ছে, অর্থাৎ তার মনের ভাবনাচিন্তাকে ব্যক্ত করতে বলা হয়। রর্সার মতে, ব্যক্তির সমগ্র ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয় তার আচরণের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে তিনি উদ্দীপক হিসেবে কালির ছাপগুলি ব্যবহার করেছেন। এই অভিনব কালির ছাপগুলি দেখে প্রতিক্রিয়া জানাবার সময় ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সুপ্ত সংলক্ষণগুলি সহজে প্রকাশিত হবে। অভীক্ষক অভীক্ষার্থীর প্রতিক্রিয়াগুলি দেখে তার ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে একটা ধারণা গড়ে তুলতে পারবেন।

এই বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মূলত (A) অবস্থান (Location) (B) বৈশিষ্ট্য (Determinant) এবং (C) বিষয়বস্তুর (Content) উপর আলোকপাত করা হয়।

অবস্থান (Location)

অবস্থান বলতে বোঝায়, অভীক্ষার্থী ছবির কোনো অংশ দেখে উত্তর দিচ্ছে, সে ছাপটিকে সমগ্র ভাবে দেখছে নাকি আংশিক ভাবে দেখছে, ছাপটিকে ভালোভাবে দেখে উত্তর দিচ্ছে, না খুব বেশি কল্পনার আশ্রয় নিচ্ছে ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা।

বৈশিষ্ট্য (Determinant)

বৈশিষ্ট্য বলতে বোঝায়, অভীক্ষার্থী ছবির রং, তার গঠন, শেড্ এবং গতির উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কিনা। ছাপগুলির মধ্যে গতির কোনো লক্ষণ না থাকলেও অনেক অভীক্ষার্থী ছাপের মধ্যে গতিশীল বস্তু বা জীবের কল্পনা করে থাকেন।

বিষয়বস্তুর (Content)

বিষয়বস্তু বলতে সাধারণত বোঝায়, অভীক্ষার্থী ছবিগুলি দেখে উত্তর দিতে গিয়ে ছবির কোন কোন বিষয়বস্তুর (মানুষ, জীবজন্তু, জড়বস্তু, গাছপালা, মানুষ বা জীবজন্তুর দেহের কোনো অংশ) ওপর বেশি জোর দিয়েছে।

অভীক্ষার্থীর দেওয়া উপরোক্ত প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব নির্ণয় করা হয়ে থাকে। যে সমস্ত ব্যক্তি ছাপগুলিকে সমগ্র এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে তাদের বলা হয় বাস্তববাদী, বুদ্ধিমান এবং স্থিরচিত্ত। যারা ছবিগুলিকে আংশিকভাবে দেখে তারা প্রায় দুর্বলচিত্ত হয়। যারা রং-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয় তারা সাধারণত আবেগপ্রবণ হয়। যারা বেশির ভাগ ছবিগুলিকে উদ্ভিদ, জীবজন্তু প্রভৃতির সঙ্গে তুলনা করে তাদের মধ্যে কল্পনাশক্তি কম বলে মনে করা হয়। আবার স্বল্পবুদ্ধি বা ক্ষীণবুদ্ধি সম্পন্নদের চিন্তাভাবনার মধ্যে কোনো নতুনত্ব থাকে না, সব ছবির প্রতিক্রিয়া প্রায় একইরকমভাবে দিয়ে থাকে।

এই অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে দুটি পরস্পর-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। একটি হল ক্লিনিসিয়ানদের (Clinician) দৃষ্টিভঙ্গি এবং অপরটি হল সাইকোমেট্রিসিয়ানদের (Psychometricians) দৃষ্টিভঙ্গি। ক্লিনিসিয়ান (Clinician)-দের মতে, এই অভীক্ষা মানসিক রোগগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উপযোগী এবং এর নির্ভরযোগ্যতা ও বৈধতা অনেক বেশি। সাইকোমেট্রিসিয়ান (Psychometricians)-দের মতে, এই অভীক্ষার বৈধতা ও নির্ভরযোগ্যতার (Validity and Reliability) মানে অনেক অভিনবত্ব থাকলেও এই অভীক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বিশেষজ্ঞ মনোবিদের প্রয়োজন হয়। রর্সা ইঙ্ক-ব্লট অভীক্ষায় ব্যবহৃত 10টি ছাপের চিত্র নিম্নে দেওয়া হল-

চিত্র : রর্সা ইঙ্ক-ব্লট অভীক্ষায় ব্যবহৃত চিত্র সমূহ

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. দাস, কৌশিক। নির্দেশনা ও পরামর্শদানের মৌলিক নীতিসমূহ। গ্লোবাল নেট পাবলিকেশন, কলকাতা।
  2. Robert J. Gregory. Psychological Testing. Pearson Education.
  3. ঘোষ, ড. সনৎ কুমার। শিক্ষায় সঙ্গতি-অপসঙ্গতি এবং নির্দেশনা। ক্লাসিক বুকস্।
  4. মণ্ডল, ভীম চন্দ্র। শিক্ষায় নির্দেশনা ও পরামর্শের রূপরেখা। সোমা বুক এজেন্সী।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *