নারীশিক্ষার প্রধান বাধাসমূহ | Major Constraints of Women Education

নারীশিক্ষার প্রধান বাধাসমূহ (Major Constraints of Women Education) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন সেই দেশে লিঙ্গ ভেদে নারী-পুরুষ উভয়ই শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী হন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমাদের সমাজে “নারীশিক্ষার প্রধান বাধাসমূহ” একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষা সভ্যতার আলোকবর্তিকা এবং একটি বা একাধিক জাতির উন্নয়নের চাবিকাঠি। একটি সম্পূর্ণ জনজাতির অর্ধেক জনশক্তিই হল নারী, একটি পাখি যেমন একটি ডানায় ভর করে উড়তে পারে না, ঠিক তেমনি পুরুষ জাতির উন্নয়নে সমগ্র দেশ বা রাষ্ট্রের উন্নয়ন অসম্ভব। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte) যথার্থই বলেছেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।” কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ভারতবর্ষে নারীশিক্ষার সম্প্রসারণের পথে নানা সমস্যা বিদ্যমান। বহু কমিটি, কমিশন এবং শিক্ষানীতির সুপারিশ সত্ত্বেও সর্ব ভারতীয় ভিত্তিতে নারীশিক্ষার আশানুরূপ সম্প্রসারণ হয়নি। এর ব্যর্থতার পিছনে বেশকিছু কারণ পরিলক্ষিত হয় যথা- সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় ইত্যাদি নানা বাধা। এই বাধাগুলি সম্বন্ধে নিম্নে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল-

 

নারীশিক্ষার সামাজিক বাধা (Social Constraints)

বৈদিক যুগে নারীর স্থান ছিল সু-উচ্চে, কিন্তু সময় যতই অতিবাহিত হয়েছে ধীরে ধীরে সেই লেখচিত্রের নিম্নমুখীতা লক্ষ্য করা গেছে। ভারতবর্ষে আজও বেশকিছু সমাজ পুরুষ-শাসিত। বহু পরিবার আজও আশা করে যে তাদের মেয়েরা ঘর পরিষ্কার, রান্না, ছোট ভাইবোনদের যত্ন নেওয়া এবং পারিবারিক খামারে সাহায্য করবে। কন্যা সন্তান আজও বহু পরিবারে অবাঞ্ছিত, বিশেষ করে যে পরিবারে একজন ছেলে সন্তানের উপস্থিতি লক্ষণীয়। অনেক পরিবার কেবল তাদের ছেলেদের তাদের ভবিষ্যতের পরিবারের উপার্জনকারী এবং তাদের বয়স্ক বাবা-মায়ের সহায়ক হিসাবে বিবেচনা করে, যা ছেলেদের শিক্ষিত করার জন্য একটি প্রেষণা হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও, অনেক সংস্কৃতিতে, বিবাহের অর্থ হল একটি মেয়ে তার স্বামীর পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে, তাই তারা মেয়েদের শিক্ষিত করার জন্য খুব কম ইচ্ছা, এবং অনুপ্রেরণা বোধ করে।

সামাজিক রক্ষণশীলতা নারীশিক্ষার সম্প্রসারণের অন্যতম প্রতিবন্ধক। বাল্যবিবাহ (18 বছরের কম বয়সী সন্তানের বিবাহ) সারা বিশ্বে ঘটে তবে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঘটে। অভিভাবকগণ বিভিন্ন কারণে তাদের কন্যা সন্তানদের বাল্যবস্থায় বিবাহ দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে তারা তাদের সন্তানদের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক কিংবা বিবাহ পূর্ব-সম্পর্কের ক্ষতি বা কলঙ্ক থেকে তাদের রক্ষা করছেন, তবে যেসকল বাল্য-বধূরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন তাদেরও প্রাথমিক গর্ভাবস্থা, অপুষ্টি, ঘরোয়া সহিংসতা এবং গর্ভাবস্থার জটিলতার অভিজ্ঞতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন পরিবারগুলির জন্য, বাল্যবিবাহ তাদের অর্থনৈতিক বোঝা হ্রাস করে, কিন্তু মেয়েদের জন্য শিক্ষা ছাড়া আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। 2017 সালে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে প্রায় 70 কোটি বাল্য-বধূরা বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হয়েছে (There are about 700 million women around the world who were married as girls, UNICEF reported in 2017)। তবে, এতে কোনো দ্বিমত নেই যে, প্রকৃত শিক্ষা বাল্যবিবাহ হ্রাস করতে সক্ষম।

 

নারীশিক্ষার মনস্তাত্ত্বিক বাধা (Psychological Constraints)

এতক্ষণ আমরা নারীশিক্ষায় সামাজিক সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করলাম। তার থেকে দেখলাম যে সবগুলির পিছনে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও প্রচলিত পদ্ধতিই যা মানুষের মনে গেঁথে গেছে। মানসিক সমস্যার কেন্দ্রে আছে মেয়েদের সম্বন্ধে কিছু নেতিবাচক মনোভাব। যেমন- মেয়েরা দুর্বল, জটিল এবং কঠোর সিদ্ধান্তে পরনির্ভরশীল, অনুকম্পার পাত্রী এবং কখনই পুরুষের সমকক্ষ হিসাবে গণ্য করা যোগ্য নয়। অসংখ্য নেতিবাচক দৃঢ় বিশ্বাস এমনভাবে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে স্থায়ীভাবে আশ্রয় করে আছে যে বহু আধুনিক মানুষও মনে করেন মেয়েদের লেখা পড়া হলে ভালো না হলেও ক্ষতি নেই।

মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে আর একটি মানসিক বাধা সামাজিক রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান, সামাজিকতা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ের দায় শুধুমাত্র মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেওয়া। সুদীর্ঘ কাল ধরে প্রচলিত থাকায় এগুলি তাদেরই একান্ত নিজস্ব, এই কারণে বাড়ির ছেলে সন্তানের পাঠচর্চা ব্যাহত না হলেও মেয়ের বেলায় অনেক সময়ই “সময়ের অপচয়” বলে ধরে নেওয়া হয়। এই কারণে গ্রামাঞ্চলে এখনও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে স্কুল-ছুট এর সংখ্যা বেশি। আমাদের দেশে পুরুষ সন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ছোট থেকেই পুরুষ সন্তানকে এমনভাবে পালিত করা হয় যে, সে মেয়ের প্রতি অবহেলার মনোভাব নিয়েই বড় হয়। ছোট থেকেই সে ভাবতে শেখে ছেলে হিসাবে মেয়েদের চেয়ে তার স্থান উচ্চে। এরূপ নানা নেতিবাচক মনোভাব, পক্ষপাত দৃষ্টিভঙ্গি এবং চলে আসা নিয়মনীতি মেয়েদের শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ এবং এর ফলে যে হতাশা ও মানসিক শূন্যতাবোধ তৈরি হয় দৃষ্টান্ত হিসাবে তা অন্য মেয়েদের কাছে খুব উৎসাহ ব্যঞ্জক নয়।

 

নারীশিক্ষার রাজনৈতিক বাধা (Political Constraints)

ভারতীয় সংবিধানে বলা হয়েছে 14 বছর অবধি প্রত্যেক শিশুকে অবৈতনিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। 1993 সালে উন্নিকৃষ্ণান মামলায় “Right to Education” অর্থাৎ শিক্ষার অধিকার ও “Right to Life” বা জীবনের অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরফলে 2001 সালে শুরু হয় ‘সর্বশিক্ষা অভিযান কর্মসূচি’। সর্বশিক্ষা অভিযানের দরুন ছেলে এবং মেয়েদের শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা আনার চেষ্টা করা হলেও বহু কারণে তা সম্ভব হয়নি। উপযুক্ত পরিষেবা, বিদ্যালয় গৃহ, শিক্ষক বা শিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত করা হলেও বহু পরিবারের রক্ষণশীল মনোভাব এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিড-ডে-মিল এর দরুন বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বেড়েছে ঠিকই কিন্তু শিক্ষা পরিকাঠামোর অভাব সম্পূর্ণরূপে দূর করা যায়নি। সরকার কর্তৃক অর্থনৈতিক সমস্যার কিছুটা সমাধান সম্ভব হলেও দিনে দিনে স্কুল-ছুট ছাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে রাজনৈতিক সমস্যাই প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দ্বারা পরিচালিত সরকার বিভিন্ন নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন এবং পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন, সেক্ষেত্রে সকল উন্নয়নমূলক কাজকর্মই তাদের উপরই ন্যস্ত থাকে অন্য যারা তারা শুধু পর্যবেক্ষক কখনও নির্লিপ্ত কখনও শুধু ছিদ্রান্বেষী। এর ফলে নারীশিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়, সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ও সংস্কার কোনো কিছুতেই একটা সম্মিলিত প্রয়াস সৃষ্টি হতে পারে না। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হলে এই অবস্থা আরও খারাপ হয়। একটা সার্বিক আন্দোলন সৃষ্টি না হলে সবকিছুতেই মতভেদকে প্রাধান্য দিলে, কোনো সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

 

নারীশিক্ষার অর্থনৈতিক বাধা (Economical Constraints)

উপরি আলোচিত সামাজিক, মনোবৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ধরনের বাধার ক্ষেত্রেই অর্থই প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক সমস্যা প্রত্যক্ষভাবে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি জটিল বাধা স্বরূপ। ভারতবর্ষের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে দারিদ্র্য একটি বৃহৎ সমস্যা সেখানে শিক্ষাই পারে এই দারিদ্র্যকে ঘোচাতে, আবার বিপরীতক্রমে এই অর্থ সমস্যাই শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বহু সন্তান বিশিষ্ট পরিবারে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পিতামাতারা মনে করেন একটি পুত্র সন্তানই পারে তাদের জীবনে এই দারিদ্র্যকে ঘোচাতে যেখানে তারা মেয়েদের শিক্ষাকে অপব্যয় রূপে বিচার করে।

এক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অল্প বয়সে মেয়েদের বিবাহ-কার্য সম্পন্ন হওয়ার ফলে পূর্ণ যুবতী পর্যায়ে আসতে আসতে অনেকগুলি সন্তানের মা হয়ে যান। দারিদ্র্য ও বহু সন্তানের জন্ম দেওয়ার ফলে মায়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকে না। এবং সন্তানরাও অপুষ্টি, অজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যহীনতার দরুন বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। আবার অপর দিকে বহুবিবাহের ফলে বহু সন্তান বিশিষ্ট পরিবারে সকলের লালন পালনের ব্যয়ভার বহন মাতাপিতার দ্বারা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেক্ষেত্রে বাড়ির বড় মেয়েদের উপর ছোটদের লালন পালনের ভার পড়ে। এক্ষেত্রে সংসারের কাজকর্ম, ছোটদের লালন পালন এবং সাংসারিক দায়িত্ব বহন করতে গিয়ে তাদের আর লেখা পড়া করা হয়ে ওঠে না।

 

নারীশিক্ষার ধর্মীয় বাধা (Religious Constraints)

প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত দেখা গেছে যে, ধর্ম কোনোভাবে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। প্রাচীন যুগে (বৈদিক যুগে) নারী ও পুরুষের শিক্ষায় কোনোরূপ পার্থক্য ছিল না, বহুক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তারা একত্রে শিক্ষাগ্রহণ করেছে এবং সেযুগে নারীদের উপনয়নের প্রথাও প্রচলিত ছিল। কিন্তু সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে যখন ধর্মের নামে ব্যবসা কিংবা ধর্মের অপব্যবহার ও অপব্যাখ্যা আরম্ভ হয়, সেই তখন থেকেই নারীদের উপর একের পর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হতে থাকে। এবং তারপর হতে যুগ যুগ ধরে সেই প্রথাই সমাজে চলে আসছে। এক্ষেত্রে ধর্ম ঈশ্বরের বাণী কিংবা উপদেশের প্রচার না করে সমাজে নারীদের উপর নানা বিধিনিষেধ (দৈনন্দিন জীবনে, আচার-অনুষ্ঠানে) আরোপ করতে শুরু করে, তখনই নারী সমাজকে শৃঙ্খলিত করার প্রবণতা দেখা যায়। কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও কিছু ধর্মের নামে অধর্মের বাণী প্রচার করা মানুষের আরোপ করা বিধি নিষেধের কারণে নারী সমাজ অশিক্ষিত, পুরুষ নির্ভর ও অন্তঃপুরের মধ্যে আবদ্ধ থেকে যায় এবং তাদের এই বৃহৎ জগতের সামনে আসার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সময় গেছে দিন গেছে একের পর এক নিয়ম, নীতি ও প্রথার জাল তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্যযুগীয় বাংলার বল্লাল সেনের কৌলীন্য প্রথা ও পরবর্তীকালে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, সতীদাহ প্রথা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। নারী এবং পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ধর্মীয় অনুশাসন, নিয়মনীতি এবং শৃঙ্খলা সমানভাবে বর্তায়, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনগুলি প্রায়শই স্বার্থান্বেষী মানুষের সুবিধার জন্য মেয়েদের উপরই নানা অযৌক্তিক বিধিনিষেধে পরিণত হয়।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. Government of India. (2021). National education policy 2020. Ministry of Education.
  2. Kaur, R., & Jain, S. (2021). The role of government schemes in promoting women’s education in rural India. Education for Development, 22(3), 55-72.
  3. National Statistical Office. (2022). Women and men in India 2022. Ministry of Statistics and Programme Implementation.
  4. https://www.wbnsou.ac.in/

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *