সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার ধারণা | Concept of Social Interaction

মানুষ হল সামাজিক জীব। আর এই সমাজবদ্ধ জীবনের মূল ভিত্তিই হল সামাজিক মিথস্ক্রিয়া (Concept of Social Interaction)। সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হল সামাজিক মিথস্ক্রিয়া। ব্যক্তি যখন অন্যের সাথে সংযোগ স্থাপন করে, মনের ভাব আদান-প্রদান করে, যার দ্বারা একে অপরের আচরণ প্রভাবিত হয়, তখনই সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার (Social Interaction) সৃষ্টি হয়।

 

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার অর্থ (Meaning of Social Interaction)

প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিরা প্রয়োজন মেটানোর জন্য সর্বদা বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সমিতিগুলিতে বাস করে থাকেন। এই গোষ্ঠীর সদস্য হিসাবে তারা নির্দিষ্ট উপায়ে আচরণ করে যা তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে সহায়তা করে। প্রতিটি ব্যক্তি অন্যের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, এটি ‘সামাজিক ‘মিথস্ক্রিয়া’। এটি সামাজিক সম্পর্কের পুরো পরিসর-কে বোঝায়। এটিই সেই ভিত্তি যার দ্বারা মানব সমাজ টিকে থাকে বা বেঁচে থাকে। সুতরাং, ‘সামাজিক মিথস্ক্রিয়া’ হল মৌলিক সামাজিক প্রক্রিয়া, গতিশীল সামাজিক সম্পর্কের বর্ণনা দেওয়ার জন্য একটি বিস্তৃত শব্দ। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া হল পৃথক ফলাফলের মধ্যে সুনির্দিষ্ট এবং সরাসরি পারস্পরিক সম্পর্কের প্রভাব।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার দুটি অপরিহার্য শর্ত: ক) সামাজিক সংযোগ, খ) যোগাযোগ। মুখোমুখি মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বা ফোন, রেডিও, ইন্টারনেট এবং একে অপরের থেকে দূরে থাকা মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে সামাজিক সংযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। According to Gillin and Gillin, “Social Contact is the first phase of interaction.”

সামাজিক সংযোগ ইতিবাচক বা নেতিবাচক দুই’ই হতে পারে। লোকজনের মধ্যে সহযোগিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ভাল থাকলে তা ইতিবাচক হয় বা তাদের মধ্যে ঈর্ষা, বিদ্বেষ, হিংস্রতা ও দ্বন্দ্ব থাকলে তা নেতিবাচকও হতে পারে।

যোগাযোগ হল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যম। যোগাযোগের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তির অপর ব্যক্তির আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এটি আমাদের সংবেদন, প্রত্যক্ষণ এবং ধারণার মাধ্যমে ঘটতে পারে। ইন্দ্রিয়জাত অঙ্গগুলির মাধ্যমে যোগাযোগ কেবলমাত্র মানুষের মধ্যেই হয় না, অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। সংবেদনশীল স্তরে, মুখের ভাব, অঙ্গভঙ্গি, হাসি, কান্নাকাটি ইত্যাদি ব্যক্তির মধ্যে প্রতিক্রিয়া জাগায়। বুদ্ধির উপর নির্ভর করে ব্যক্তির মধ্যে একজনের ধারণা, অনুভূতি এবং প্রক্ষোভ বিনিময় করা যায়, ভাষাই মানুষের মধ্যে ধারণাগুলি সংক্রমণ করার প্রধান মাধ্যম।

 

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সংজ্ঞা (Definitions of Social Interaction)

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিম্নে তুলে ধরা হল-

এলড্রেজ ও মেরিল (Eldredge and Merrill)-এর মতে, “Social interaction is the general process whereby two or more persons are in meaningful contact as a result of which their behaviour is modified however slightly.” অর্থাৎ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া হল সেই সার্বিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি অর্থবহ সংস্পর্শে আসেন এবং যার ফলে তাদের আচরণ ধারায় পরিবর্তন আসে।

ডসন ও গেটিস (Dawson and Gettys)-এর মতে, “Social interaction is a process whereby men interpenetrate the minds of each other.” অর্থাৎ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ একে অপরের মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

এন.পি. গিশ (N.P. Gish)-এর মতে, “Social interaction is the reciprocal influence human beings exert on each other through interstimulation and response.” অর্থাৎ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া হল পারস্পরিক উদ্দীপনা ও প্রতিক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ একে অপরের ওপর পারস্পরিক প্রভাব বিস্তার করে।

পার্ক ও বার্জেস (Park and Burgess)-এর মতে, “Social interaction is of a dual nature, of persons with persons and of groups with groups.” অর্থাৎ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া দ্বৈত প্রকৃতির, যা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির এবং গোষ্ঠীর সাথে গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করে।

গ্রিন (Green) defined social interaction as, “the mutual influences that individuals and groups have on one another in their attempts to solve problems and in their striving towards goals.” অর্থাৎ, কোনো সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা এবং লক্ষ্য অর্জনের অভিমুখে, অগ্রযাত্রায় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীসমূহ একে অপরের ওপর যে পারস্পরিক প্রভাব বিস্তার করে, তাই হল সামাজিক মিথস্ক্রিয়া।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সরাসরি বা প্রতীকী উভয়ই হতে পারে। প্রত্যক্ষ মিথস্ক্রিয়া হয় যখন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি কোনো ধরনের শারীরিক সংস্পর্শে থাকে, যেমন- আলিঙ্গন করা, ঠেলাঠেলি করা, লড়াই করা ইত্যাদি। অন্যদিকে প্রতীকী মিথস্ক্রিয়া শারীরিক অঙ্গভঙ্গি এবং লিখিত বা কথিত ভাষা নিয়ে গঠিত এবং ভাষাই প্রতীক প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসাবে পরিচিত।

 

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার গুরুত্ব (Importance of Social Interaction)

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে এবং তা সামাজিক সম্পর্কের বিকাশ এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়, সেহেতু সামাজিক মিথস্ক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তাগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হল-

এটি ব্যক্তিকে পরিচয় প্রদান করে

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সমস্ত সম্পর্কের ভিত্তি এবং এর মাধ্যমেই সমাজে ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর অস্তিত্ব নির্ভর করে যেভাবে তিনি অন্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন তার উপর।

বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করে

একটি ব্যক্তির বিভিন্ন শারীরিক, সংবেদনশীল এবং সামাজিক প্রয়োজন এছাড়া পরিবার, বিদ্যালয়, গির্জা, কর্মক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে বা সমাজে বিভিন্ন ধরনের মিথস্ক্রিয়া দ্বারা এই চাহিদাগুলির সন্তুষ্টি ঘটে।

গোষ্ঠী গঠনে সহায়ক

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া দলগঠনে সহায়তা করে। যখন বিপুল সংখ্যক লোক একে অপরের সাথে মতবিনিময় করে, তাদের চিন্তাভাবনা এবং ধারণাগুলি বিনিময় করে, মিথস্ক্রিয়া এক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে, দল বা গোষ্ঠী গঠন করে থাকে।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, সামাজিক নিয়মাবলী এবং নিয়ম মেনে চলতে সহায়তা করে

বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি সমাজের নির্দিষ্ট কিছু বিধি ও নিয়ম রয়েছে, যার দ্বারা সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। এক্ষেত্রে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মানুষকে সামাজিক রীতিনীতিগুলি মেনে চলার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখে।

সংস্কৃতির সঞ্চালনে  (Cultural transmission) সহায়তা করে

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সংস্কৃতিকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্ম, এমনকি এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে প্রেরণে সহায়তা করে। নতুন প্রজন্ম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে শেখে প্রধানত পুরানো প্রজন্মের কাছ থেকে, এবং আধুনিক যুগে প্রযুক্তিগত কৌশলের আবিষ্কার এবং, সাংস্কৃতিক প্রসার সমাজের নানান ক্ষেত্রে বা স্তরে নানাভাবে সঞ্চালিত হয়েছে।

সামাজিক পরিবর্তন ঘটায়

মানুষের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া সামাজিক পরিবর্তন আনতে সহায়তা করে, ধ্যান-ধারণার বিনিময়, নতুন বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও চিন্তাভাবনা ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে এবং এর ফলে সামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসে।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. চক্রবর্তী, সোনালী। শিক্ষার সমাজ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। সোমা বুক এজেন্সি, কলকাতা।
  2. চট্টরাজ, শ্যামাপ্রসাদ। শিক্ষামুখী সমাজবিজ্ঞান। সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, কলকাতা।
  3. ভট্টাচার্য্য, দিব্যেন্দু। শিক্ষা ও সমাজতত্ত্ব। Pearson, Uttar Pradesh, India.
  4. পাল, দেবাশিষ। শিক্ষার সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তির রূপরেখা। রীতা বুক এজেন্সি, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *