অণুশিক্ষণ-এর সার্বিক ধারণা | Concept of Micro-teaching

শিক্ষণ দক্ষতা বৃদ্ধির এক আধুনিক এবং বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি হল অণুশিক্ষণ (Concept of Micro-teaching) শ্রেণীকক্ষের জটিল পরিবেশ-কে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙ্গে হবু শিক্ষকদের দক্ষ করে তোলাই এই এর প্রধান লক্ষ্য। আজকের আর্টিকেল-এর মধ্যেদিয়ে আমরা অণুশিক্ষণ-এর সার্বিক ধারণা (Concept of Micro-teaching) গড়ে তোলার চেষ্টা করবো। 

শিক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় শিখন-শিক্ষণের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠনের সন্তোষজনক ফল নির্ভর করে উত্তম শিক্ষণ পদ্ধতির উপর। শিক্ষণ পদ্ধতি এবং শিক্ষার ফল কেবলমাত্র সরাসরিই যুক্ত নয় সমানুপাতিকও বটে। অর্থাৎ শিক্ষণ পদ্ধতি যত ভাল হবে, শিক্ষার্থীরাও তত ভালভাবে শিক্ষা লাভ করবে। তাই একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পঠন-পাঠনের উন্নতি সাধন করা সম্ভব একমাত্র উপযুক্ত, বিজ্ঞানসম্মত ও উন্নত শিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমেই ৷

অণুশিক্ষণ বা Micro-teaching ধারণাটির উদ্ভাবক হলেন অধ্যাপক Dwight Allen এবং Robert Bush। ১৯৬০-৬৭ সালের মধ্যে Stanford University-তে শিক্ষক-শিক্ষণ সম্বন্ধে গবেষণা করার সময় তাঁদের মাথায় এই ধারণাটির উদ্ভব হয়। তাঁরা শিক্ষকতা বৃত্তি গ্রহণ করার পূর্বে এবং গ্রহণ করার পর উভয় ক্ষেত্রেই ধারণাটি অত্যন্ত কার্যকরী বলে মনে করেন। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অণুশিক্ষণ (Micro-teaching) হল একটি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি। ‘Micro’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Mikros’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হল ‘খুব ছোটো’ এবং ‘Teaching’ শব্দের অর্থ হল ‘শিক্ষাদান’।

 

অণুশিক্ষণের অর্থ

অণুশিক্ষণ হল প্রকৃত শিক্ষণ প্রক্রিয়ার একটি সংক্ষিপ্ত বা লঘূকৃত সংস্করণ, যা বেশ কিছু উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। সাধারণ শিক্ষণ প্রক্রিয়ার সহজাত জটিলতাগুলো কমিয়ে আনার লক্ষ্যে-শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং সময়ের ব্যাপ্তির দিক থেকে এটিকে সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হয়েছে। অণুশিক্ষণ হল এমন একটি প্রশিক্ষণ কৌশল, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থী ৫ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থীর একটি ছোট দলের সামনে, মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের স্বল্প সময়ের জন্য, কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বা ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি একক শিক্ষণ দক্ষতার অনুশীলন করেন।

অণুশিক্ষণ হল একটি কৃত্রিম বা অনুকৃত সামাজিক শিক্ষণ প্রক্রিয়া; এর মূল উদ্দেশ্য হল শিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থীদের শিক্ষণ-আচরণে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পরিমার্জন আনার লক্ষ্যে তাঁদের গঠনমূলক মতামত (feedback) প্রদান করা। অণুশিক্ষণ শিক্ষকদের অনুশীলনের জন্য এমন একটি পরিবেশ বা কাঠামো প্রদান করে, যেখানে সাধারণ শ্রেণীকক্ষের স্বাভাবিক জটিলতাগুলো অনেকাংশে হ্রাস পায় এবং শিক্ষক তাঁর নিজস্ব পারদর্শিতা বা শিক্ষণ-কাজের ওপর তাৎক্ষণিক মতামত লাভ করেন।

এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষণ দক্ষতা প্রয়োগ করে, স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর সামনে এবং অত্যন্ত সীমিত সময়ের মধ্যে কেবল একটি একক ধারণা বা বিষয়বস্তু শিক্ষাদান করতে হয়।

 

অণুশিক্ষণের সংজ্ঞা

বর্তমানে অণুশিক্ষণ বা Micro-teaching বলতে একটি বিশেষধর্মী কৌশলকে বোঝায়। বিভিন্ন গবেষক এটিকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যার মধ্যে থেকে কয়েকটি সংজ্ঞার উল্লেখ নীচে করা হল-

ডি.ডব্লিউ. অ্যালেন (D.W Allen, 1966) অণুশিক্ষণ-এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “Microteaching as a scale down teaching encounter in class size and class time.” অর্থাৎ, অণুশিক্ষণ হল শ্রেণীকক্ষের আকার ও সময়ের দিক থেকে একটি সংক্ষিপ্ত বা লঘূকৃত শিক্ষণ-অভিজ্ঞতা।

বুশ (Bush) বলেছেন, “A teaching education technique which allows teachers to apply clearly defined teaching skills to carefully prepared lessons in a planned series of five to ten minutes encounters with a small group of real students often with an opportunity to observe the result on video tapes.” অর্থাৎ, অণুশিক্ষণ হল শিক্ষক প্রশিক্ষণের এমন একটি কৌশল, যা শিক্ষকদের বাস্তব শিক্ষার্থীদের একটি ছোট দলের সাথে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সেশনগুলোতে যা প্রায়শই ভিডিও টেপের মাধ্যমে ফলাফল পর্যবেক্ষণের সুযোগসহ সম্পন্ন হয়, যত্নসহকারে প্রস্তুতকৃত পাঠের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শিক্ষণ দক্ষতা প্রয়োগ করার সুযোগ করে দেয়।

 

অণুশিক্ষণের বৈশিষ্ট্য

অণুশিক্ষণ হল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একটি বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি। অণুশিক্ষণ পর্যাপ্ত ও যথাযথ ফিডব্যাক বা মতামত প্রদান করে। দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার লক্ষ্যে এটি একটি প্রশিক্ষণমূলক হাতিয়ার। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

  1. অণুশিক্ষণ কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, সাধারণ শিক্ষণের মতই স্বাভাবিক এবং বাস্তবসম্মত।
  2. এটি সম্পূর্ণরূপে একটি ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ কৌশল।
  3. এতে সামগ্রিক দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে একটি বিশেষ বা ক্ষুদ্র অংশের দক্ষতা অর্জনে জোর দেওয়া হয়।
  4. দক্ষতা ভিত্তিক হওয়ায় সময় লাগে কম (৫-১০ মিনিট)।
  5. খুব কম সংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের (৫-১০ জন) ক্লাস নিতে হয় বলে বৃহৎ শ্রেণীকক্ষের প্রয়োজন হয় না।
  6. এতে শিক্ষণে সংস্কারমূলক এবং প্রেষণামূলক প্রত্যাবর্তন ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করা যায়।

উপরিউক্ত সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণে বলা যায়, স্বল্প সময়ে, স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে শ্রেণিশিক্ষণ সংক্রান্ত দক্ষতা এবং স্বল্পকালীন পাঠদান পদ্ধতিকে অণুশিক্ষণ বলে।

 

অণুশিক্ষণের উদ্দেশ্য

মাইক্রো-টিচিং বা অণুশিক্ষণের উদ্দেশ্যসমূহ নিচে দেওয়া হল-

  1. গতানুগতিক শ্রেণি শিখনের জটিলতাকে হ্রাস করে।
  2. নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের অধীনে নতুন শিক্ষণ দক্ষতাগুলো শনাক্ত করা এবং আয়ত্ত করা।
  3. উপলভ্য উপকরণ ও সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা।
  4. ত্রুটি সংশোধন করে নতুন পাঠ পরিকল্পনা রচনা করা।
  5. সুযোগ্য শিক্ষক প্রস্তুতে সহায়ক।
  6. বিশেষ দক্ষতার অনুশীলনের উপর গুরুত্ব প্রদান।

 

অণুশিক্ষণ চক্র

অণুশিক্ষণ-এ নিম্নলিখিত স্তরগুলি অনুসৃত হয়-

দক্ষতার সংজ্ঞা প্রদান

নির্দিষ্ট কোনো দক্ষতাকে শিক্ষাদান সংক্রান্ত আচরণের সাপেক্ষে ট্রেনী-কে বোঝানো হয় যাতে ঐ দক্ষতার সম্পর্কে সে সচেতন ও জ্ঞানলাভ করে।

দক্ষতাগুলির প্রদর্শন

বিশেষজ্ঞের দ্বারা ঐ দক্ষতাগুলিকে প্রদর্শন করে দেখানো হয়, ভিডিও রেকর্ডিং ও ছবি প্রভৃতির সাহায্যে।

পাঠপরিকল্পনা

পরিদর্শকের সহযোগিতায় শিক্ষক শিক্ষার্থী অল্প সময়ের জন্য পরিকল্পনা করে, যার মাধ্যমে সে নির্দিষ্ট কোনো দক্ষতা অনুশীলন করতে পারে।

জটিলতার হ্রাস

স্বাভাবিক শ্রেণীকক্ষের জটিলতাগুলিকে এই পদ্ধতির দ্বারা হ্রাস করা হয়েছে। যেমন- শ্রেণীর আকার, সময় এবং বিষয়বস্তুর পরিধি।

ট্রেনিং-এর উপর আলোকপাত

অণুশিক্ষণ আলোকপাত করে নির্দিষ্ট কোনো কাজ সম্পূর্ণ করার উপর। এই টাস্কগুলি হতে পারে শিক্ষাদানের কৌশলের অনুশীলন, নির্দিষ্ট পাঠক্রম সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর প্রভুত্ব স্থাপন, বা শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রদর্শন।

অনুশীলনের উপর বর্ধিত নিয়ন্ত্রণ

অণুশিক্ষণ-এ বর্ধিত নিয়ন্ত্রিত অনুশীলনের সুযোগ আছে। অণুশিক্ষণ অনুশীলনের সময়, ছাত্র, প্রত্যাবর্তন পদ্ধতি, পরিদর্শক এবং বিবিধ বিষয়কে প্রয়োজন অনুসারে বদলানোর সুযোগ আছে।

ফলাফলের জ্ঞানের সম্প্রসারণ

অণুশিক্ষণ-এ প্রত্যাবর্তন জ্ঞানের সম্প্রসারণে সহায়তা করে। পাঠদানের শেষেই ট্রেনী-কে পারদর্শিতা সম্পর্কে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সর্বাপেক্ষা অন্তর্দৃষ্টি লাভের সুযোগও এই পদ্ধতিতে আছে।

উপরোক্ত ধাপগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, অণুশিক্ষণ-এর ক্ষেত্রে নিচে উল্লিখিত চক্রটি অনুসরণ করা উচিত:

Fig : Micro-teaching Cycle

 

অণুশিক্ষণের সুবিধা

অণুশিক্ষণের সুবিধাগুলি হল-

  1. এটি সংক্ষিপ্ত আকারে পাঠদানের মাধ্যমে প্রচলিত শ্রেণীকক্ষ-ভিত্তিক পাঠদানকে হ্রাস করে।
  2. এর উদ্দেশ্যগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত।
  3. প্রাক্-সেবা এবং কর্মকালীন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শিক্ষণ দক্ষতা বিকাশের জন্য অণুশিক্ষণ সহায়ক।
  4. শিক্ষকের আচরণ পরিবর্তনের জন্য অণুশিক্ষণ একটি ভালো ফিডব্যাক পদ্ধতি।
  5. অণুশিক্ষণ ছাত্রছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস বিকাশে সহায়ক।
  6. এটি রেকর্ডার এবং ভিডিওটেপের মাধ্যমে আত্ম-বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেয়।
  7. অণুশিক্ষণ শিক্ষণ দক্ষতা বিকাশের একটি বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি এবং এটি কার্যকর শিক্ষক তৈরিতে সহায়ক।

 

অণুশিক্ষণের অসুবিধা

অণুশিক্ষণের অসুবিধাগুলি হল-

  1. অণুশিক্ষণ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ একটি কৌশল।
  2. অণুশিক্ষণ বিষয়বস্তু-কেন্দ্রিক না হয়ে দক্ষতা-কেন্দ্রিক হয়ে থাকে।
  3. অণুশিক্ষণ-এর পরিধি অত্যন্ত সীমিত।
  4. অণুশিক্ষণ ল্যাবরেটরির অপ্রতুলতা বা অসুবিধাজনক অবস্থান।
  5. প্রশিক্ষণার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে পুনরায় শিক্ষাদান ও পরিকল্পনার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।
  6. অণুশিক্ষণ কেবল একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেই সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
  7. অণুশিক্ষণ-এর সফল বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ ও যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষাবিদদের প্রয়োজন।

 

অণুশিক্ষণ ও প্রথাগত/সনাতনী শিক্ষণের মধ্যে পার্থক্য

  1. অণুশিক্ষণ হল সরল এবং ভীতিহীন শিক্ষাদান, অন্যদিকে প্রথাগত/সনাতনী পাঠদান আপেক্ষিকভাবে জটিল ও ভীতিপ্রসূত।
  2. অণুশিক্ষণ-এ লক্ষ্যগুলি আচরণের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট করা হয়। প্রথাগত পাঠদানে লক্ষ্যগুলি আচরণের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট করা হয় না।
  3. অণুশিক্ষণ হল বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি, অন্যদিকে প্রথাগত শিক্ষণ সংশ্লেষাত্মক পদ্ধতি।
  4. অণুশিক্ষণ-এ শ্রেণীর আয়তনকে নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যে রাখা হয়, অপরদিকে সনাতনী শিক্ষণে শ্রেণীর আয়তন থাকে বৃহৎ।
  5. অণুশিক্ষণ স্বল্পস্থায়ী কিন্তু, সনাতনী শিক্ষণ দীর্ঘ সময়কাল ব্যাপ্ত।
  6. শ্রেণীকক্ষের মিথস্ক্রিয়ার ধরন অণুশিক্ষণ-এ নৈর্ব্যক্তিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, প্রথাগত পাঠদানে তা সম্ভবপর নয়।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. ইসলাম, নূরুল। শিক্ষা-প্রযুক্তিবিদ্যার রূপরেখা। শ্রীধর প্রকাশনী, কলকাতা।
  2. চেল, মদনমোহন এবং নাগ, শর্মিলা। প্রাসঙ্গিক শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা।
  3. সেন, মলয় কুমার। শিক্ষা প্রযুক্তিবিজ্ঞান। সোমা বুক এজেন্সি, কলকাতা।
  4. পাল, দেবাশিষ এবং পাণ্ডে, প্রণয়। শিক্ষণ দক্ষতা। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *