বৃদ্ধি ও বিকাশের ধারণা | Concept of Growth and Development

‘বৃদ্ধি ও বিকাশের’ ধারণা (Concept of Growth and Development) মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আপাতদৃষ্টিতে এই দুটি (‘বৃদ্ধি’ ও ‘বিকাশ’) শব্দকে সমার্থক বলে মনে হলেও, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। বৃদ্ধি হল মানবদেহের পরিমাপগত পরিবর্তন এবং বিকাশ বলতে মানবদেহের সকল গুণগত পরিবর্তনকে বোঝায়। একটি উদাহরণ সহযোগে বলা যেতে পারে, একটি ছোট্ট বীজ থেকে বিশালাকার মহীরুহ হয়ে ওঠার নাম যেমন বৃদ্ধি, তেমনি সেই গাছের ফুল ফোটানো বা ফল দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন হল বিকাশ।
বৃদ্ধি (Growth)
বৃদ্ধির ধারণা
বৃদ্ধি হল কলাতন্ত্রে ওজনের পরিবর্তন, দেহের আকার, উচ্চতা এবং আয়তনের পরিবর্তন। সুতরাং, শিশুর বৃদ্ধি বলতে তার দৈহিক পরিবর্তনকে বোঝায়। বৃদ্ধি হল মানুষের শারীরিক বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত পরিবর্তন। এই পরিবর্তন সহজে পরিমাপ করা সম্ভব এবং এটি সংখ্যামানে প্রকাশ করা যায়। বৃদ্ধি বলতে আমরা শুধুমাত্র শারীরিক পরিবর্তন অর্থাৎ আকার ও আয়তনের পরিবর্তনকে বুঝি। সুতরাং, বৃদ্ধি বলতে আমরা যা বুঝি তা হল মানব দেহের নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী ক্রমোন্নয়নশীল পরিমাণগত পরিবর্তন।
বৃদ্ধির শর্ত
- লিঙ্গ ভেদে বৃদ্ধির পরিবর্তন ঘটে, যেমন- জন্মের সময় একটি ছেলে শিশু মেয়ে শিশুর চেয়ে লম্বা হয়।
- বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হরমোনের প্রভাব রয়েছে, যেমন- বৃদ্ধি জনিত হরমোন অথবা থাইরক্সিন-এর উপর।
- গঠনগত কাঠামোর উপর বৃদ্ধি নির্ভর করে, যেমন- বয়ঃসন্ধিক্ষণে বৃদ্ধি এন্ড্রোজেন ও ইস্ট্রোজেনের উপর নির্ভরশীল।
- আর্থসামাজিক দিক থেকে উন্নত শিশুর বৃদ্ধি অনুন্নতদের তুলনায় বেশি হয়।
- যেসব শিশু দরিদ্র পরিবারের জন্মগ্রহণ করে তাদের বৃদ্ধি কম কারণ তারা অপুষ্টিতে ভোগে।
- শিশুদের প্রতি সঠিক যত্ন নিলে তাদের বৃদ্ধির হার বাড়ে।
- সঠিক শিক্ষা পিতা-মাতাদের শিশুদের কীভাবে সঠিক লালন-পালন করতে হয় তা শেখায়, যা শিশুর বৃদ্ধির হারের সহায়ক।
- বিভিন্ন ভিটামিনের অভাব, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, আয়োডিন ইত্যাদির অভাব শিশুর বৃদ্ধির হারকে ব্যাহত করে। তাই শিশুর বৃদ্ধিতে এগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য
বৃদ্ধির ধারণা থেকে বৃদ্ধি সম্পর্কে তার বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করা যায়, সেগুলি হল-
- মানব দেহের আকার, উচ্চতা এবং ওজনের পরিবর্তন ঘটে, যা পরিমাপ করা যায় দৈর্ঘ্য বা ওজনের এককে।
- বিভিন্ন মনোবিদদের ধারণা অনুযায়ী বৃদ্ধি হল বংশগতি ও পরিবেশের যৌথ ফলশ্রুতি।
- বিভিন্ন বয়সে বৃদ্ধির হার বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে, মনোবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী-
- জন্ম থেকে আড়াই বছর বয়স পর্যন্ত বৃদ্ধির হার সব থেকে বেশি;
- আড়াই থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত বৃদ্ধির হার কমে;
- বয়ঃসন্ধিক্ষণের সময় থেকে বৃদ্ধির হার পুনরায় বেড়ে যায়;
- বয়ঃসন্ধিক্ষণের পর সাধারণত মেয়েদের ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২০ বছর বয়স পর্যন্ত ধীরগতিতে বৃদ্ধি হয়;
- একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত এই বৃদ্ধি ঘটে এবং পরিণমনে বৃদ্ধির সমাপ্তি ঘটে।
- শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি নির্ভর করে পুষ্টিকর খাদ্য, উপযুক্ত পরিবেশ এবং শরীর চর্চার ওপর। অপুষ্টি বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।
- বৃদ্ধি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, কারণ বৃদ্ধি একটানা হয়ে থাকে। শিশুর বৃদ্ধি থেমে থেমে হয় না, তাই এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
- বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যক্তি বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। কারণ সকল মানুষের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি একই গতিতে বা একই হারে হয় না।
- বৃদ্ধি একটি ক্রমউন্নয়নশীল প্রক্রিয়া অর্থাৎ, ক্রমে ক্রমে মানুষের বৃদ্ধি হয়ে থাকে হঠাৎ করে একলাফে অনেকটা বৃদ্ধি হয় না।
- কোষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণেই মানব দেহের বৃদ্ধি ঘটে, যা একটি স্থায়ী পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
- বৃদ্ধি শুধুমাত্র জীবিত সত্তার ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়। কোনো নির্জীব বস্তুর ক্ষেত্রে বৃদ্ধি সম্ভবপর নয়।
বিকাশ (Development)
বিকাশের ধারণা
সকল শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেহের বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটে তেমনি, জীবনের বিভিন্ন স্তরে ও বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটে থাকে যাকে বলা হয় বিকাশ। বিকাশ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, যেমন- মানসিক বিকাশ, প্রাক্ষোভিক বিকাশ, সামাজিক বিকাশ, দৈহিক বিকাশ, নৈতিক বিকাশ, আধ্যাত্মিক বিকাশ ইত্যাদি। একজন ব্যক্তির কোনো কিছু করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া, নির্ভুলভাবে কাজ সম্পাদন করা ইত্যাদি হল তার বিকাশের নমুনা। বিকাশের সাধারণ অর্থ হল গুণগত পরিবর্তন।
Hurlock-এর মতানুযায়ী বিকাশ হল, “progressive series of orderly, coherent changes.”
Berk তাঁর “Child Development” বইতে মানুষের বিকাশ বলতে বুঝিয়েছেন, “Which includes all changes we experience throughout the lifespan.” অর্থাৎ, সারা জীবনব্যাপী আমাদের জীবনে যে সমস্ত পরিবর্তন আসে তাই হল বিকাশ।
সুতরাং, বলা যেতে পারে যে বিকাশ হল মানব জীবনের জীবনব্যাপী, ক্রমোন্নয়নশীল, সামগ্রিক, গুণগত, পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, একটি শিশু প্রথমে বসে, তারপর হামাগুড়ি দেয়, তারপর দাঁড়ায়, ও পরে হাঁটতে পারে। এই যে ক্রমের কথা বলা হল এটি পরপর আসাটাই বিকাশের লক্ষণ।
বিকাশের বৈশিষ্ট্য
বিভিন্ন মনোবিদগণের বিভিন্ন পরীক্ষালব্ধ ফল থেকে বিকাশের যে বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করা যায়, সেগুলি হল-
বিকাশ অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া
বিকাশ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর পরিবর্তন নিরবচ্ছিন্নভাবে জীবনকাল ব্যাপী চলতে থাকে।
বিকাশ প্রক্রিয়ার নির্ভরশীলতা
শিশুর বিকাশ বংশগতি ও পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। শিশু যে ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যে পরিবেশে সে বড় হয় তার প্রভাব তার বিকাশের ওপর পড়ে।
জটিলতা
কোনো ব্যক্তির কোনো বিশেষ মুহূর্তে বিভিন্ন প্রকৃতির বিকাশ ও তার হার একে অন্যের থেকে কম বা বেশি হতে পারে কারণ বিকাশ প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল।
শৃঙ্খলিত প্রক্রিয়া
মানব জীবনের বিভিন্ন ধরনের বিকাশ একে অপরকে সহায়তা করে থাকে শৃঙ্খলিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া
বিকাশের যেকোনো পর্যায় পূর্ববর্তী সমস্ত পর্যায়ে সমষ্টিগত ফল বা ক্রম পর্যায়ের ঘটনা।
শিক্ষণের সাথে সম্পর্ক
শিশুরা পরিবেশ থেকে যে শিক্ষা সঞ্চয় করে তারই একত্রিত অবস্থা হল বিকাশ।
ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের বিকাশ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত
ব্যক্তির দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক, সামাজিক, নৈতিক, সমস্ত দিকের বিকাশ একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও নির্ভরশীল।
সামঞ্জস্য পূর্ণ প্রক্রিয়া
কোনো ব্যক্তির বিভিন্ন প্রকৃতির বিকাশ অর্থাৎ ছোট থেকে বড় হওয়ার বিভিন্ন আচরণ একটি নির্দিষ্ট ধারা বা নিয়ম মেনে চলে।
বৃদ্ধি ও বিকাশের তুলনামূলক আলোচনা
সাদৃশ্য-
- বৃদ্ধি ও বিকাশ উভয় ব্যক্তিগত প্রক্রিয়া।
- বৃদ্ধি ও বিকাশ পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত।
- বৃদ্ধি ও বিকাশ উভয় ক্ষেত্রেই বংশগতি এবং পরিবেশের প্রভাব রয়েছে।
- বিভিন্ন বয়সে বৃদ্ধি ও বিকাশের হার বিভিন্ন হয়।
- বৃদ্ধি ও বিকাশ একই প্রাণীদেহে সংঘটিত হয়ে থাকে।
- বৃদ্ধি ও বিকাশ উভয় ক্রমোন্নয়নশীল প্রক্রিয়া।
পার্থক্য-
- বৃদ্ধি বলতে উচ্চতা, আকার এবং ওজনের পরিবর্তনকে বোঝায়। অপরপক্ষে, বিকাশ হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার সূচনা করে থাকে।
- বৃদ্ধি পরিমাপযোগ্য অপরপক্ষে, বিকাশ পর্যবেক্ষণযোগ্য।
- বৃদ্ধি পরিমাণগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কিন্তু, বিকাশ গুণগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
- বৃদ্ধি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংগঠিত হলেও বিকাশ সারা জীবন ধরে হয়।
- বৃদ্ধি যদি হয় কারণ বিকাশ হল তার ফল।
- বৃদ্ধির সমাপ্তি হয় পরিণমনে অপরপক্ষে, বিকাশ আমৃত্যু প্রক্রিয়া।
- বৃদ্ধি একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া অপরদিকে, ব্যক্তিজীবনের বিকাশ তার বংশগতি ও পরিবেশের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে সংঘটিত হয়।
জীবন বিকাশের স্তরসমূহ
শিশু জন্মের পর থেকে পরিণতির দিকে এগোয়। বিভিন্ন মনোবিদ বৃদ্ধি ও বিকাশের বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মানুষের জীবনকালকে বয়স ও পরিবর্তন অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন।
আর্নেস্ট জোন্স (Ernest Jones)-এর মতে জীবন বিকাশের চারটি স্তর, যথা-
- শৈশব (০-৫);
- বাল্য (৫-১২);
- কৈশোর (১২-১৮);
- প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-এর ঊর্ধ্বে)।
মনোবিদ পিকুনাস (Justin Pikunas) জীবন বিকাশের স্তরকে দশটি স্তরে ভাগ করেছেন। যথা-
- প্রাক জন্মকালীন স্তর (গর্ভাবস্থা থেকে জন্ম মুহূর্ত পর্যন্ত);
- সদ্যোজাত স্তর (জন্মের পর থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত);
- প্রাথমিক শৈশব (এক মাস থেকে দেড় বছর বয়স পর্যন্ত);
- প্রান্তীয় শৈশব (দেড় বছর বয়স থেকে আড়াই বছর বয়স পর্যন্ত);
- প্রাথমিক বাল্য (আড়াই বছর বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত);
- মধ্য বাল্য (পাঁচ বছর থেকে নয় বছর বয়স পর্যন্ত);
- প্রান্তীয় বাল্য (নয় বছর থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত);
- বয়ঃসন্ধিকাল (১২ থেকে ২১ বছর বয়স পর্যন্ত);
- প্রাপ্তবয়স্ক স্তর (২১ থেকে ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত);
- বার্ধক্য স্তর (৭০ বছর বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত)।
মনোবিদ ও শিক্ষাবিদরা অনেক সময় শিক্ষার স্তর অনুযায়ী জীবন বিকাশের স্তরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন-
- প্রাক বিদ্যালয় স্তর (০-৬ বছর)- জন্মগ্রহণের পর থেকে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর্যন্ত সময়কাল।
- প্রাথমিক শিক্ষার স্তর (৬-৯ বছর)- প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণী।
- উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষার স্তর (৯-১৪ বছর)- পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণী।
- নিম্ন মাধ্যমিক স্তর (১৪-১৬ বছর)- নবম ও দশম শ্রেণী।
- উচ্চ মাধ্যমিক স্তর (১৬-১৮ বছর)- একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী।
- স্নাতক স্তর (১৮-২১ বছর)- কলেজ স্তরে শিক্ষার তিন বছর।
- স্নাতকোত্তর স্তর (২১-২৩ বছর)- বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- ঘোষ, সনৎ কুমার। শিখনে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। ক্লাসিক বুকস্, কলকাতা।
- পাল, গোবিন্দ পদ এবং মিত্র, গঙ্গারাম। শিখনের মনোবিজ্ঞান। নব প্রকাশনী, কলকাতা।
- Aggarwal, J.C. Essentials of Educational Psychology (2nd Ed.). Vikas Publishing House PVT LTD., New Delhi.
- চক্রবর্তী, প্রণব কুমার এবং ব্যানার্জী, দেবশ্রী। শিক্ষার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।
- পাল, দেবাশিস। শিক্ষার মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।




