সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষার মধ্যে সম্পর্ক | Relation between Sociology and Education

সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষার মধ্যকার সম্পর্ক (Relation between Sociology and Education) অত্যন্ত নিবিড় ও পারস্পরিক পরিপূরক। মানবসভ্যতার বিকাশ ও সামাজিক কাঠামোর অগ্রগতির ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষা হল দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেখানে সমাজবিজ্ঞান মানুষের সামাজিক আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক কাঠামোর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে, সেখানে শিক্ষা সেই তত্ত্বগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করে এবং ব্যক্তিকে আদর্শ সামাজিক সত্তা হিসেবে গড়ে তোলে। একটিকে ছাড়া অন্যটির অস্তিত্বের কথা কল্পনা করাও অসম্ভব।
এই দুটির মধ্যকার সম্পর্ক বোঝার আগে শিক্ষা ও সমাজবিজ্ঞানের অর্থ বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
সমাজবিজ্ঞানের ধারণা
‘Sociology’ শব্দটি এসেছে Latin শব্দ ‘Socius’ এবং ‘Logos’ থেকে। ‘Socious’ কথাটির অর্থ হল ‘Society’ (সমাজ) এবং ‘Logos’ শব্দটির অর্থ হল ‘Science’ (বিজ্ঞান)। সুতরাং, ‘Sociology’ কথার আক্ষরিক অর্থ হল ‘Science of Study.’
সমাজবিজ্ঞান বা সমাজবিদ্যা বা সমাজতত্ত্ব মানুষের সমাজ বা দলের বৈজ্ঞানিক আলোচনা শাস্ত্র। এতে সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনের সামাজিক দিক এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte)-এর “Positive Philosophy” গ্রন্থে প্রথম ‘Sociology’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber)-এর মতে, সমাজবিদ্যা বা সমাজতত্ত্ব হল এমন একটি বিজ্ঞান যা সামাজিক কাজের উদ্ভাসনমূলক অনুধাবনের চেষ্টা করে যাতে সামাজিক কাজের গতি ও ফলাফলের কারণভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করা যায়।
MacIver and Page (ম্যাকাইভার ও পেজ)-এর মতে, সমাজবিদ্যা হল মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ও সামাজিক সম্পর্কের জালিকা বিস্তার নির্ধারণকারী শাস্ত্র।
ডানকান (Duncan)-এর মতে, “Sociology is the scientific study of dynamic process of the interaction of person.” অর্থাৎ, সমাজবিজ্ঞান হল সমাজস্থ ব্যক্তিদের পারস্পরিক গতিশীল মিথস্ক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন।
সুতরাং, উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলি বিশ্লেষণে বলা যায়, সমাজের মধ্যেকার ব্যক্তির সম্পর্ক, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং গোষ্ঠীর কার্যাবলি নিয়ে যে শাস্ত্রে আলোচনা করা হয়ে থাকে, তাই হল সমাজবিজ্ঞান (Sociology)।
শিক্ষার ধারণা
মানবজীবন এক নিরবচ্ছিন্ন স্রোতধারা, সেই আদিম যুগ থেকে বর্তমানকালে নানান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সে আজ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার এই পথচলার সঙ্গী হল শিক্ষা, যা মানবকে উন্নততর জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার রসদ জুগিয়ে থাকে। শিক্ষার অর্থ হল লালন-পালন করা বা শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে তোলা। এর মধ্যে রয়েছে আচরণ পরিবর্তন, সামাজিকীকরণ, সামাজিক দক্ষতা অর্জন, পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক ও সুষম বিকাশ ঘটানোর প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, শিক্ষা শিশুর বিকাশে সহায়তা করে; শিশুর মধ্যে বিদ্যমান গুণাবলিকে বিকশিত ও পরিমার্জিত করে তোলে। তাই শিশুর ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)-এর মতে, “Education is the manifestation of perfection already in man.” অর্থাৎ, শিক্ষা হল ব্যক্তির অন্তর্নিহিত সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ।
মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi)-বলেছেন, “By Education, I mean an all-round drawing out of the best in the child and man-body, mind and spirit.” অর্থাৎ, শিক্ষা হল শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তির দেহ, মন ও আত্মার মহৎ গুণের পরিপূর্ণ ও সামঞ্জস্য বিবরণ।
সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে, শিক্ষা হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা ব্যক্তির আচরণে পরিবর্তন আনে এবং তাকে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে সার্থক অভিযোজনে সহায়তা করে।
সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষার সম্পর্ক
শিক্ষা এবং সমাজ
লৌকিক অর্থে শিক্ষা হল জ্ঞান অর্জন করা। জ্ঞান সঞ্চয়ের ফলে ব্যক্তির মানসিক শক্তিগুলির উৎকর্ষণ ঘটে, এই ধারণা প্রাচীনকালে অনেকের মধ্যেই বদ্ধমূল ছিল। কিন্তু শিক্ষার এই ধারণার সঙ্গে বাস্তব জীবন অথবা সামাজিক পরিবেশের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাই পরবর্তীকালে শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদগণ শিক্ষার ধারণা সম্পর্কে নতুন মত পোষণ করলেন। তাঁরা বললেন—শিক্ষা ও জীবন দুটি আলাদা বস্তু নয়। জীবনই শিক্ষা, শিক্ষাই জীবন। সমস্ত জীবন ধরেই মানুষ শিখে থাকে। অন্যান্য জীবের মতো মানুষের পুষ্টিকর খাদ্যে দেহের বৃদ্ধি ঘটে ও বংশরক্ষা হয়। ঠিক তেমনি শিক্ষা দ্বারা তার মানসিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে এবং তার সমাজজীবন বংশপরম্পরায় সন্তান-সন্ততির মধ্যে সঞ্চারিত হয়, সমাজ ও সংস্কৃতির ধারাকে বজায় রাখে।
আবার, এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে মানুষের জীবনযাপন প্রণালী ও ধ্যানধারণার পরিবর্তন হচ্ছে। তারই পরিণতি হল সামাজিক রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় ধ্যানধারণার পরিবর্তন। কাজেই এই নিয়ত পরিবর্তনশীল সামাজিক পরিবেশে ব্যক্তির সার্থক অভিযোজন বিশেষভাবে দরকার। শিক্ষাবিদ হর্নি (Horney) বলেছেন, “Education should be thought of as the process of man’s adjustment to his nature, to his fellows and to the ultimate nature of cosmos.” অর্থাৎ, শিক্ষা হল মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে, সমাজের মানুষের সঙ্গে এবং সমগ্র বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে সংগতিবিধানের প্রক্রিয়া।
সমাজ ও শিক্ষা
শিক্ষা একটি ব্যক্তিগত প্রক্রিয়া কিন্তু এই প্রক্রিয়া সমাজের পটভুমিতেই সম্ভব। ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করে সমাজভুক্ত পরিবারে। তার বুদ্ধি, কর্ম, আচার-আচরণ তথা ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ ঘটে সমাজের মধ্যেই। সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ বন্ধন। সমাজচেতনা, ব্যক্তির সহজাত প্রবৃত্তি সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তির সংগতিবিধানের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়, যার বাস্তবায়নে শিক্ষা হয় ফলপ্রদ। ব্যক্তির চাহিদা যেভাবে শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সামাজিক চাহিদাও সেভাবে শিক্ষার মধ্যে পরিতৃপ্তি খোঁজে এবং প্রতিষ্ঠালাভ করতে চায়।
সমাজের সৃষ্টি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে হলেও সমাজ-সংরক্ষণ, সামাজিক প্রগতি মানুষের শিক্ষার ওপরেই নির্ভরশীল। সমাজের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা প্রভৃতি দেখা দেয়। শিশু এগুলির সঙ্গে পরিচিত না হলে কিংবা তা মেনে না চললে সমাজের সংহতি বিনষ্ট হয়। সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শিশুকে তাই সমাজ জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন যা শিক্ষার দ্বারাই সম্ভব।
সামাজিক স্থিতি ও সংগতিবিধান শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য নয়। সমাজ সংরক্ষণও শিক্ষার উদ্দেশ্য। সমাজের বংশধরেরাই সমাজকে বাঁচিয়ে রাখে। শিক্ষায় সমাজের এই ধারাকে স্থান না দিলে প্রবহমান জলস্রোতে সমাজ কখনোই স্থায়ী হতে পারে না।
শিক্ষায় আমরা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিই। সমাজ পরিবেশ থেকে ব্যক্তি নানা উপাদান সংগ্রহ করে। ব্যক্তিত্ব ও সমাজবোধ- অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কযুক্ত। ব্যক্তি ছাড়া যেমন সমাজের অস্তিত্ব থাকে না, তেমনই সমাজ ছাড়াও ব্যক্তিকে কল্পনা করা যায় না। জন্মের পরই ব্যক্তি, সমাজ জীবনের আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ইত্যাদির সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই জড়িয়ে পড়ে। ফলে তার মধ্যে বিকশিত হয় সামাজিক সত্তা (Social self), অহংবোধ। ব্যক্তি উন্নীত হয় সামাজিক সত্তায়। তাই শিক্ষা তথা জীবন অভিজ্ঞতা সংগ্রহে সামাজিক পরিবেশের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
আধুনিক সমাজ শিক্ষাকে একটি সামাজিক শক্তি ও সমাজের প্রগতি, আধুনিকীকরণ ইত্যাদির মাধ্যম স্বরূপ গণ্য করে। তাই শিক্ষার আধুনিক বৈশিষ্ট্য হল- এটি একটি সামাজিক শক্তি বা Social force। শুধু জ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গে সঞ্চিত ভাবধারার পরিচিতি ঘটানোই শিক্ষার স্বরূপ নয়, সামাজিক নবীকরণ বা আধুনিকীকরণ ও প্রগতির উপকরণ হল শিক্ষা। কারণ, কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন বৈজ্ঞানিক এবং কারিগরি শিক্ষা প্রসারের দ্বারা দেশকে জীবনের অস্তিত্ব সংরক্ষণে স্বনির্ভর করা যাবে। সে জন্য প্রয়োজন শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিকীকরণ ও সমাজের অগ্রগতিতে তার যথাযথ প্রয়োগ। সুতরাং দেখা যায়, ব্যক্তি, সমাজ ও শিক্ষা নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং একে অপরের উপর নির্ভরশীল। এদিক থেকে বলা চলে, সমাজ তথা ব্যক্তির অগ্রগতিতে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম ও অপরিহার্য।
সমাজবিজ্ঞানকে মানুষ ও তার পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্কের অধ্যয়ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। এটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, সামাজিক সম্পর্ক বা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক গোষ্ঠী, সামাজিক কাঠামো, সামাজিক পরিবর্তন এবং অন্যান্য সামাজিক বিষয় বা ঘটনা নিয়ে আলোচনা করে। নিম্নে শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানের প্রভাব তুলে ধরা হল-
সমাজবিজ্ঞান এবং শিক্ষার ধারণা
শিক্ষা একটি সামাজিক প্রক্রিয়া যা ব্যক্তিকে সামাজিক চেতনার সাথে সম্পৃক্ত হতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, সমাজে কী ঘটছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন আসছে শিক্ষা সে সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলে। এটি সেই পরিবর্তনগুলোতে ব্যক্তির অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে এবং তাকে সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করে।
সমাজবিজ্ঞান এবং শিক্ষার লক্ষ্য
শিক্ষার মূল লক্ষ্য হল সামাজিক গুণাবলি, সামাজিক অনুভূতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক দক্ষতার বিকাশ ঘটানো এবং ব্যক্তিকে গণতান্ত্রিক জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুত করা। আমরা সবাই সামাজিক জীব। তাই সমাজের নীতি, রীতিনীতি বা নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।
সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষার কার্যাবলী
শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামো বিকাশের মাধ্যমে ব্যক্তি বিভিন্ন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ ও গ্রহণ করেন, ফলস্বরূপ একজন ব্যক্তি বুঝতে পারেন কীভাবে একটি সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে ব্যক্তির সৃজনশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা কী?
সমাজবিজ্ঞান ও পাঠক্রম
পাঠক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার সামাজিক উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যেই পাঠক্রম সুবিন্যস্ত ও পরিকল্পিত করা হয়। সামাজিক চাহিদা ও সমাজের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে পাঠক্রমের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে পাঠক্রমকেও যুগোপযোগী হতে হবে। প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য; কারণ নিরক্ষর বা প্রযুক্তি জ্ঞানহীন ব্যক্তির পক্ষে এই পরিবর্তনশীল সমাজে টিকে থাকা কঠিন। তাই সমাজের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাঠক্রমে পরিবর্তন আনা জরুরি।
সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষাপদ্ধতি
প্রজেক্টভিত্তিক কাজ বা দলগত সমস্যা সমাধানের (Group problem solving) মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিগুলো শিশুর সামাজিক বিকাশে সহায়তা করবে।
সমাজবিজ্ঞান ও শৃঙ্খলাবোধ
শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলার জন্য একটি উন্নত সামাজিক পরিবেশ প্রয়োজন। শৃঙ্খলা একটি সামাজিক অনুভূতি; মানুষ যখন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, কেবল তখনই এই অনুভূতির বিকাশ ঘটে। তাই মানুষের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থী শৃঙ্খলাবোধ এবং সমাজে কীভাবে আচরণ করতে হয়, তা শেখে।
সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষক
শিক্ষকদের সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দেশ ও সমাজের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা তাদের জানা প্রয়োজন। একজন শিক্ষকের উচিত শিশুর মধ্যে সু-নাগরিকসুলভ গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলা, যাতে সেই গুণগুলো শিশুর ব্যক্তিত্বে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
সমাজবিজ্ঞান ও বিদ্যালয়
বিদ্যালয় হল এমন একটি স্থান যেখানে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিদ্যালয় হল সমাজেরই একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এখানে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীর সাথে মেলামেশার সুযোগ ঘটে এবং দিনের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়েই অতিবাহিত হয়। সামগ্রিকভাবে, একজন শিক্ষার্থীর বিকাশের জন্য বিদ্যালয়ই হল সর্বোত্তম স্থান।
উপরোক্ত নানান ক্ষেত্রগুলি বিশ্লেষণে বলা যেতে পারে, সমাজবিজ্ঞান এবং শিক্ষার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই নিবিড় এবং দৃঢ়। সমাজবিজ্ঞান যেখানে সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি, সামাজিক পরিবর্তন ও মানুষের আচরণ নিয়ে পর্যালোচনা করে, সেখানে শিক্ষা সমাজকে টিকিয়ে রাখা, প্রজন্মের পর প্রজন্মে সংস্কৃতির সঞ্চালন এবং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কোনো সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা তার নিজস্ব মূল্যবোধ, আদর্শ ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে; অন্যদিকে, শিক্ষা মানুষের চেতনার বিকাশ ঘটায়, কুসংস্কার দূর করে এবং সামাজিক রূপান্তর ও অগ্রগতি নিশ্চিত করে। সহজ কথায়, সমাজবিজ্ঞান শিক্ষাকে সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝতে সহায়তা করে, আর শিক্ষা সমাজবিজ্ঞানের লক্ষ্যগুলোকে বাস্তবে রূপ দিয়ে সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- চট্টরাজ, অধ্যাপক শ্যামাপ্রসাদ। শিক্ষামুখী সমাজবিজ্ঞান। সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, কলকাতা।
- পাল, ড. দেবাশিস। শিক্ষার সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তির রূপরেখা। রীতা বুক এজেন্সি, কলকাতা।
- তরফদার, ড. মঞ্জুষা। শিক্ষাশ্রয়ী সমাজবিজ্ঞান। কে. চক্রবর্তী পাবলিকেশনস্, কলকাতা।
- চক্রবর্তী, ড. সোনালী। শিক্ষার সমাজ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। সোমা বুক এজেন্সি, কলকাতা।
- ঘোড়াই, নিমাই চাঁদ। শিক্ষাদর্শন ও সামাজিক শিক্ষা। সাঁতরা পাবলিকেশন প্রা. লি., কলকাতা।
- ভট্টাচার্য্য, দিব্যেন্দু। শিক্ষা ও সমাজতত্ত্ব। Pearson, Uttar Pradesh, India.






