জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ | National Education Policy 2020

নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি (National Education Policy 2020) ২০২০ হল ভারতের একবিংশ শতাব্দীর প্রথম শিক্ষানীতি, যা পূর্ববর্তী ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ (NPE) ১৯৮৬-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে।
ভূমিকা
১৯৮৬-র পর ২০২০-তে জাতীয় শিক্ষানীতির বদলের কথা ভেবে কেন্দ্রীয় সরকার মন্ত্রিসভায় ২৯শে জুলাই ২০২০ তারিখে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমােদন করেছেন। যার লক্ষ্য হল প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার সঙ্গে বৃত্তিমুখী শিক্ষা (গ্রামীণ ও শহর)-কে আরাে দৃঢ়তর করা। ২০১৪-তে বিজেপি যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারই ফলস্বরূপ ২০১৫-তে টি.এস.আর. সুব্রামনিয়ামকে (প্রাক্তন ক্যাবিনেট সেক্রেটারি) খসড়া রচনার ভার দেওয়া হয় ও তিনি ৪৮৪ পৃষ্ঠার খসড়া ২০১৯-এ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পেশ করেন।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় ড. কে. কস্তুরিরঙ্গনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল, যারা এই নতুন শিক্ষানীতির রূপরেখা প্রণয়ন করেন।
- জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ স্কুল, উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই এমন বিভিন্ন সংস্কারের প্রস্তাব করে, যা একবিংশ শতাব্দীর চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- NEP ২০২০-এর ৫টি মূল ভিত্তি হল- অভিগম্যতা (Access), সমতা (Equity), গুণমান (Quality), সাশ্রয়যোগ্যতা (Affordability) এবং দায়বদ্ধতা (Accountability)।
- এই শিক্ষানীতিটি ‘2030 Agenda for Sustainable Development‘-র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- এর লক্ষ্য হল স্কুল এবং কলেজ উভয় স্তরের শিক্ষাকেই আরও সামগ্রিক, নমনীয় এবং বহুমুখী করে তোলার মাধ্যমে ভারতকে একটি প্রাণবন্ত জ্ঞান-ভিত্তিক সমাজ ও বৈশ্বিক জ্ঞান-শক্তি হিসেবে রূপান্তরিত করা; যার মূল উদ্দেশ্য হল প্রতিটি শিক্ষার্থীর অনন্য সক্ষমতা ও প্রতিভা বিকশিত করে তোলা।
প্রেক্ষাপট
আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে এবং বৃত্তিমুখী ও বিজ্ঞানকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা-কে কায়েম করতে কেন্দ্রীয় সরকার যে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন, তারই ফলস্বরূপ নানা ক্ষেত্রের মতাে শিক্ষাক্ষেত্রেও আধুনিকীকরণ করার প্রয়াস করছেন। এজন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের নাম বদলে শিক্ষা মন্ত্রক করা হয়েছে যার দায়িত্বে রমেশ পােখরিয়াল নিশাঙ্ক। সমালােচকের মতে বিজেপি-র দ্বারা শিক্ষাক্ষেত্রকে গৈরিকীকরণ করে নিজেদের লােককে বিভিন্ন পদে বসিয়ে তাদের মাধ্যমে নতুন শিক্ষানীতিকে নিজেদের মতের ও পথের উপযােগী করে প্রচার করার সুযােগ পাবেন।
NEP 2020 পূর্ববর্তী নীতিগুলো থেকে কীভাবে আলাদা?
জাতীয় শিক্ষানীতি (NPE) সর্বপ্রথম ১৯৬৮ সালে কোঠারি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের শিক্ষানীতিটি সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া, প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে, ১৯৯২ সালের ‘কর্মপরিকল্পনা’ (POA) বা ‘প্ল্যান অফ অ্যাকশন’-এ প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল।
NEP 2020 পূর্ববর্তী নীতিগুলো থেকে স্বতন্ত্র এবং নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ভিত্তিতে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে:
- সামগ্রিক বিকাশের ওপর গুরুত্ব : ভারতের মেধা ও মানবসম্পদ ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, আলোচনা এবং বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
- বৃত্তিমূলক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি : এই নীতিটি বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্বকে স্বীকার করে এবং এটিকে মূলধারার শিক্ষার সাথে একীভূত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
- প্রযুক্তি-সহায়ক শিক্ষার ওপর জোর : নতুন শিক্ষানীতি শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয় এবং শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করার লক্ষ্যে ডিজিটাল সরঞ্জাম ও প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে।
- বহুভাষিকতার প্রসার : নতুন এই নীতিটি বহুভাষিকতার গুরুত্বের ওপর জোর দেয় এবং প্রয়োজনীয় নমনীয়তা বজায় রেখে ইংরেজি ও হিন্দির পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষাগুলোর শিক্ষাদানকে উৎসাহিত করে।
- নমনীয় ও বহুশাস্ত্রীয় পাঠক্রম : NEP 2020-এর আওতায় বিষয় নির্বাচনের স্বাধীনতা, বিদ্যালয়ে সফটওয়্যার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ক্রেডিট স্থানান্তর, এবং ‘একাধিকবার প্রবেশ ও প্রস্থান’ (Multiple Entry and Exit) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে।
NEP 2020-এর অধীনে নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ
- ২০৩০ সালের মধ্যে প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা (ECCE) থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার সর্বজনীনকরণ যা Sustainable Development Goal 4 (SDG 4)-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- ২০২৫ সালের মধ্যে একটি জাতীয় অভিযানের মাধ্যমে মৌলিক শিখন নীতি ও সংখ্যা জ্ঞান দক্ষতা অর্জন।
- ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাক্-বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ১০০% GER (Gross Enrolment Ratio) অর্জন।
- ২০৩৫ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় ৫০% GER অর্জন।
- মুক্ত বিদ্যালয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ২ কোটি শিশুকে শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা।
- ২০২৩ সালের মধ্যে মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারের জন্য শিক্ষকদের প্রস্তুত করা।
- ২০৩০ সালের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
NEP 2020-এর সুপারিশসমূহ
বিদ্যালয় শিক্ষা
বিদ্যালয়স্তরে যে পরিবর্তনগুলি জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রবর্তিত হয়েছে, তা হল-
- বিদ্যালয় শিক্ষাকে ১০+২-এর পরিবর্তে ৫+৩+৩+৪ এই আদলে সাজানাে হয়েছে। ৩ বছরের প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সাথে দশম শ্রেণির পরীক্ষাব্যবস্থা অবলুপ্ত করে ৯-১২ ক্লাস পর্যন্ত একটা অভিন্ন ৮ সেমেস্টারের সিস্টেম শুরু হয়েছে, যা ওপেন স্কুলের ক্ষেত্রেও একই হবে।
- তিন বছর প্রাক্-প্রাথমিক, দুই বছর প্রাথমিক (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) ৮ বছর বয়স পর্যন্ত, তারপর তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি (৮-১১), ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি (১১-১৪), নবম থেকে দ্বাদশ (১৪-১৮ বছর বয়স)।
- পৃথকভাবে কলা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য বিভাগ না রেখে সুবিধামতাে শিক্ষার্থী যেকোনো বিষয় গ্রহণ করতে পারবে।
- ২০২৫ সাল নাগাদ সব রাজ্য ও কেন্দ্রের বিদ্যালয়কে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
- ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যাতে ৫০ শতাংশ বিদ্যালয়কে প্রশিক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে।
- ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কোডিং শেখানাে, বৃত্তিমূলক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
- মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ত্রিস্তরীয়-(নিজেরা, সহপাঠীর ও শিক্ষক শিক্ষিকারা) ব্যবস্থা থাকবে।
- বাের্ড পরীক্ষায় বড় ও ছােট প্রশ্ন থাকবে।
- প্রথম শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে প্রথম তিন মাস খেলাভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
- শিক্ষার লক্ষ্য হবে শুধু জ্ঞান অর্জন নয় বরং, তার চরিত্র গঠন ও সার্বিক বিকাশের উপযােগী।
- ন্যূনতম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষা বা স্থানীয় ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।
- দিব্যাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা।
- স্বাক্ষরতা, প্রাথমিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষণ, জটিল জীবনশৈলী বিষয়ে শিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
- সংস্কৃত ভাষাকে বিদ্যালয় স্তরে গুরুত্ব দিতে হবে।
উচ্চশিক্ষা
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে যে সুপারিশগুলি গৃহীত হয়েছে, তা হল-
- ২০৪০ সাল নাগাদ সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে মাল্টিডিসিপ্লিনারি করতে হবে এবং ন্যূনতম ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা হবে ৩০০০ এবং প্রতি জেলায় অন্তত একটি করে এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
- মূল্যায়নের গ্রেড অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অনলাইন প্রােগ্রাম ও দূরশিক্ষার ব্যবস্থা (DDL) থাকবে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সমাজসেবা; পরিবেশ বিদ্যা, নীতিশিক্ষা প্রভৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেবে ও ক্রেডিট বেসড স্কোরিং চালু করবে।
- কলেজে ভর্তির জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা থাকবে, কোনাে কলেজ না চাইলে চালু নাও করতে পারে।
- স্নাতক কোর্স ৩/৪ বছরের, স্নাতকোত্তর কোর্স ১/২ বছরের এবং ইন্টিগ্রেটেড কোর্স ৫ বছরের হবে।
- উচ্চশিক্ষায় এন্ট্রি ও এক্সিট-এ অনেক স্বাধীনতা থাকছে সেই অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।
- এম.ফিল কোর্স থাকছে না।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইকো ক্লাব, স্পাের্টস ক্লাস, সংস্কৃতি ও কলা কেন্দ্রসহ নানা ভারমুক্ত বিষয়ের সুযােগ থাকবে।
- ছাত্রাবাস ও ন্যূনতম চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযােগ থাকবে।
- সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এক ছাতার তলায় এনে Higher Education Commission of India গঠিত হবে যার অধীনে থাকবে- NHERC, NAC, HEGC, GEC ইত্যাদি।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লাভজনক ক্ষেত্র হবে না।
- প্রযুক্তিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগাতে Indian Institute of Translation and Interpretation (IITI) গড়ে তােলা হবে।
অন্যান্য
এছাড়া,
- সহশিক্ষক/প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকাদের নিজেদের উদ্যোগে প্রতিবছর ৫০ ঘণ্টার Continuous Professional Development (CPD)-এ অংশগ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
- ২০২১ সাল নাগাদ NCTE ও NCERT-র যৌথ উদ্যোগে NCFTE প্রকাশ পাবে।
- ২০৩০ সাল নাগাদ সাধারণ ডিগ্রি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হবে।
- চার বছরের ইন্টিগ্রেটেড স্নাতক ও বি.এড. এবং স্নাতক-দের দু’বছরের বি.এড., চালু হবে। স্নাতকোত্তরদের ১ বছরের বি.এড. কোর্স হবে।
- শিক্ষায় প্রযুক্তি, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ভার্চুয়াল ল্যাব-এর ব্যবস্থা থাকবে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও ছাত্রছাত্রীদের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে টেকনােলজির ব্যবহার করা হবে।
NEP 2020 বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ
- একাডেমিক ব্যাঙ্ক অফ ক্রেডিট (Academic Bank of Credit) :
- উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে ‘একাডেমিক ব্যাঙ্ক অফ ক্রেডিট’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য ইউজিসি (UGC) বিধিমালা জারি করেছে।
- এটি একটি জাতীয় স্তরের ডিজিটাল ব্যবস্থা হবে, যার লক্ষ্য হল ক্রেডিট সঞ্চয়, ক্রেডিট স্থানান্তর এবং ক্রেডিট বিনিময়ের একটি আনুষ্ঠানিক পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত গতিশীলতা (academic mobility) বৃদ্ধি করা।
- নিপুণ ভারত (NIPUN Bharat) :
- সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ‘মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যা জ্ঞান বিষয়ক জাতীয় মিশন’ (FLN Mission)।
- বিদ্যা প্রবেশ (Vidya Pravesh) :
- প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য তিন মাসব্যাপী ‘খেলার মাধ্যমে স্কুল প্রস্তুতির মডিউল’-এর নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে।
- আঞ্চলিক ভাষায় প্রথম বর্ষের ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠক্রম :
- AICTE আঞ্চলিক ভাষায় কারিগরি শিক্ষা প্রদানের বিধান চালু করেছে।
- জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষা স্থাপত্য বা National Digital Education Architecture (NDEAR) :
- ২০২১-২২ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে ‘জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষা স্থাপত্য’ (NDEAR) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে; এক্ষেত্রে শিক্ষার জন্য দেশের ডিজিটাল পরিকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
- শিক্ষার স্তর বিশ্লেষণের জন্য কাঠামোগত মূল্যায়ন বা Structured Assessment for Analyzing Learning levels (SAFAL) :
- ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে CBSE স্কুলগুলোতে তৃতীয়, পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য ‘SAFAL’ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
- এই মূল্যায়নে মূল ধারণাগুলো যাচাই, প্রয়োগ-ভিত্তিক প্রশ্ন এবং উচ্চতর চিন্তন দক্ষতার পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- অনলাইন ডিগ্রি পাঠক্রম :
- ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইন ডিগ্রি পাঠক্রম চালু করার এবং শিক্ষাখাতে নিজেদের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার অনুমতি প্রদান করে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহু-বিষয়ক পাঠক্রমের (Multidisciplinary streams) প্রাপ্যতা
- IIT দিল্লি, IIT রুরকি এবং IIT খড়গপুর-সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কলেজগুলো ধীরে ধীরে তাদের পাঠক্রমে প্রকৌশল-বহির্ভূত (non-engineering) বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করছে; এর ফলে শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের এক বিস্তৃত সুযোগ পাচ্ছে।
NEP 2020-এর সমালোচনা বা ত্রুটি
জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) 2020 বিভিন্ন অংশীজনদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। NEP 2020-এর প্রধান সমালোচনাগুলোর মধ্যে কয়েকটি হল-
- বেসরকারীকরণের ওপর জোর : সমালোচকদের মতে, NEP 2020 সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে শিক্ষার বেসরকারীকরণকে প্রশ্রয় দেয়; এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
- ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ : NEP 2020-এর বিরুদ্ধে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ উঠেছে, কারণ এই নীতি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে, যেমন- এটি কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘জাতীয় শিক্ষাগত প্রযুক্তি ফোরাম’ (National Educational Technology Forum) এবং ‘জাতীয় গবেষণা ফাউন্ডেশন’ (National Research Foundation) গঠনের এক্তিয়ার প্রদান করে।
- বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অস্পষ্টতা : NEP 2020-এ বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত স্পষ্টতার অভাব রয়েছে; তাছাড়া, এই নীতিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা ‘রোডম্যাপ’ প্রদান করে না।
- পরামর্শ গ্রহণের অভাব : কোনো কোনো সমালোচক যুক্তি দেখিয়েছেন যে, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সাথে পর্যাপ্ত পরামর্শ বা আলোচনার সুযোগ না রেখেই NEP 2020 প্রণয়ন করা হয়েছে।
- সমন্বয়ের অভাব : দুটি নীতির—’শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯’ (Right to Education Act 2009) এবং এই নতুন শিক্ষানীতির—একইসাথে বিদ্যমান থাকার ফলে উদ্ভূত আইনি জটিলতার কারণে NEP 2020 সমালোচনার মুখে পড়েছে।
NEP 2020 বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাসমূহ
- বিশালতা ও বৈচিত্র্য : ভারতের শিক্ষা খাতের বিশাল আকার এবং ব্যাপক বৈচিত্র্যের কারণে এর বাস্তবায়ন একটি অত্যন্ত কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা : শিক্ষা মন্ত্রণালয়গুলো (কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় পর্যায়ে) এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা NEP-তে পরিকল্পিত বিশাল মাত্রার রূপান্তর বা পরিবর্তনগুলো পরিচালনা করার জন্য অপর্যাপ্ত।
- মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের সম্ভাব্য জটিলতা : ভারতের বৈচিত্র্যময় ভাষাগত পরিস্থিতির কারণে যেখানে ২২টি দাপ্তরিক ভাষা এবং অসংখ্য উপভাষা প্রচলিত, সেখানে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের উপযোগী করে পাঠক্রমের উপকরণগুলো প্রস্তুত করা একটি সমস্যাজনক বিষয় হতে পারে।
- ডিজিটাল বিভাজন : NEP 2020-তে ডিজিটাইজেশন এবং ই-লার্নিংয়ের ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তা হয়তো ভারতের বিদ্যমান ‘ডিজিটাল বিভাজন’-এর বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি; কারণ দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৩০ শতাংশের পক্ষে স্মার্ট-ফোন কেনা সম্ভব এবং কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা আরও নগণ্য।
- সীমিত সম্পদ : NEP 2020-তে শিক্ষাগত সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক সম্প্রসারণের (জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ) আহ্বান জানানো হয়েছে; কিন্তু সরকারি তহবিলের ওপর অন্যান্য খাতের প্রতিযোগিতামূলক দাবি এবং সামগ্রিকভাবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
উপসংহার
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজ্যের সঙ্গে আলােচনা করে বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজের মতামত নিয়ে সমন্বয় ও সহমতের ভিত্তিতে, স্থানীয় চাহিদার কথা ও পরিকাঠামাের কথা ভেবে এবং ভাষাগত দিকের কথা চিন্তা করে আশা করা যায় এই শিক্ষানীতি সকলের পক্ষেই কল্যাণকর হবে।
শুধু বদলের জন্য বদল নয় কিম্বা, উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য পরিবর্তন নয় বরং; যুগের চাহিদা ও ছাত্র-ছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে আমাদের দেশের ভৌগােলিক অবস্থান ও সুযােগ-সুবিধার কথা ভেবে, আগামী দিনের শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনমুখী ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করতে এই শিক্ষানীতি বিশেষ ফলপ্রসূ হবে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- https://www.education.gov.in/
- https://en.wikipedia.org/wiki/
- https://byjus.com/
- https://www.researchgate.net/






