সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির প্রকারভেদ এবং শিক্ষামূলক গুরুত্ব | Types and Importance of Co-curricular Activities

শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হল সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি। সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি বলতে সেই সকল কাজকে বোঝানো হয় যেগুলিকে পাঠক্রমের বহির্ভূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু যেগুলিকে ব্যতিরেকে পাঠক্রম সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এই আর্টিকেল-এর আলোচনার বিষয়বস্তু হল- সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির প্রকারভেদ এবং শিক্ষামূলক গুরুত্ব (Types and Importance of Co-curricular Activities) সম্পর্কিত স্বচ্ছ এবং বিস্তারিত ধারণা তুলে ধরা।
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির প্রকারভেদ
বর্তমানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যেসব সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির আয়ােজন করা হয়, সেগুলি সম্পর্কে নীচে আলােচনা করা হল-
শরীরচর্চামূলক কার্যাবলি
বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলাে যেমন -ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, টেবিল-টেনিস, ক্রিকেট, খাে খাে, হকি, যােগব্যায়াম, পিটি, লংজাম্প, হাইজাম্প, দৌড় প্রভৃতির দ্বারা শরীরচর্চা হয়ে থাকে।
শিক্ষামূলক কার্যাবলি
যেসব পরিকল্পিত কাজের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে বলে নির্দিষ্ট করা হয়, সেগুলিকে শিক্ষামূলক কার্যাবলি বলে। শিক্ষামূলক কার্যাবলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল শ্রেণীকক্ষে পঠনপাঠন, বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরষ্কার-বিতরণী অনুষ্ঠান, বিতর্কসভা, আলােচনাচক্র, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, শিক্ষামূলক ভ্রমণ ইত্যাদি।
সাংস্কৃতিক কার্যাবলি
যেসব পরিকল্পিত কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে সেগুলিকে সাংস্কৃতিক কার্যাবলি বলে। বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কার্যাবলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল বিদ্যালয়ের বার্ষিক সামাজিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণী সভা, মহাপুরুষদের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন, বিভিন্ন ধরনের চিত্রকলা প্রদর্শনী, বিজ্ঞান প্রদর্শনী, বিদ্যালয়ে সংরক্ষণশালা সংগঠন, নাট্য উৎসব ইত্যাদি।
আত্মপ্রকাশমূলক কার্যাবলি
যেসব কাজের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থী নিজেকে আত্মপ্রকাশ করার সুযােগ পায় সেগুলিকে আত্মপ্রকাশনামূলক কার্যাবলি বলে। আত্মপ্রকাশনামূলক কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে শিক্ষামূলক ভ্রমণ, প্রকৃতি পরিচয়মূলক কার্যাবলি, পর্বতারােহণ, বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্প (NCC, NSS), সমাজসেবা, ব্রতচারী, বৃক্ষরােপণ উৎসব পালন, বিদ্যালয়ের বাগান তৈরি, পত্রিকা প্রকাশনা ইত্যাদি।
সহযােগিতামূলক কার্যাবলি
যেসব পরিকল্পিত কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযােগিতার ভাব উৎসাহিত হয় সেগুলিকে সহযােগিতামূলক কার্যাবলি বলে। স্কাউটিং, ব্রতচারী, সেবামূলক কাজ, বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগের প্রকল্পে অংশ নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বতঃস্কূর্তভাবেই পারস্পরিক সহযােগিতার মনােভাব গড়ে ওঠে।
সামাজিক কার্যাবলি
সামাজিক চেতনা বিকাশে সহায়ক পরিকল্পিত কাজগুলিকেই সামাজিক কার্যাবলি বলে। এই সমস্ত কাজের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল রক্তদান শিবির পরিচালনা, সাক্ষরতা কর্মসূচির বাস্তবায়ন, পরিবেশ সচেতনতা কর্মসূচি, বিদ্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন ইত্যাদি।
প্রাক্ষোভিক বিকাশমূলক কার্যাবলি
যেসব সংগঠিত কাজ শিক্ষার্থীর প্রাক্ষোভিক বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে তাদের প্রাক্ষোভিক বিকাশমূলক কার্যাবলি বলে। যেমন-সংগীত, সাহিত্যচর্চা, নৃত্যানুষ্ঠান, অভিনয় প্রভৃতি।
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির শিক্ষামূলক গুরুত্ব বা উপযােগিতা
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির শিক্ষামূলক গুরুত্ব বা উপযােগিতা নিয়ে আধুনিক শিক্ষাবিদদের মধ্যে তেমন কোনো মতবিরোধ নেই। নীচে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির শিক্ষামূলক গুরুত্ব আলােচনা করা হল-
শিক্ষার্থীর চাহিদার পরিতৃপ্তি
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি শিক্ষার্থীর চাহিদার পরিতৃপ্তিতে বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে। শিক্ষার্থীর চাহিদা ও প্রবণতা অনুযায়ী সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি নির্দিষ্ট করা হয়।
সামাজিক বিকাশ
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির যথাযথ সংগঠনের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযােগিতা, সমবেদনা, ভ্রাতৃত্ববােধ, পারস্পরিক বােঝাপড়া প্রভৃতি গুণের বিকাশ ঘটে, যা প্রতিটি সমাজের পক্ষে বিশেষ প্রয়ােজনীয়।
আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা
শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তােলার ক্ষেত্রে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি অত্যন্ত প্রয়ােজনীয়। শিক্ষার্থী যে বিষয়ে দক্ষ সেই বিষয়গুলিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযােগ পায়।
একঘেয়েমি দূরীকরণ
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় জীবনের গতানুগতিকতা থেকে মুক্তি দেয়। বিভিন্ন সৃষ্টিশীল, বিনােদনমূলক, ক্রীড়ামূলক অনুষ্ঠান আয়ােজনের মাধ্যমে বিদ্যালয় তাদের কাছে এক আনন্দনিকেতন হয়ে ওঠে।
শৃঙ্খলা গঠন
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির প্রতিটি কাজ সম্পাদন করতে গেলে শিক্ষার্থীদের কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।
বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ
বিদ্যালয়ের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির মাধ্যমে অনেক সময় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় শিক্ষার্থীরা সেই সমস্ত বৃত্তি প্রশিক্ষণ নিয়ে বার বার সেগুলির অনুশীলন করে। তারা এই শিক্ষাগুলি এমনভাবে আয়ত্ত করে, যে তা কোনাে কোনাে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের জীবিকা অর্জনে সহায়তা করে।
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি পরিচালনার নীতি
বিদ্যালয়ে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি পরিচালনার ক্ষেত্রে মােটামুটিভাবে যে নীতিগুলি মেনে চলা উচিত তা নিয়ে আলােচনা করা হল-
স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচন
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে তার ইচ্ছা এবং ক্ষমতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। তবেই শিক্ষার্থী সেগুলিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে। আর তার ফলেই তার সার্বিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে।
বিদ্যালয়ের সময়সূচীতে স্থান দান
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি যেহেতু শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশে সহায়ক, তাই তাকে বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচীর মধ্যেই স্থান দিতে হবে।
স্বল্প গুরুত্ব প্রদান
বিদ্যালয়ের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি পরিচালনা করতে গিয়ে পাঠক্রমিক কার্যাবলি বা শ্রেণির কাজকে ব্যাহত করা চলবে না।
অংশগ্রহণে নিয়ন্ত্রণ
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলিকে কেবলমাত্র বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
যােগ্য শিক্ষক নির্বাচন
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির সাফল্য নির্ভরশীল সেই শিক্ষক-শিক্ষিকার ওপর, যাঁরা ওই কার্যাবলি সংগঠিত করেন। কেবলমাত্র যােগ্য ও পারদর্শী শিক্ষক-শিক্ষিকাকেই নির্দিষ্ট কাজের ভার দিতে হবে।
নেতৃত্বের মর্যাদা দান
সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি সংগঠিত করার সময় বহু ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষার্থীর বিশেষ পারদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। যেসব শিক্ষার্থীর মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্যের বিকাশ ঘটবে, তাদের নেতৃত্বের ক্ষমতাকে মর্যাদা দিতে হবে। তাহলে আগামী দিনে তারা আরও উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে।
শৃঙ্খলা রক্ষা
বিদ্যালয়ের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি পরিচালনার সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে সেদিকে যথেষ্ট নজর দিতে হবে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- ভট্টাচার্য, দিব্যেন্দু। পাঠক্রম চর্চা ও মূল্যায়ন। আলপনা এন্টারপ্রাইজ, কলকাতা।
- পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
- ঘোড়াই, নিমাই চাঁদ। শিক্ষাদর্শন ও সামাজিক শিক্ষা। সাঁতরা পাবলিকেশন প্রা. লি., কলকাতা।
- চট্টোপাধ্যায়, মিহির কুমার., চক্রবর্তী, প্রণব কুমার এবং ব্যানার্জী, দেবশ্রী। শিক্ষা প্রসঙ্গ। রীতা বুক এজেন্সি, কলকাতা।
- ব্যানার্জী, কে। শিক্ষাবিজ্ঞান। বাণী প্রকাশন, কলকাতা।






