|

পরামর্শদানের কৌশলসমূহ – প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, সমন্বয়ী | Techniques of Counselling

পরামর্শদানের কৌশলসমূহ (Techniques of Counselling)- প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, সমন্বয়ী এই তিনটি ধারায় বিভক্ত। পরামর্শদান (Counselling) হল সম্পূর্ণরূপে একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যেখানে পরামর্শগ্রহীতার সমস্যার গতি প্রকৃতির বিশ্লেষণ করে সঠিক কৌশল নির্বাচন করে, তার সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

এক ব্যক্তি কর্তৃক অপর ব্যক্তিকে সহায়তাদানের মাধ্যমে তার নিজ সম্পর্কে সচেতন করা ও ভবিষ্যতে কার্যকরী আচরণ সম্পাদনের লক্ষ্যে মূল্যবোধকে বিকশিত করার প্রক্রিয়াই হল পরামর্শদান।

পরামর্শদান মনোবিজ্ঞানের একটি ফলিত শাখা। বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক নীতি ও পদ্ধতির উপর পরামর্শদান নির্ভরশীল। কিন্তু ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শদান প্রক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। এবং কিছু ক্ষেত্রে তা লক্ষণের ধরণ ও তীব্রতার উপরও নির্ভর করে। মনোবিজ্ঞানের অভিধানে এই কৌশল প্রধানত তিন প্রকার। যথা-

প্রত্যক্ষ পরামর্শদান

প্রত্যক্ষ পরামর্শদানের অর্থ

পরামর্শদানের যে প্রকার কৌশলে, পরামর্শদাতা পরামর্শগ্রহীতার আগ্রহ ও অনুভূতির দিকটিকে উপেক্ষা করে তার সমস্যার উপর অধিক গুরুত্ব অরোপ করে থাকে, তাকে বলে প্রত্যক্ষ পরামর্শদান। এই পরামর্শের মাধ্যমে পরামর্শদাতা পরামর্শগ্রহীতাকে সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে নির্দিষ্ট নির্দেশ দেয়।

ই. জি. উইলিয়ামসন (E. G. Williamson)এর মতে, “Counselling is a personalised and individualised process designed to aid the individual to learn school subject-matter, citizenship tacts and other habits, skills, attitudes and beliefs which go to make up a normally adjusted human being. Counselling aids individuals to eliminate or to modify those disabilities  which act as obstacles to learning through the building up of basic skills, including  reading and social adjustment.”

প্রত্যক্ষ পরামর্শদানের বৈশিষ্ট্য

প্রত্যক্ষ পরামর্শদান সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল-

  1. প্রত্যক্ষ পরামর্শদান হল পরামর্শদাতাকেন্দ্রিক। এখানে পরামর্শগ্রহীতার আগ্রহ ও অনুভূতির দিকটিকে উপেক্ষা করে তার সমস্যার উপর অধিক গুরুত্ব অরোপ করা হয়।
  2. প্রত্যক্ষ পরামর্শদান প্রক্রিয়ায় পরামর্শগ্রহীতার তুলনায় পরামর্শদাতার ভূমিকা অধিক সক্রিয়।
  3. পরামর্শগ্রহীতার সমস্যা নির্ণয় করার জন্য পরামর্শদাতা বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষা প্রয়োগ করে থাকেন।
প্রত্যক্ষ পরামর্শদানের সুবিধা

প্রত্যক্ষ পরামর্শদানের সুবিধাগুলি হল-

  1. এই প্রকার কৌশলে সময়ের সাশ্রয় হয়। কারণ, এই প্রকার কৌশলে সরাসরি এবং ব্যাখ্যামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
  2. এই প্রকার কৌশল রোগীর অনুভূতি স্তরে ক্রিয়াশীল না হয়ে, তার সমস্যার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এখানে পরামর্শদাতা শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগত ভাবে না দেখে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
  3. পরামর্শদাতা পরামর্শগ্রহীতার সমস্যা নির্ণয়ে মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষার সাহায্য গ্রহণ করায়, সমস্যার সঠিক বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।
প্রত্যক্ষ পরামর্শদানের অসুবিধা

প্রত্যক্ষ পরামর্শদানের অসুবিধাগুলি হল-

  1. এখানে শিক্ষার্থী বা পরামর্শগ্রহীতা পরামর্শগ্রহণের মাধ্যমে স্ব-বিশ্লেষণ বা নতুন সমস্যা সমাধানে কোনো দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয় না।
  2. এই কৌশলে পরামর্শগ্রহীতা পরামর্শদাতার উপর অধিক নির্ভরশীল হওয়ায়, বাস্তবিক ক্ষেত্রের যেকোনো সমস্যার সমাধানে তিনি অক্ষম।
  3. পরামর্শদাতা যদি অনভিজ্ঞ হন, তবে সফলতার সম্ভাবনা থাকে খুবই কম।

 

পরোক্ষ পরামর্শদান

পরোক্ষ পরামর্শদানের অর্থ

Carl Rogers হলেন এই প্রকার কৌশলের উদ্ভাবক। এই কৌশলের উৎস হল কার্ল রজার্স-এর “Self theory”, এখানে বলা হয়েছে একজন ব্যক্তি তার জগৎ-কে নিজের মত করে প্রত্যক্ষ করে। সেহেতু এই প্রকার পদ্ধতি বা কৌশলে ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি জাগরণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। যে প্রকার পদ্ধতিতে ব্যক্তির মধ্যকার সমস্যাগুলি সরাসরি সমাধান না করে অন্তর্দৃষ্টি জাগরণের মধ্যেদিয়ে উপস্থিত বাঁধাগুলি সম্পর্কে অবহিত করে ব্যক্তিকে নিজ সমস্যার সমাধানে উৎসাহিত করার প্রক্রিয়াই হল পরোক্ষ পরামর্শদান।

পরোক্ষ পরামর্শদানের বৈশিষ্ট্য

পরোক্ষ পরামর্শদান সম্পর্কিত কিছু বৈশিষ্ট্য নিম্নে তুলে ধরা হল-

  1. পরোক্ষ পরামর্শদান প্রক্রিয়ায় একজন ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাহিদা ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তাই একে পরামর্শগ্রহীতাকেন্দ্রিক কৌশলও বলা হয়ে থাকে।
  2. ই প্রকার পদ্ধতি বা কৌশলে ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি জাগরণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সেহেতু ব্যক্তি নিজ থেকে সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হয়।
  3. এই প্রকার কৌশল বৌদ্ধিক স্তর অপেক্ষা প্রাক্ষোভিক স্তরে অধিক কার্যকরী।
পরোক্ষ পরামর্শদানের সুবিধা

পরোক্ষ পরামর্শদানের সুবিধাগুলি হল-

  1. এই প্রকার পরামর্শদান শিক্ষার্থীকে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে অভিযোজনে সহায়তা করে।
  2. প্রাক্ষোভিক প্রতিবন্ধকতাগুলি সরিয়ে, স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করতে উৎসাহ দেয়, এবং উত্তেজনাকে হ্রাস করে।
  3. বাইরের কারোর দ্বারা তাড়িত না হয়ে, নিজ থেকে সমস্যার সম্মুখীন হয়ে, সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হয়।
পরোক্ষ পরামর্শদানের অসুবিধা

পরোক্ষ পরামর্শদানের অসুবিধাগুলি হল-

  1. ব্যক্তির অনুভূতির উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করায়, ব্যক্তির বৌদ্ধিক ও জ্ঞানমূলক দিকটি অবহেলিত হয়।
  2. এই পদ্ধতিতে পরামর্শদান পরিচালনা করার জন্য পরামর্শদাতার মনস্তত্ত্বের উপর গভীর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, নচেৎ পরামর্শগ্রহীতার অনুভূতিগুলি নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্লেষণ কঠিন হয়ে পড়ে।
  3. যারা নিজে থেকে সমস্যার সমাধান করতে কিংবা নিজের দায়িত্ব গ্রহণে অক্ষম, তাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি একেবারেই ফলপ্রসূ নয়।

 

সমন্বয়ী পরামর্শদান

সমন্বয়ী পরামর্শদানের অর্থ

এই পদ্ধতির উদ্ভাবক হলেন মনোবিদ Bordin, তিনি তার তত্ত্বে E.G. Williamson-এর প্রত্যক্ষ পরামর্শদান পদ্ধতি এবং Carl Roger-এর পরোক্ষ পরামর্শদান পদ্ধতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। Eclectic কথাটির অর্থ হল দুই বা ততোধিক পদ্ধতির সমন্বয় সাধন, যার দ্বারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর কাজ সহজতর হয়। মনোবিজ্ঞানী Bordin মনে করতেন, কোন ব্যক্তির সমস্যার সমাধান যেকোনো একটি কৌশল কিংবা পদ্ধতিকে অবলম্বন করে সম্ভব নয়, পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। এটি এমন এক ধরনের পরামর্শদান যা পরামর্শদাতাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে করা যেতে পারে এবং পরামর্শদাতা পরামর্শগ্রহীতার আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কিত ভুলগুলি উপলব্ধি করতে সক্ষম করে তোলে যাতে সে নিজেই নিজের ত্রুটি দূর করে এবং নিজেকে উন্নতি করতে পারে।

সমন্বয়ী পরামর্শদানের বৈশিষ্ট্য

সমন্বয়ী পরামর্শদান সম্পর্কিত কিছু বৈশিষ্ট্য নিম্নে তুলে ধরা হল-

  1. সমন্বয়ী পরামর্শদান কৌশলে বস্তুনিষ্ঠ ও সমন্বয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
  2. এই প্রকার পদ্ধতিতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোন একটির উপর এককভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয় না।
  3. এই প্রকার পদ্ধতিতে মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষার প্রয়োগ করা হয়, সাথে সাথে আলাপআলোচনার মাধ্যমেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সমন্বয়ী পরামর্শদানের সুবিধা

সমন্বয়ী পরামর্শদানের সুবিধাগুলি হল-

  1. এই প্রকার পদ্ধতির ব্যবহারিক মান অনেক বেশি।
  2. দৈনন্দিন জীবনের নানান সমস্যা সমাধানে এই প্রকার পরামর্শদান প্রক্রিয়া বিশেষ ফলপ্রসূ।
  3. এই প্রকার পদ্ধতি ব্যক্তির মধ্যে প্রেষণার সঞ্চার করে।
সমন্বয়ী পরামর্শদানের অসুবিধা

সমন্বয়ী পরামর্শদানের অসুবিধাগুলি হল-

  1. কিছু ব্যক্তি মনে করেন, এই প্রকার পরামর্শদান কৌশল অস্পষ্ট, সুবিধাবাদী ও অগভীর।
  2. একজন পরামর্শগ্রহীতাকে কতটা স্বাধীনতা দেওয়া উচিত, তার কোন স্পষ্ট নিয়ম নেই।
  3. পরামর্শদাতা কর্তৃক সমস্যার প্রকৃতি বিচারে ভুল হলে, শেষমেশ পরামর্শগ্রহীতাকেই তার খেসারত দিতে হয়।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. দাস, কৌশিক। নির্দেশনা ও পরামর্শদানের মৌলিক নীতিসমূহ। গ্লোবাল নেট পাবলিকেশন, কলকাতা।
  2. Seligman, Linda., Reichenberg, L.W. Theories of Counselling and Psychotherapy. Pearson.
  3. ঘোষ, ড. সনৎ কুমার। শিক্ষায় সঙ্গতি-অপসঙ্গতি এবং নির্দেশনা। ক্লাসিক বুকস্।
  4. নাগ, ড. সুবীর., দত্ত, ড. গার্গী। সঙ্গতিবিধান নির্দেশনা ও পরামর্শদান। রীতা বুক এজেন্সি।
  5. মণ্ডল, ভীম চন্দ্র। শিক্ষায় নির্দেশনা ও পরামর্শের রূপরেখা। সোমা বুক এজেন্সী।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *