| |

প্রাচীন ভারতের শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে টোলের ভূমিকা | Role of Tols in ancient India

প্রাচীন ভারতের শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে টোলের ভূমিকাকে (Role of Tols in ancient India) অস্বীকার করার উপায় নেই, আজ হয়তো নানান কারণ হেতু বাংলার টোল শিক্ষা তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন এই টোল শিক্ষার কেন্দ্রগুলি বাংলার প্রাণ কেন্দ্র হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল। আজকের আর্টিকেলে বাংলার সেই টোল শিক্ষার কেন্দ্রগুলি এবং শিক্ষায় তাদের বহুবিধ ভূমিকা তুলে ধরা হল।

বাংলার টোলশিক্ষা

বৃন্দাবন ঠাকুর লিখেছেন, ষোলো শতকে নবদ্বীপের টোলগুলোতে বহুসংখ্যক পড়ুয়া ছিল। সতেরো শতকে নবদ্বীপের টোলগুলো খুব জোরেশোরে চালু হয়েছিল। ক্যালকাটা মান্থলির ১৭৯১ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় লেখা হয়েছে, নবদ্বীপের টোলগুলোর গৌরব সর্বজনবিদিত। টোলগুলোর মধ্যে তিনটি ছিল খুবই আলোচিত; নবদ্বীপ, শান্তিপুর ও গোপালপাড়ার টোল। এগুলোর ব্যয় নির্বাহের জন্য যথেষ্ট সম্পত্তি ছিল। নবদ্বীপের টোলেই প্রায় ১১০০ ছাত্র এবং ১৫০ জন অধ্যাপক রয়েছে। কিন্তু টোলগুলোর অবস্থা তখন পড়ন্ত দশায়। পত্রিকার প্রতিবেদক আরও জানাচ্ছেন যে রাজা রুদ্রের সময় ১৬৮০ সালে ছাত্রসংখ্যা ছিল চার হাজার এবং অধ্যাপকের সংখ্যা ছিল ছয় শ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বহু দূরদেশ থেকে নদীয়াতে ছাত্রসমাবেশ হয় এবং ছাত্রমণ্ডলীর অধিকাংশই প্রৌঢ়। কারণ তাঁরা বহুকাল অন্যত্র দর্শন অধ্যয়ন করার পর নবদ্বীপের ন্যায়দর্শন পাঠ করার যোগ্যতা অর্জন করেন।

যারা সাহিত্যচর্চার জন্য নবদ্বীপের টোলে আসে, তারা প্রত্যেকেই টোলের বৃত্তি লাভ করে। তারা যেসব গ্রন্থ পাঠ করে, তা কণ্ঠস্থ করে ফেলতে হয়। যখন দুজন অধ্যাপক দর্শন নিয়ে কোনো একটা মত নিয়ে তর্ক করেন, ছাত্রছাত্রীদের তা শোনার অধিকার থাকে। যদি কারও কাছে অধ্যাপকদের আলোচনা ও তর্ক দুরূহ বা জাটিল মনে হয়, তাহলে সেই ছাত্র দরকারমতো প্রশ্ন করে বিষয়টি বুঝে নেওয়ার অধিকার রাখে। বিদ্যাদান করে অর্থগ্রহণ ওই সব অধ্যাপক পাপ মনে করেন। নবদ্বীপের টোলে সাধারণত স্মৃতি ও ন্যায়শাস্ত্র পড়ানো হয়ে থাকে। এ বিষয়ে নদীয়ার খ্যাতি ভারতব্যাপী। ভারতের সর্বস্থান থেকেই এখানে ছাত্ররা অধ্যয়ন করতে আসে। স্মৃতির টোলে সাধারণত আট বছর পড়তে হয়, ন্যায়ের টোলে দশ বছরের কম নয়। টোলগুলো মাসে ১০ দিন করে বন্ধ থাকে। প্রতিপদ, অষ্টমী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী, পৌর্ণমাসী, শুক্ল ও কৃষ্ণ পক্ষের দুই তিথিতে টোল বন্ধ রাখা হয়। এ ছাড়া সরস্বতী পূজায় দুই সপ্তাহ এবং অন্যান্য পর্ব উপলক্ষে ছাত্ররা ছুটি পায়। ন্যায়ের টোলের ছাত্ররা আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত ছুটি ভোগ করে, স্মৃতির টোলের ছাত্ররা ভাদ্র থেকে কার্তিক পর্যন্ত। নবদ্বীপের টোলের পাঠ শেষ করতে পারলে সে পণ্ডিত ভারতের সমস্ত বিদ্যাকেন্দ্রে সম্মানিত হয়। ন্যায়ই নবদ্বীপের টোলগুলোর প্রধান দিক ছিল। বাংলার টোলগুলোর এই ন্যায়শাস্ত্র বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধরা স্মৃতি-শ্রুতি স্বীকার করে না। সুতরাং তর্কবুদ্ধি তাদের প্রধান অবলম্বন। স্বয়ং বুদ্ধ তাদের শিষ্যদের বলেছিলেন, ‘পণ্ডিতেরা যেভাবে সোনাকে আগুনে পুড়িয়ে নিকষ পাথরে পরীক্ষা করে থাকে—হে ভিক্ষুগণ, তোমরা আমার কথাগুলোকে সেভাবে পরীক্ষা করে গ্রহণ করবে। কেবল আমার গৌরব রক্ষার জন্য তা গ্রহণ করবে না। যার অর্থ দাঁড়ায় বুদ্ধ তার শিষ্যদের অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু স্মৃতির বিধান অন্ধভাবেই পালনীয় ছিল। তা সত্ত্বেও ইতিহাসের সেই আদিপর্বে হিন্দু দার্শনিকেরা তর্কবিতর্ক দ্বারা সত্য নিরূপণ করার চেষ্টা করতেন। নবীন যুবক নিমাই পণ্ডিত (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু) অল্প বয়সে নবদ্বীপেই পাঠ শেষ করে ব্যাকরণের টোল খুলে শব্দ ও অলংকারশাস্ত্রে প্রতিভার পরিচয় দেন। মুকুন্দ সঞ্জয়ের বাড়িতে বড় চণ্ডীমণ্ডপে অনেকের এক সঙ্গে বসে পড়ার ব্যবস্থা ছিল। সেই চণ্ডীমণ্ডপে টোল খুলে নিমাই রীতিমতো অধ্যাপনা করতেন। সকাল থেকে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত টোলে পাঠনা তারপর স্নান-আহার। বিকেলে আবার ভ্রমণের সময় গঙ্গাতীরে শিষ্যসঙ্গে মণ্ডলী করে বসে পাঠাদির আলোচনা-এভাবেই দিবা অতিবাহিত হতো। নদীয়াতে এ ধরনের বহু টোলের কথা জানা যায়। নদীয়ার এক প্রান্তে খালপাড়ে বিদ্যানগর পল্লি স্থাপিত হয়েছিল।

মধ্যযুগে বাংলায় সংস্কৃত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো টোল নামেই পরিচিত ছিল। উত্তর ভারতে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সাধারণত চতুষ্পাঠী বলা হতো। সত্যিকারভাবে সংস্কৃত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে টোল আর চতুষ্পাঠীর মধ্যেও কিছু প্রভেদ ছিল। চতুষ্পাঠী কথার অর্থ চারবেদ পাঠের প্রতিষ্ঠান, যদিও অন্য শাস্ত্র পাঠের সুযোগও থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে, উত্তর ভারতের সংস্কৃত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চতুষ্পাঠীতে বেদবিদ্যা অধ্যয়ন আবশ্যিক হলেও বাংলার টোলে বেদ পাঠের তেমন প্রচলন ছিল না। আসলে বাংলায় বেদচর্চা তেমন বিস্তার লাভ করেনি কখনো। বাংলায় সাধারণত তিন ধরনের টোল ছিল। কিন্তু টোলে প্রধানত ব্যাকরণ, সেই সঙ্গে সাহিত্য, অলংকার ও কখনো পৌরাণিক কাব্য পড়ানো হতো। দ্বিতীয় ধরনের টোলে প্রধানত স্মৃতি এবং সেই সঙ্গে কখনো পৌরাণিক কাব্য পড়ানো হতো। আর তৃতীয় ধারার টোলে ন্যায়শাস্ত্রই ছিল প্রধান পাঠ্য বিষয়।

সাধারণত কোনো বিশেষ টোলে কোনো একটি বিষয়েই উচ্চতর শিক্ষা দেওয়া হতো। কিন্তু প্রায় সব টোলেই ব্যাকরণ ও অলংকার পড়ানো হতো। হয়তো টোলের বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের পরিবর্তে কোনো প্রবীণ ছাত্র এসব বিষয়ে পাঠ দিতেন। আবার ব্যাকরণ, অলংকার বা কাব্য-সাহিত্যেও উচ্চতর বিশেষজ্ঞ শিক্ষার প্রচলন ছিল। এসব বিষয়ে বিশেষ শিক্ষাপ্রাপ্তরা সাধারণত ব্যাকরণতীর্থ, কাব্যতীর্থ বা কাব্যরত্ন উপাধি লাভ করতেন। যাঁরা ন্যায়শাস্ত্র বা স্মৃতিশাস্ত্রে অথবা উভয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষালাভ করতেন, তাঁরা ন্যায়তীর্থ বা স্মৃতিতীর্থ অথবা উভয় উপাধিই লাভ করতেন। একই বিষয়ে বিভিন্ন শিক্ষক ভিন্ন উপাধিও প্রদান করতেন। যেমন: স্মৃতিরত্ন, কাব্যরত্ন, ন্যায়রত্ন, ন্যায়বাগীশ বা তর্করত্ন প্রভৃতি। খুব কম ক্ষেত্রেই একজন শিক্ষার্থী পাঁচ বা সাতটি বিষয়ে উচ্চতর বিশেষজ্ঞ শিক্ষা পেতেন। এসব ছাত্র পঞ্চতীর্ণ বা সপ্ততীর্থ উপাধিতে ভূষিত হতেন। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে সাধারণত একাধিক শিক্ষকের কাছে বিভিন্ন টোলে শিক্ষালাভ করতে হতো। সংখ্যা কম হলেও যাঁরা বেদ বা বেদান্তে বিশেষজ্ঞ শিক্ষালাভ করতেন, তাঁরা বেদান্ততীর্য উপাধি পেতেন।

ছাত্ররা প্রয়োজনানুসারে যথেষ্ট ব্যাকরণের শিক্ষা পেলে তবেই অন্য বিষয়সমূহ যেমন: কাব্য, স্মৃতি বা দর্শনের পাঠ শুরু করতেন এবং সেই সঙ্গে ব্যাকরণের অনধীত অংশের পাঠ চালিয়ে যেতেন। যেসব ছাত্র স্মৃতি ও ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করতেন, তাঁরা এক বা একাধিক টোলে হয়, আর্ট, এমনকি দশ বছর পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন। টোলের পাঠাভ্যাস প্রধানত বাচনিক ধারায়ই চলত—এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যদিও পুঁথির ব্যবহারও চালু ছিল পাশাপাশি। টোলের শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় উচ্চস্বরে পাঠ ও শোনার গুরুত্বই ছিল সবচেয়ে বেশি। লক্ষণীয় যে প্রধানত মুখস্থ বা কণ্ঠস্থ করার দ্বারা বাংলার টোলের শিক্ষাপ্রক্রিয়া নির্বাহিত হলেও এই ব্যবস্থা অনেক সৃজনশীল প্রাজ্ঞপণ্ডিতের জন্ম দিয়েছে। বাংলায় বিভিন্ন ধরনের ও বিশেষ বিষয়ের উচ্চশিক্ষার টোল ছিল। সাধারণত ব্রাহ্মণ বসতিপূর্ণ গ্রামেই এসব টোল অবস্থিত ছিল। কারণ, শিক্ষক ও ছাত্রদের বিপুলাংশই ব্রাহ্মণ পরিবারভুক্ত হতেন। বাংলায় পুঁথির ব্যবহার বৃদ্ধিতেও টোলের শিক্ষক ও ছাত্রদের অবদান যথেষ্ট। অনেক শিক্ষকই পুঁথি রচনা করতেন। মনে রাখতে হবে, পুঁথি রচনার কাজও শিক্ষাদানের মর্যাদা পেত। পুঁথি নকল করা উপার্জনের একটি উপায় ছিল।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. https://www.wbnsou.ac.in/online
  2. Das, Koushik. kd’s e-pathsala.
  3. https://byjus.com/

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *