যোগাযোগের প্রক্রিয়া এবং কার্যকর যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা | Process and Barriers of Effective Communication

যোগাযোগের প্রক্রিয়া এবং কার্যকর যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা (Process and Barriers of Effective Communication) এই আর্টিকেল-এর মূল আলোচ্য বিষয়। যোগাযোগ হল পারস্পরিক সহমত-এর ভিত্তিতে একে অন্যের সাথে ধারণা এবং অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া। কিন্তু এই যোগাযোগ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মধ্যেদিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে, আবার বহুসময়ে এই যোগাযোগ স্থাপনে নানান প্রতিবন্ধকতাও লক্ষ্য করা যায়। এই দুটি বিষয় সম্বন্ধে নিম্নে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল-
যোগাযোগের প্রক্রিয়া (Process of Communication)
যোগাযোগ হল তথ্য, সংবাদ, নির্দেশ ইত্যাদির আদান-প্রদানের এক প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়া কিছু উপাদানের মধ্যেদিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। যোগাযোগ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলি হল-
প্রসঙ্গ (Context)
যে বিষয় নিয়ে যোগাযোগ হতে চলেছে অর্থাৎ, যোগাযোগের বিষয়। এক্ষেত্রে তা যেকোনো কিছু হতে পারে, যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাজারদর, রাজনীতি ইত্যাদি।
উৎস বা প্রেরক (Source or Sender)
উৎস বা প্রেরক বা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি কথোপকথন শুরু করেন। অর্থাৎ, উৎস বা প্রেরক মৌখিক কিংবা অমৌখিক সংকেত অন্য ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করেন এবং অন্য ব্যক্তি তাতে সাড়া দেন।
সংকেত যুক্ত করণ (Encoding)
একজন উৎস বা প্রেরক সংকেত যুক্ত করণের মধ্যেদিয়ে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সূত্রপাত করেন। এক্ষেত্রে তিনি কিছু শব্দ বা অমৌখিক পদ্ধতি, যেমন- প্রতীক, চিহ্ন, শরীরের অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদির ব্যবহার করে তথ্যকে একটি বার্তায় রূপদান করেন।
বার্তা (Message)
বার্তা হল উৎস কর্তৃক প্রেরিত কিছু মৌখিক এবং অমৌখিক সংকেত যা শব্দ, বাক্য, চিত্র, অঙ্গভঙ্গি, নড়াচড়া, চোখের ইশারা, নীরবতা, দীর্ঘশ্বাস ইত্যাদি যেকোনো কিছুই হতে পারে।
প্রতীক (Symbol)
প্রেরিত বার্তার গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে প্রেরক এমন কিছু সংকেত ব্যবহার করেন যেগুলি প্রেরক এবং গ্রাহক উভয়ই কেবলমাত্র বুঝতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে সংকেতগুলি লিখিত বা মৌখিক উভয়ই হতে পারে।
মাধ্যম (Channel)
মাধ্যম হল এমন একটি উপায়, যার মাধ্যমে প্রেরক যেকোনো তথ্যকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে চান। এক্ষেত্রে প্রেরক সেই মাধ্যমটিকে বেছে নেয় যার মাধ্যমে সে তার বার্তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। তবে বার্তাটিকে কার্যকর করতে এবং গ্রাহকের দ্বারা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি অবশ্যই সাবধানতার সাথে নির্বাচন করা উচিত।
সংকেত মুক্ত করণ (Decoding)
এখানে, গ্রাহক প্রেরকের বার্তাটি ব্যাখ্যা করেন এবং সম্ভাব্য সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সেটিকে বোঝার চেষ্টা করে। অর্থাৎ, বার্তাটি যে সংকেত বহন করছিল তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা বা তাৎপর্য গ্রাহক বুঝতে সক্ষম হন।
গ্রাহক (Receiver)
গ্রাহক হল সেই ব্যক্তি যার উদ্দেশ্যে বার্তা প্রেরণ করা হয়েছে। একজন গ্রাহক তার উদ্দেশ্যে প্রেরিত বার্তাটিকে সর্বোত্তম উপায়ে বোঝার বা তাৎপর্য নির্ণয়ের চেষ্টা করেন।
প্রতিক্রিয়া (Feedback)
প্রতিক্রিয়া হল যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সেই চূড়ান্ত ধাপ যা নিশ্চিত করে যে গ্রাহক বার্তাটি পেয়েছেন এবং প্রেরকের উদ্দেশ্য পূরণে সেটির যথার্থ ব্যাখ্যা নির্ণয়ে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ, এর সাহায্যে যোগাযোগের কার্যকারিতা বিচার করা যায়।
কোলাহল বা গোলমাল (Noise)
প্রেরক কর্তৃক প্রেরিত বার্তায় কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি হলে কিংবা প্রেরিত বার্তাটিকে বিকৃত করা হলে তাকে গোলমাল বলে। গোলমাল বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ উভয়ভাবেই যোগাযোগে বাধার সৃষ্টি করতে পারে।
উপরি আলোচিত উপাদানগুলির মধ্যেদিয়ে যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে। কীভাবে এই উপাদানগুলির মধ্যেদিয়ে যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে তা নিম্নে একটি চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হল-

চিত্র : যোগাযোগের প্রক্রিয়া
কার্যকর যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা (Barriers of Effective Communication)
আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ ব্যর্থ হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় প্রেরকের উদ্দেশ্য যদি সঠিকভাবে বার্তায় ব্যবহৃত না হয় তবে সেক্ষেত্রে গ্রাহক তার সেই বার্তাটি সঠিকভাবে বুঝতে কিংবা তার তাৎপর্য অনুধাবনে অক্ষম হতে পারেন। কিংবা, গ্রাহকের বার্তা সংগঠনের অক্ষমতা কিংবা যেনে বুঝে বার্তাকে বিকৃত করার মনোভাব কার্যকর যোগাযোগে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে যেসকল প্রতিবন্ধকতা পরিলক্ষিত হয়, তা সম্বন্ধে নিম্নে আলোচনা করা হল-
কার্যকর যোগাযোগের কিছু সাধারণ বাধাগুলির মধ্যে রয়েছে :
- জার্গনের (Jargon) ব্যবহার। অতি-জটিল বা অপরিচিত পদ।
- মানসিক বাধা এবং ট্যাবুস।
- মনোযোগের অভাব, আগ্রহ, বিভ্রান্তি বা গ্রাহকের প্রতি অপ্রাসঙ্গিকতা।
- উপলব্ধি এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য।
- প্রত্যাশা এবং কুসংস্কার যা মিথ্যা অনুমান বা স্টেরিওটাইপিং হতে পারে। লোকেরা প্রায়শই প্রকৃতপক্ষে প্রেরক যা বলতে চান, তার চেয়ে তারা যা শুনতে আশা করে তা শুনে এবং ভুল সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্যে ধাবিত হয়।
- সাংস্কৃতিক পার্থক্য, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, নিয়ম বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়, বা আবেগের দ্বারা তার প্রকাশ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো স্থানীয় গোষ্ঠীর ধারণা বা চিন্তাভাবনা, সমাজের মূল স্রোতের নিরিখে ভিন্ন হতে পারে।
এক্ষেত্রে, একজন দক্ষ যোগাযোগকারীকে অবশ্যই এই বাধাগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং ক্রমাগত সমাজ-সংস্কৃতির নিরিখে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং বোঝাপড়ায় মধ্যেদিয়ে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দানের মাধ্যমে এর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- চেল, মদনমোহন., নাগ, শর্মিলা। প্রাসঙ্গিক শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান। প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা।
- সেন, মলয় কুমার। শিক্ষা প্রযুক্তিবিজ্ঞান। সোমা বুক এজেন্সী, কলকাতা।


