শিক্ষার উপাদানসমূহ | Factors of Education

শিক্ষা-প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মূলত চারটি উপাদান (Factors of Education) বর্তমান। যে উপাদানগুলির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় শিক্ষা-প্রক্রিয়া সম্পূর্ণতা লাভ করে।
শিক্ষা হল একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যা পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। কিন্তু, এই “শিক্ষা-প্রক্রিয়া” কতগুলি উপাদানের সমন্বয়ে রচিত হয়ে থাকে, যার একটির অনুপস্থিতিতে সম্পূর্ণ শিক্ষা-প্রক্রিয়া অচল হয়ে যেতে পারে। আধুনিক শিক্ষাবিদগণ মনে করেন, শিক্ষা-প্রক্রিয়া কতগুলি মৌলিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল এবং এই উপাদানসমূহের সক্রিয়তার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার রূপভেদ ঘটে থাকে।
শিক্ষার উপাদানসমূহ (Factors of Education)
শিক্ষা প্রক্রিয়া চারটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত, যথা- শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পাঠক্রম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নিম্নে এগুলি সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হল-
শিক্ষার্থী (Student)
শিক্ষার্থী কে? এই প্রশ্ন সর্বপ্রথমেই আসে। শিক্ষার্থী হল যে শিক্ষাগ্রহণ করতে আসে। শিক্ষার্থী হল এক জৈব মানবীয় সত্তা। শিক্ষার্থীকে ভিত্তি করেই শিক্ষার সূত্রপাত কারণ শিক্ষার্থী ছাড়া শিক্ষার অন্যান্য উপাদানগুলি কল্পনা করা যায় না। প্রাচীনকালে শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞান সঞ্চালন করার প্রক্রিয়াই হল শিক্ষা আর আধুনিককালে শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত গুণাবলীর বিকাশ ঘটানোর প্রক্রিয়াই হল শিক্ষা। শিক্ষার্থীর বুদ্ধি, আগ্রহ, প্রেষণা, অনুরাগ, প্রক্ষোভ, সৃজন ক্ষমতা ইত্যাদির বিকাশ যাতে সর্বাত্মক হয় সেই প্রচেষ্টাই বর্তমান শিক্ষায় করতে হবে। শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত তার আচার-আচরণ, সক্রিয়তা, বিচারবুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির দ্বারা শিক্ষালাভ করার চেষ্টা বজায় রাখে।
শিক্ষক (Teacher)
পিতা মাতাকে বলা হয় শিশুর প্রথম অভিভাবক এবং শিক্ষককে বলা হয় দ্বিতীয় অভিভাবক। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক বা গুরুর স্থান অনেক উচ্চে ছিল। সেই সময় শিক্ষকের ভূমিকাও ছিল বর্তমান সময়ের থেকে অনেক বেশি পৃথক। শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার্থীর জীবনের গতিপথ ও লক্ষ্য কখনও সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয় কারণ শিক্ষা কখনও শিক্ষককে ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না। শিক্ষক জানেন কাকে পড়াব (Whom to Teach), কি পড়াব (What to Teach), কখন পড়াব (When to Teach), কিভাবে পড়াব (How to Teach) ইত্যাদি।
পাঠক্রম (Curriculum)
শিক্ষা প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল পাঠক্রম। পাঠক্রমের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Curriculum’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ “Currere” থেকে যার আক্ষরিক অর্থ হল- ‘Course to be run for reaching a certain goal’, অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য দৌড়ের পথ। পাঠক্রম হল পূর্ব-পরিকল্পনা, শিখন অভিজ্ঞতা এবং জীবন উপযোগী জ্ঞানের এক প্রকার সমন্বিত রূপ, যা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এবং বাইরে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়ে থাকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (Educational Institution)
শিক্ষার অপর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল জড় উপাদান ও মানবিক উপাদানের এক সমন্বয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জড় উপাদান হল- আসবাবপত্র, কক্ষ, পানীয় জলের ব্যবস্থা, লাইব্রেরি, ক্যান্টিন, শিক্ষা সহায়ক উপকরণ ইত্যাদি। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানবীয় উপাদান হল- শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অ-শিক্ষক কর্মচারী ইত্যাদি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সমাজের প্রয়োজনে যাতে সমাজে ব্যক্তির জীবনকে সুসংগঠিত করতে পারে এবং প্রত্যক্ষভাবে ও পরোক্ষভাবে সমাজও সুসংগঠিত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল এমন একটি মাধ্যম যার দ্বারা শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া যায় বহুলাংশে।
শিক্ষার উপাদানসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক
প্রথমত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই শিক্ষার মানবীয় সত্তা। শিক্ষাক্ষেত্রে এই দুই মানবীয় সত্তা সহ-অবস্থান করে। একজনের কাজ হল অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যজনকে প্রভাবিত করা। শিক্ষার্থীরা যেমন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা, জীবনাদর্শ ও প্রশিক্ষণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তেমনি শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের মানবপ্রকৃতি অনুশীলন করে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বৃদ্ধি করেন। তাই শিক্ষা-প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন হওয়ার একটি প্রধান শর্ত হল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক ক্রিয়াশীলতার সম্পর্ক। তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শিক্ষার গতি নির্ধারণ করে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থী তার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। যেসব অভিজ্ঞতা গ্রহণ করবে সেগুলি তার চাহিদা পরিতৃপ্তিতে সহায়তা করবে। তাই পাঠক্রমকে আংশিকভাবে হলেও শিক্ষার্থীর চাহিদা পরিতৃপ্ত করতে হয়। এদিক থেকে বিচার করলে বলা যায় পাঠক্রমের পরিবর্তনশীলতা নির্ভর করে শিক্ষার্থীর মনোপ্রকৃতি ও চাহিদার পরিবর্তনের ওপর। অপরদিকে, পাঠক্রমের অন্তর্গত অভিজ্ঞতাগুলি শিশু বা শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাকে আলোড়িত করে। নতুন অভিজ্ঞতার আঘাতের ফলে শিক্ষার্থী তার অভিজ্ঞতার পুনর্বিন্যাস ঘটায় এবং তার প্রভাব উন্নততর জ্ঞান সংগ্রহের উপযোগী হয়ে ওঠে। সুতরাং, এক্ষেত্রে দেখা যায় যে, শিক্ষার্থী ও পাঠক্রমের মধ্যে সম্পর্ক হচ্ছে পারস্পরিক ক্রিয়াশীলতা।
তৃতীয়ত, আধুনিক অর্থে পাঠক্রম পরিবর্তনশীল। সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাহিদার ভিত্তিতে আরও পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়। শিক্ষকের কাজ হল পারিপার্শ্বিক এই চাহিদাগুলো যথাযথভাবে অনুধাবন করা এবং সেই অনুযায়ী পাঠক্রমের মধ্যে পরিবর্তন আনা। এর মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারে সজীব সত্তা। শিক্ষার ক্ষেত্রে সেই সজীব সত্তা হলেন শিক্ষক। শিক্ষক নিজের বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করে পাঠক্রম নির্ধারণ করেন। তাই পাঠক্রমের পরিপূর্ণ সংগঠন শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ এবং মনোভাব দ্বারা নির্ধারিত হয়। পাঠক্রম একবার নির্ধারিত হলে শিক্ষকের কাজের সীমা নির্ধারিত হয়। শিক্ষক নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হন। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষককে কী কী দায়িত্ব পালন করতে হবে, শিক্ষার্থীকে কী ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে, কী ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এই সব কিছু পাঠক্রম স্থির করে দিচ্ছে।
চতুর্থত, শিক্ষার তিনটি মূল উপাদান শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পাঠক্রম পারস্পরিক ক্রিয়াশীল সম্পর্কে আবদ্ধ। তাদের এই পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষা-প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। যে পরিবেশে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাঠক্রম বর্তমান সেই পরিবেশেই এই ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষা সংঘটিত হতে পারে। শিক্ষালয় এই পরিবেশ প্রদান করে। শিক্ষার অন্যান্য উপাদানগুলির পারস্পরিক সম্পর্ককে শিক্ষালয় একটি আবেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ রাখে।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- Ravi, S. Samuel. A Comprehensive Study of Education. PHI Learning Private Limited, Delhi.
- পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
- ঘোড়াই, নিমাই চাঁদ। শিক্ষাদর্শন ও সামাজিক শিক্ষা। সাঁতরা পাবলিকেশন প্রা. লি., কলকাতা।
- চট্টোপাধ্যায়, মিহির কুমার., চক্রবর্তী, প্রণব কুমার এবং ব্যানার্জী, দেবশ্রী। শিক্ষা প্রসঙ্গ। রীতা বুক এজেন্সি, কলকাতা।
- ব্যানার্জী, কে। শিক্ষাবিজ্ঞান। বাণী প্রকাশন, কলকাতা।






