| |

ভাববাদী দর্শন ও শিক্ষা | Meaning and Importance of Idealism

ভাববাদী দর্শন শিক্ষা (Idealist Philosophy and Education)-র ধারণাকে নানা যুগে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে এবং এদের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক আধুনিক শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন পথের সন্ধান দেয়। ভাববাদের অর্থ ও গুরুত্ব (Meaning and Importance of Idealism) আধুনিক শিক্ষার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পাশ্চাত্য সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সবথেকে প্রাচীনতম এবং প্রভাবশালী দর্শন হল ভাববাদ (Idealism)। ‘Man has two facts—spiritual and material. When the emphasis is on the realization of spiritual life, it is called idealism.’

 

ভাববাদী দর্শনের স্বরূপ

প্রাচীনতম দার্শনিক মতবাদ হিসেবে ভাববাদের পরিচিতি রয়েছে। ভাববাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল ‘Idealism’। ভাববাদ (Idealism) হল- “Idea” (আদর্শ, ধারণা, ভাব) এবং “Ism” (তত্ত্ব), যেখানে “L” শব্দটির অনুপ্রবেশ ঘটেছে শব্দটিকে কেবলমাত্র শ্রুতিমধুর করার জন্য। সুতরাং, ‘Idealism’ শব্দটির অর্থ হল মানবজীবনের আদর্শ, ধারণা এবং ভাবের তত্ত্ব। ভাববাদের উৎপত্তি ঘটেছে প্লেটো-র অধিবিদ্যার (Metaphysical Doctrine) মতবাদ থেকে। ভাববাদের মূল বক্তব্য- মন বা চেতনার উপর নির্ভরশীল।

 

ভাববাদী শিক্ষা দার্শনিক

এই মতবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলেন- প্লেটো, সক্রেটিস, কমেনিয়াস, কান্ট, বার্কলে, ফিকটে, হেগেল  প্রমুখের নাম করা যায়। এছাড়াও, পেস্তালজি, ফ্রয়েবেল, স্পিনোজা, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজী, গুরু নানক, দয়ানন্দ সরস্বতী, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দ প্রমুখ ভাববাদী দার্শনিক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছেন। এই সকল দার্শনিকগণ ভাববাদী চিন্তাভাবনাকে শিক্ষাক্ষেত্রে সফল প্রয়োগে সচেষ্ট হয়েছেন।

 

ভাববাদের সংজ্ঞা

বিশিষ্ট দার্শনিক এবং চিন্তাবিদগণ ভাববাদের সংজ্ঞাকে নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন, যা নিম্নে আলোচনার মধ্যেদিয়ে ভাববাদের প্রকৃত অর্থ সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

জে.এস. রস (J.S. Ross)-বলেছেন, “Idealistic philosophy takes many and varied forms, but the postulate underlying all this is that mind or spirit is the essential world stuff, that the true reality is of a mental character.” অর্থাৎ, ভাববাদী দর্শন বহু বিচিত্র রূপ ধারণ করে, কিন্তু এর সবকিছুর মূলে যে মূলনীতিটি রয়েছে তা হল, মন বা আত্মাই হল জগতের অপরিহার্য উপাদান, এবং যা মানসিক প্রকৃতির প্রকৃত বাস্তবতা।

ডি.এম. দত্ত (D.M. Dutta)-বলেছেন, “Idealism holds that ultimate reality is spiritualism.” অর্থাৎ, ভাববাদ অনুসারে, চূড়ান্ত বাস্তবতাই হল আধ্যাত্মিকতা।

 

ভাববাদী দর্শনের ধরন বা রূপ

ভাববাদী দর্শনের যে সকল ধরন বা রূপ পরিলক্ষিত হয়, তা নিম্নে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হল-

ভাববাদী দর্শনের ধরনপ্রবর্তকমূল বক্তব্য
আত্মগত ভাববাদ (Subjective Idealism)বার্কলে (Berkley)ভাববাদের এই ধারা মনের অস্তিত্ব-কে স্বীকার করেছে। এই দার্শনিক মতবাদ অনুযায়ী, বস্তুর অস্তিত্ব আমাদের মনের উপর নির্ভরশীল।
পরমাত্মগত ভাববাদ (Absolute Idealism)ফিকটে (Fichte) এবং হেগেল (Hegel)এই দার্শনিক মতবাদ অনুযায়ী, পরম সত্য বা চূড়ান্ত বাস্তবতা বস্তুগত জগত নয়, বরং আত্মাই হল প্রকৃত বা পরম সত্য।
বস্তুগত ভাববাদ (Objective Idealism)প্লেটো (Plato)ভাববাদের এই ধারায় মনে করা হয়, বস্তু বা জগত কেবল মানুষের চেতনার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং মানুষের চেতনার আগেও স্বতন্ত্রভাবে একটি পরম সত্য বিদ্যমান।
বিস্ময়কর ভাববাদ (Phenomenal Idealism)কান্ট (Kant)ভাববাদের এই ধারায় মনে করা হয়, বাস্তবতার মূল ভিত্তি কোনো বস্তু বা জড় পদার্থ নয়, বরং তা মানসিক ধারণা, চেতনা এবং আত্মার উপর নির্ভরশীল।

 

ভাববাদের মূলসূত্র বা নীতি

দার্শনিকদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ভাববাদের মূলসূত্র, নীতি, বক্তব্য বা বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

  1. প্রকৃত বাস্তবতা বা সত্তা হল আধ্যাত্মিকতা।
  2. আমাদের সার্বজনীন মনের অংশ নয়, এমন বিষয়ের অস্তিত্ব নেই।
  3. এই বিশ্বে মন যাকে বা যা কিছুকে মেনে নেয় ও তৈরি করে নেয় তাই হল সত্য।
  4. যে সমস্ত মূল্যবোধ, যে গুলিকে স্পর্শ দ্বারা অনুভব করা যায় না তা হল প্রকৃতপক্ষে চিরন্তন বা শাশ্বত সত্য।

 

শিক্ষায় ভাববাদী দর্শনের প্রভাব

ভাববাদী দর্শন শিক্ষার তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় দিকেই প্রভাব বিস্তার করেছে। শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম, শিক্ষা-পদ্ধতি, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষক সম্পর্কে এই দর্শনের বক্তব্যগুলি হল-

ভাববাদ ও শিক্ষার লক্ষ্য

ভাববাদী দর্শন অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্য হবে শিশুর আত্মোৎকর্ষণের মধ্যদিয়ে আত্ম উন্মেষণ। জীবনের সুমহান আদর্শ নির্ণয়ে ভাববাদের অপরিসীম প্রভাব রয়েছে। ভাববাদী দার্শনিকরা মনে করেন-মানুষের ব্যক্তিত্বের মহিমান্বয়নের (Exaltation of Personality) মাধ্যমে আত্মোপলব্ধি বা Self-realization-ই হল শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষা তাই ব্যক্তিকে তার নিজস্ব পরিপূর্ণতার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে তুলবে।

ভাববাদ ও শিক্ষার পাঠক্রম

ভাববাদী দর্শন যেহেতু ভাব, আদর্শ বা চিরন্তন সত্যের অভিমুখে শিক্ষাকে পরিচালনা করতে চায়, তাই তাঁরা তাদের পাঠক্রমে ভাব ও আদর্শের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের নির্দেশিত পাঠক্রমে তিনটি কাম্য বস্তুকে লাভ করার চেষ্টা রয়েছে। এই তিনটি কাম্য বস্তু হল– বুদ্ধির বিকাশ, সৌন্দর্যানুভূতি এবং চেতনার উন্মেষণ। এই তিনটি দিকের বিকাশ সাধনে পাঠক্রমে যে সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা হল-

    1. বৌদ্ধিক (Intellectual)- ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত ও ভূগোল প্রভৃতি।
    2. নান্দনিক (Aesthetic)- কারু ও চারুকলা, কবিতা, সংগীত, অঙ্কন প্রভৃতি।
    3. নৈতিক (Moral)- ধর্ম, নীতি, দর্শনশাস্ত্র প্রভৃতি।
ভাববাদ ও শিক্ষাপদ্ধতি

শিক্ষাপদ্ধতির ক্ষেত্রে ভাববাদী দার্শনিকগণ সেভাবে কিছু বলেননি। শিক্ষার লক্ষ্য নির্ণয়ে যেমন তাঁরা অনেক উচ্চ আদর্শের কথা বলেছেন, তেমন তাদের বাস্তবায়ন সম্পর্কে ছিলেন নীরব। তবে ভাববাদী দার্শনিকরা ব্যক্তিগত ভাবে শিক্ষাপদ্ধতির ক্ষেত্রে কিছু অবদান রেখে গেছেন। পেস্তালজি নীতি ও ধর্মশিক্ষার উপরে আত্মসক্রিয়তা এবং অপরপক্ষে, ফ্রয়েবেল খেলা, উপহার ও কর্মকে অবলম্বন করে আত্ম-উন্মেষণের পথে আত্ম-সক্রিয়তার নীতিকে গ্রহণ করেছেন।

ভাববাদ ও শৃঙ্খলা

ভাববাদী দার্শনিকরা অবাধ, শৃঙ্খলার পক্ষপাতী নন। তাঁরা মনে করেন, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আত্মোপলব্ধি সম্ভব। তাই কঠোর নীতি-নিষ্ঠা ও নিয়মানুবর্তিতার শৃঙ্খলে শিক্ষার্থীকে তাঁরা বাঁধতে চান। অনেক ভাববাদী আবার আত্ম-নিগ্রহের মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা বলেছেন।

ভাববাদ ও শিক্ষক

ভাববাদী দার্শনিকদের মতে, সার্থক শিক্ষক হবেন তিনি, যাঁর আত্মোপলব্ধি পূর্ণ হয়েছে। তিনি হবেন আদর্শপরায়ণ, চরিত্রবান এবং উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ করবেন। সমুন্নত ভাবাদর্শকে সামনে রেখে তিনি শিক্ষার্থীদের পরিচালক, বন্ধু ও পথপ্রদর্শকের কাজ করে যাবেন।

 

ভাববাদী দর্শনের অবদান

শিক্ষাক্ষেত্রে ভাববাদের অবদান হল নিম্নরূপ-

  1. শিক্ষার লক্ষ্যের ক্ষেত্রে ভাববাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এটিই একমাত্র দর্শন যেখানে শিক্ষার লক্ষ্যের ক্ষেত্রে বিস্তারিত ব্যাখ্যার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
  2. ভাববাদী শিক্ষা সর্বোচ্চ মূল্যবোধ, যেমন- সত্য, সৌন্দর্য এবং মঙ্গলের বিকাশের উপর জোর দেয়। এটি শিশুর নৈতিক চরিত্রের বিকাশে সহায়তা করে।
  3. ভাববাদী শিক্ষা প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব প্রচেষ্টার মাধ্যমে আত্মোপলব্ধির বিকাশে সহায়ক। তাই এটি সার্বজনীন শিক্ষাকে উৎসাহিত করে।

 

ভাববাদী দর্শনের সীমাবদ্ধতা

শিক্ষাক্ষেত্রে ভাববাদী দর্শনের যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি তার সাথে বেশকিছু ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাও পরিলক্ষিত হয়। যথা-

  1. ভাববাদ জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। এটি দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে চলে। শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যা ব্যক্তিকে সময়ে সময়ে উদ্ভূত সমস্যাগুলো সমাধানে সমর্থ করে।
  2. ভাববাদ শাশ্বত মূল্যবোধ অর্থাৎ সত্য, সৌন্দর্য এবং মঙ্গলের বিকাশের উপর জোর দেয়। এই মূল্যবোধগুলো পরম নয়। এগুলো সমাজের অবস্থা এবং ব্যক্তির চাহিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়।
  3. ভাববাদী শিক্ষা শিশুর তুলনায় শিক্ষককে বেশি গুরুত্ব দেয়। যেখানে আধুনিক মনোবিজ্ঞান শিশুকেন্দ্রিকতার নীতিতে বিশ্বাসী।

উপরোক্ত নানান ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, ভাববাদী দার্শনিকগণ শিক্ষাকে সর্বাঙ্গ সুন্দর করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, যা একজন শিশুর আদর্শ ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. Ravi, S. Samuel. A Comprehensive Study of Education. PHI Learning Private Limited, Delhi.
  2. পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
  3. ঘোড়াই, নিমাই চাঁদ। শিক্ষাদর্শন ও সামাজিক শিক্ষা। সাঁতরা পাবলিকেশন প্রা. লি., কলকাতা।
  4. পাল, গোবিন্দ পদ ও মিত্র, গঙ্গারাম। দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের ভিত্তি। নব প্রকাশনী, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *