প্রকৃতিবাদী দর্শন ও শিক্ষা | Naturalistic Philosophy and Education

প্রকৃতিবাদী দর্শন (Naturalistic Philosophy and Education) বিভিন্ন জ্ঞানের তৃষ্ণাকে অবলম্বন করে বৈচিত্র্যপূর্ণ শাখায় বিস্তারিত হয়েছে। ভাববাদী দর্শনের বিকল্প হিসেবে পাশ্চাত্য দেশে প্রকৃতিবাদী দার্শনিক মতবাদটি গড়ে ওঠে। প্রকৃতিবাদীদের চিন্তাধারা অনুযায়ী এই বিশ্বপ্রকৃতি যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, যা প্রত্যক্ষ করা যায়, তাই হল বাস্তব।
প্রকৃতিবাদী দর্শনের স্বরূপ
মনস্তত্ত্ব এবং ব্যক্তিগত বৈষম্য ভাববাদী দর্শনে প্রাধান্য না পাওয়ায়, এর প্রতিবাদ স্বরূপ প্রকৃতিবাদী দর্শনের উদ্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, ভাববাদের বিপরীতার্থক মতবাদ হল প্রকৃতিবাদ। প্রকৃতিবাদী দার্শনিকের মতে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিশ্বপ্রকৃতি হল প্রকৃত বাস্তব আর সবকিছুই মিথ্যা। প্রকৃতিবাদীগণ বিশ্বপ্রকৃতি স্বরূপ, পরিবর্তন, এবং ঘটমান অবস্থা ইত্যাদি সবকিছুকেই নৈর্ব্যক্তিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করার চেষ্টা করেছেন।
প্রকৃতিবাদী শিক্ষা দার্শনিক
প্রকৃতিবাদের সমর্থক দার্শনিকগণ হলেন- রুশো, অ্যারিস্টটল, কোঁত, হবস, বেকন, নান, ডারউইন, হাক্সলে, স্পেনসার, বাটলার, ডেমোক্রিটাস, এপিকিউরাস, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ।
প্রকৃতিবাদের সংজ্ঞা
প্রকৃতিবাদ শব্দটি বিভিন্ন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদদের দ্বারা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
জে.এস. রস (J.S. Ross)-বলেছেন, “Naturalism is a term loosely applied in educational theory to systems of training that are not dependent on schools or books but on the manipulation of the actual life of the educated.” অর্থাৎ, প্রকৃতিবাদ হল শিক্ষাতত্ত্বে ব্যবহৃত একটি শিথিল পরিভাষা, যা এমন প্রশিক্ষণ পদ্ধতিকে বোঝায় যা বিদ্যালয় বা পুস্তকের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবনের নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল।
রাস্ক (Rusk)-এর মতে, “Naturalism is a philosophical position adopted by those who approach philosophy from a purely scientific point of view.” অর্থাৎ, প্রকৃতিবাদ হল এমন একটি দার্শনিক অবস্থান, যা সেইসকল ব্যক্তিরা গ্রহণ করেন যারা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শনের চর্চা করেন।
প্রকৃতিবাদের শ্রেণিবিভাগ
প্রকৃতিবাদী দর্শনকে বিশ্লেষণে এর বিভিন্ন প্রকার মতামত বা শ্রেণি পরিলক্ষিত হয়। যা সম্বন্ধে নিম্নে উল্লেখ করা হল-
জড় প্রকৃতিবাদ
এই ধারায় বিশ্বাসীগণ মনে করেন, মানুষের জীবন অন্যান্য জড় বস্তুর ন্যায় প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত হয়।
জৈবিক প্রকৃতিবাদ
এই ধারায় বিশ্বাসীগণ মনে করেন, ক্রমবিবর্তনের ফলে ইতর প্রাণী থেকে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে, যার বৈশিষ্ট্যগুলি মানুষের মধ্যে দেখা যায়।
যান্ত্রিক প্রকৃতিবাদ
যান্ত্রিক প্রকৃতিবাদ অনুযায়ী মানুষকে এক ধরনের যান্ত্রিক সত্ত্বা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মনোবৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদ
সকলের মধ্যে কিছু মানসিক বৈশিষ্ট্য যথা- আগ্রহ, বুদ্ধি, প্রবণতা রয়েছে। সেগুলিকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করাই হবে শিক্ষার উদ্দেশ্য।
কল্পনাপ্রবণ প্রকৃতিবাদ
এই মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা হলেন রুশো। এই মতবাদ মনোবৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদ ও জৈবিক প্রকৃতিবাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এই মতবাদ অনুযায়ী, জন্মের সময় শিশু থাকে সরল ও পবিত্র, সমাজ যাতে তাকে কলুষিত করতে না পারে, সেই অনুযায়ী শিক্ষার পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রকৃতিবাদের মূলসূত্র বা নীতি
প্রকৃতিবাদী দার্শনিক মতবাদ কতগুলি মৌলিক নীতি বা সূত্রকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। যথা-
- দৃশ্যমান জগতই সত্য, আর সবই মিথ্যা।
- প্রকৃতিবাদী দার্শনিকগণ সবকিছুকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন।
- প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা আকস্মিকভাবে ঘটে না, বিশ্ব প্রকৃতি কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলে।
- আদর্শ মনোবৈজ্ঞানিক পরিবেশ মানুষের সাথে সমাজের সার্থক সংগতি সাধনে সহায়ক।
শিক্ষায় প্রকৃতিবাদী দর্শনের প্রভাব
প্রকৃতিবাদী শিক্ষাদর্শন শিক্ষাক্ষেত্রকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম, শিক্ষা পদ্ধতি, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষক সম্পর্কে এই দর্শনের বক্তব্যগুলি হল-
প্রকৃতিবাদ ও শিক্ষার লক্ষ্য
শিক্ষার লক্ষ্য সম্পর্কে প্রকৃতিবাদী দার্শনিকগণ নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সেগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রকৃতিবাদী দার্শনিকগণ শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে আত্ম-সংরক্ষণ (Self-preservation), আত্ম-প্রকাশ (Self-expression), বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সুখের জন্য প্রস্তুতি, প্রকৃতি অনুযায়ী শিক্ষা এবং প্রবৃত্তির উদগতি সাধনকে গ্রহণ করেছেন।
প্রকৃতিবাদ ও শিক্ষার পাঠক্রম
প্রকৃতিবাদী দর্শনের লক্ষ্যগুলি তাঁদের পাঠক্রমে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁদের মতে, আত্মসংরক্ষণ শিক্ষার মূল লক্ষ্য। সুতরাং, যে সকল বিষয় শিশুর আত্মসংরক্ষণে সহায়ক সেই সকল বিষয়কে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই জন্য তাঁরা যে পাঠক্রমের কথা বলেছেন তাতে থাকবে জীবন বিজ্ঞান, প্রকৃতি বিজ্ঞান, রসায়ন, এবং গণিত। এছাড়াও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান, প্রকৃতি পাঠ, কৃষি বিদ্যা, উদ্যান রচনা, সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়।
প্রকৃতিবাদ ও শিক্ষাপদ্ধতি
প্রকৃতিবাদী শিক্ষাদর্শন গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতির বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে শিক্ষাপদ্ধতি নির্ধারিত হবে শিশুর আগ্রহ, চাহিদা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী। প্রকৃতিবাদীগণ কর্মকেন্দ্রিক, খেলাভিত্তিক, ইন্দ্রিয় প্রশিক্ষণ, বক্তৃতা, শিক্ষামূলক ভ্রমণ ইত্যাদি পদ্ধতির সাহায্যে বিষয়বস্তু উপস্থাপনের মাধ্যমে শিশুকে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন।
প্রকৃতিবাদ ও শৃঙ্খলা
ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাকে প্রকৃতিবাদী দার্শনিকগণ মেনে নিয়েছেন। সেহেতু তাঁরা শিক্ষাক্ষেত্রে মুক্ত বা স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলার কথা বলেছেন। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, কারোর স্বাধীনতা অন্যের পরাধীনতার কারণ হয়ে যাতে না দাঁড়ায়।
প্রকৃতিবাদ ও শিক্ষক
শিক্ষকের কর্তব্য সম্পর্কে প্রকৃতিবাদীগণের চিন্তাভাবনায় অভিনবত্ব আছে। তাঁদের মতে, প্রকৃত শিক্ষক হলেন তিনি, যিনি শিক্ষার আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টিতে দক্ষ। অর্থাৎ, একজন শিক্ষক শিশুর শিক্ষার আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে; শিশুর আগ্রহ, সামর্থ্য এবং চাহিদা অনুযায়ী সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালনা করবেন।
প্রকৃতিবাদী দর্শনের অবদান
শিক্ষায় প্রকৃতিবাদের অবদান সম্বন্ধে নিম্নে আলোচনা করা হল-
- প্রকৃতিবাদী দর্শন শিশুর স্বাভাবিক আগ্রহ, প্রবণতা, যোগ্যতা এবং ক্ষমতা অনুসারে তার বিকাশের উপর জোর দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিশু মনোবিজ্ঞানের বিকাশে এবং আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রবণতার প্রবর্তনে গতি সঞ্চার করেছে।
- প্রকৃতিবাদী দর্শন সমাজতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার জন্ম দিয়েছে।
- প্রকৃতিবাদ বিষয়ভিত্তিক পাঠক্রমের তুলনায় অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক পাঠক্রমে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, ফলস্বরূপ, সহ-পাঠক্রমিক কার্যকলাপের প্রাধান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
- শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসক্রিয়তাকে প্রকৃতিবাদ সমর্থন করায়, শিক্ষাক্ষেত্রে শিশু সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছে।
প্রকৃতিবাদী দর্শনের সীমাবদ্ধতা
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃতিবাদী দর্শনের যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি তার সাথে বেশকিছু ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাও পরিলক্ষিত হয়। যথা-
- প্রকৃতিবাদ শিক্ষাক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছে।
- প্রকৃতিবাদ প্রকৃতির দ্বারা স্বাভাবিক বিকাশের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। তবে বেশ কিছু পণ্ডিতগণ মনে করেন, শিশুকে সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলে, শিশুটি অসামাজিক হয়ে উঠবে।
- প্রকৃতিবাদ শিশুকে স্বাভাবিকভাবে নিজেকে বিকশিত করার জন্য অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করে। এটি আত্মম্ভরিতা সৃষ্টি করতে পারে এবং আত্ম-উপলব্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
- প্রকৃতিবাদ অনুসারে প্রাকৃতিক পরিণতির মাধ্যমে শৃঙ্খলার যে নীতির উপর জোর দেওয়া হয়, তা বেশ অনুপযুক্ত এবং প্রায়শই ক্ষতিকর।
আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি- Ravi, S. Samuel. A Comprehensive Study of Education. PHI Learning Private Limited, Delhi.
- পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
- ঘোড়াই, নিমাই চাঁদ। শিক্ষাদর্শন ও সামাজিক শিক্ষা। সাঁতরা পাবলিকেশন প্রা. লি., কলকাতা।
- পাল, গোবিন্দ পদ ও মিত্র, গঙ্গারাম। দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের ভিত্তি। নব প্রকাশনী, কলকাতা।






