|

শিক্ষা পরিকল্পনা – অর্থ, সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, উদ্দেশ্য এবং ধাপসমূহ

পরিকল্পনা এমন একটি প্রক্রিয়া যে প্রক্রিয়ার সাহায্যে পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য নিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য বুদ্ধি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড্রোর (Dror, 1963)-এর মতে, পরিকল্পনা হল এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করার জন্য একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পূর্বপরিকল্পনা ব্যতীত কোনো কার্যক্রম সফল হওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হল শিক্ষা পরিকল্পনা। শিক্ষা পরিকল্পনা শিক্ষার্থীর বয়স, সংখ্যা, সুযোগ-সুবিধা, শ্রেণীকক্ষের আয়তন, আসন বিন্যাস, পাঠ্যসূচি, শিক্ষা সহায়ক অন্যান্য কর্মসূচি, যেমন- আয় ব্যয় হিসাব, সহপাঠক্রমিক কার্যাবলী ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে। পরিকল্পনা কাজের পূর্বে নির্ধারিত হয় বলে একে পূর্বনির্ধারিত কার্যক্রমও বলা হয়। তাই কোনো কাজ শুরু করার আগে কাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে চিন্তা করে বাস্তবায়নের দিকে যাওয়াকে শিক্ষা পরিকল্পনা বলে।

 

শিক্ষা পরিকল্পনার সংজ্ঞা

শিক্ষা পরিকল্পনা সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিম্নে তুলে ধরা হল-

কুন্টজ এবং ও’ডোনেল (Koontz and O’Donnell)-এর মতে, “পরিকল্পনা এমন একটি উন্নত বুদ্ধি সম্পন্ন প্রক্রিয়া যাতে বিচক্ষণতার সাথে কর্মপদ্ধতি স্থির করা এবং উদ্দেশ্য, ঘটনা এবং বিচার-বিবেচনা ভিত্তিক হিসাবের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে।”

কুম্বস (Coombs, 1970)-এর মতে, “শিক্ষার্থী ও সমাজের চাহিদা এবং উদ্দেশ্যের নিরিখে শিক্ষাকে আরও ফলপ্রসূ করার জন্য যুক্তিপূর্ণ, নিয়মাবদ্ধ বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করাকেই বলা হয় শিক্ষামূলক পরিকল্পনা।”

 

শিক্ষা পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য

যেকোনো আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনার সঙ্গে শিক্ষা পরিকল্পনারও কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

  1. প্রক্রিয়া : শিক্ষা পরিকল্পনা এমন একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যেটি সম্পন্ন করার জন্য প্রক্রিয়া হিসাবে সম্পদের প্রয়োজন।
  2. প্রস্তুতি : শিক্ষা পরিকল্পনা হল একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যা সরাসরি কোনো সংস্থার মাধ্যমে গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।
  3. লক্ষ্যাভিমুখীতা : শিক্ষা পরিকল্পনার কর্মপন্থায় অনেকগুলো সুপারিশ গৃহীত হয়ে থাকে। তবে সব সময় সবগুলো সুপারিশ বাস্তবায়িত নাও হতে পারে। প্রায়ই পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ের সুপারিশের আলোকে নীতি নির্ধারণ করা হয়।
  4. ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি : শিক্ষা পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। এতে সমসাময়িক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতের অভিক্ষেপ/প্রক্ষেপণ (Projection) করা হয়।

উপরিউক্ত সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণে বলা যেতে পারে, শিক্ষা পরিকল্পনা হল এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য পদ্ধতিগতভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতের জন্য সঠিক করনীয় এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়।

 

শিক্ষা পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলি নিম্নে আলোচনা করা হল-

  1. শিক্ষা পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হল স্বল্প সময়ের মধ্যে সাক্ষরতা অর্জনের মধ্যেদিয়ে সর্বস্তরের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া।
  2. নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে শিক্ষার পরিমাণগত দিক অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত দিকের উন্নয়ন সাধন।
  3. পরিকল্পনা যদি ঠিক মত রচিত হয়, তবে সেক্ষেত্রে শিক্ষায় অপচয়ের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
  4. সবশেষে, প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

 

শিক্ষা পরিকল্পনার ধাপসমূহ

শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নকালে বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করা হয়। এই ধাপগুলি সম্বন্ধে নিম্নে আলোচনা করা হল-

প্রথম,পরিকল্পনা পূর্ব অবস্থা যাচাইকরণশিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নকালে পূর্ববর্তী শিক্ষা বর্ষগুলোতে শিক্ষা উন্নয়নের গতি প্রকৃতি কিরূপ ছিল তা পরখ করতে হয়।
দ্বিতীয়,উদ্দেশ্য ও কৌশল নির্ধারণপ্রাপ্ত তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান যাচাই করার পর, শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে এক দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা বা পূর্বাভাস নির্মাণ করতে হয়।
তৃতীয়,বিকল্প ও উৎকৃষ্ট কার্য-পদ্ধতি গ্রহণশিক্ষা পরিকল্পনার উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইনপুট ব্যবহার করে বিকল্প পদ্ধতির মূল্যায়ন করা হয়।
চতুর্থ,উপ-পরিকল্পনা গ্রহণঅর্থনীতির অন্যান্য খাতের ন্যায় শিক্ষার জন্যও বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। শিক্ষায় বিনিয়োগ করা হয়, সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পঞ্চম,বাস্তবায়ন সময় ও কার্যকাল নির্ধারণপ্রতিটি শিক্ষা পরিকল্পনার শুরু ও সমাপ্তির নির্ধারিত সময়কাল থাকে।

উপরোক্ত ধাপগুলি অনুসরণ করে শিক্ষা পরিকল্পনা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে  দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজনীয়তার সাথে সংগতি রেখে শিক্ষা পরিকল্পনা করা হয়।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. Ali, Lokman. Educational Administration and Management. Global Net Publication, New Delhi.
  2. পাল, দেবাশিস। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা প্রশাসন এবং সংগঠন। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।
  3. ব্যানার্জী, মিতা., সিনহা, সৃদীপা। শিক্ষা সংগঠন এবং পরিকল্পনা। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *