|

শিক্ষার চারটি স্তম্ভ (Four Pillars of Education)

শিক্ষার চারটি স্তম্ভ (Four Pillars of Education) হল একবিংশ শতকের আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্বরূপ। শিক্ষা হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে সার্থক অভিযোজনে সহায়ক। শিক্ষা হল ব্যক্তি ও সমাজ উন্নয়নের সঠিক হাতিয়ার। তাই পৃথিবীর যেকোনো দেশে শিক্ষার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। আর এই উদ্দেশ্যকেই সফল করতে UNESCO একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন গঠন করেন।

এই আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন গঠনে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (UNO) এবং তার শাখা United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization (UNESCO) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত UNESCO-এর একটি সাধারণ সভায় Director General Federico Mayor-কে একবিংশ শতকে শিক্ষা ও জ্ঞানের সম্প্রসারণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন গঠনের অনুরোধ জানানো হয়। এবং অনুরোধের প্রতিফলন হিসেবে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে জ্যাকস ডেলর (Jacques Delors)-এর সভাপতিত্বে একবিংশ শতকের আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন (International Commission on Education for Twenty-first Century) গঠিত হয়। এই কমিশনের সদস্যরা বিভিন্ন দেশের ১৪ জন সদস্যকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে ভারত থেকে ডঃ করণ সিংও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে UNESCO-এর উদ্যোগে শিক্ষাবিদ জ্যাকস ডেলর-এর নেতৃত্বে প্যারিসে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে কমিশন তাদের প্রতিবেদনটি “Learning : The Treasure Within” (শিখন : অন্তরের নিহিত ঐশ্বর্য) এই শিরোনামে পেশ করেন। Jacques Delors এই রিপোর্টে শিক্ষার বিবর্তন এবং ব্যক্তির ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে শিক্ষার চারটি স্তম্ভ (Four Pillars of Education)-র উল্লেখ করেন। এই চারটি স্তম্ভ-কে নিম্নে একটি চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হল এবং বিস্তারিত বিবরণের উল্লেখও করা হল-

চিত্র – শিক্ষার চারটি স্তম্ভ (Four Pillars of Education)

 

জানার জন্য শিক্ষা (Learning to KNOW)

চারটি স্তম্ভের প্রথম ও অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হল জানার জন্য শিক্ষা (Learning to Know)। ডেলর কমিশনের এই ধারণা অনুযায়ী আধুনিক শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হল জ্ঞান অর্জন করা, কারণ জ্ঞান হল জীবনের মূল শক্তি এবং প্রকৃত জ্ঞান আমাদের ঠিক এবং ভুলের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্ণয় করতে সহায়তা করে। তবে কমিশন এক্ষেত্রে শুধুমাত্র জ্ঞান আহরণ-কে নয়, জ্ঞান আহরণের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং কৌশলকে আয়ত্ত করার কথা বলেছেন।

 

কর্মের জন্য শিক্ষা (Learning to DO)

শিক্ষার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল কর্মের জন্য শিক্ষা (Learning to Do)। জ্ঞান আহরণের প্রকৃত সার্থকতা থাকে তার বাস্তবায়নে, সেহেতু যেটা শিখবো সেটাকে বাস্তবে প্রয়োগ করবো। এই জন্য পাঠক্রমকে বাস্তবমুখী করে তুলতে হবে এবং এমন সব বিষয়ের সংযোজন করতে হবে যা শিক্ষার্থীর কর্মদক্ষতার বিকাশে সহায়ক। কারণ শিক্ষার্থীরা যাতে ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের উপার্জনে সক্ষম করে তুলতে পারে তার জন্য শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

 

একত্রে বসবাসের জন্য শিক্ষা (Learning to LIVE TOGETHER)

মানুষ হল সামাজিক জীব। সভ্যতার আদি পর্ব হতে মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, দলবদ্ধভাবে বা যূথবদ্ধভাবে বসবাস মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। সেই জন্য শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে একত্রে জীবন-যাপন এবং কাজকর্মের মূল মন্ত্র প্রদান এবং অকারণ দ্বন্দ্ব, লড়াই বা হিংসা না করে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেদিয়ে আধুনিক সমাজে বসবাস। কারণ সমাজের প্রত্যেকের সহযোগিতা এবং একে অপরের প্রতি পারস্পরিক নির্ভরশীলতা একটি আদর্শ সমাজের জন্ম দেয়।

 

মানুষ হওয়ার শিক্ষা (Learning to BE)

আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য শুধুমাত্র জ্ঞান প্রদান বা কর্মক্ষমতার বৃদ্ধি কিংবা একত্রে বসবাসের মূল মন্ত্র শেখানোই নয়, শিক্ষার্থীরা যাতে আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে পারে তার জন্য আদর্শ শিক্ষা পরিবেশের রচনা করা। সুতরাং, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে ব্যক্তিসত্তার বিকাশ সাধন এবং সমাজের বুকে নিজেদের সু-নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে সেদিকে নজর দেওয়া।

ডেলর কমিশন প্রস্তাবিত আধুনিক শিক্ষার এই চারটি স্তম্ভ বর্তমান শিক্ষার উদ্দেশ্যর সাথে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপরোক্ত চারটি স্তম্ভ শিক্ষায় সার্থক সংযোজনে শিক্ষাকে একবিংশ শতকের জন্য উপযোগী করে তোলা সম্ভব।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. পাল, অভিজিৎ কুমার। শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা। ক্লাসিক বুকস, কলকাতা।
  2. ঘোড়াই, নিমাই চাঁদ। শিক্ষাদর্শন ও সামাজিক শিক্ষা। সাঁতরা পাবলিকেশন প্রা. লি., কলকাতা।
  3. https://www.unesco.org

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *