|

শিক্ষা পরিকল্পনা – প্রকারভেদ, তাৎপর্য এবং ত্রুটি

শিক্ষাগত পরিকল্পনার প্রকারগুলি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে একটি দেশের ভবিষ্যতের শিক্ষার দিগনির্দেশের জন্য নীতিমালার সাথে পরিকল্পনাকারীদের দ্বারা গৃহীত পরিকল্পনাকে বোঝায়। শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ বিকাশের সম্ভাবনা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের চাহিদাকে মর্যাদা দিয়ে নীতি ও অগ্রাধিকার সম্বন্ধীয় অগ্রিম দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার প্রক্রিয়াই হল শিক্ষা পরিকল্পনা।

 

শিক্ষামূলক পরিকল্পনার প্রকারভেদ

পরিকল্পনা হল সিদ্ধান্তের যৌক্তিক প্রক্রিয়া যা ভবিষ্যতে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত। পরিকল্পনা ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ডের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। বৈশিষ্ট্য অনুসারে নিম্নে শিক্ষা পরিকল্পনার প্রকারগুলি উল্লেখ কর হল-

স্থায়িত্ব অনুসারে শিক্ষা পরিকল্পনার প্রকারভেদ
  1. দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা : এই ধরনের পরিকল্পনা সাধারণত কোনো উদ্যোগ বা স্কুল সংস্থার শীর্ষ পরিচালন কমিটির দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি 5-10 বছর বা তারও বেশি সময়কাল জুড়ে বিস্তৃত।
  2. মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা : এই ধরনের পরিকল্পনা বৃহত্তর স্পষ্টতার সাথে ভবিষ্যতের শিক্ষার লক্ষ্যগুলিকে সংজ্ঞায়িত করে। এটি 2-4 বছর বা তারও বেশি সময়কাল জুড়ে বিস্তৃত।
  3. স্বল্প-মেয়াদী পরিকল্পনা : এটি ভবিষ্যতের লক্ষ্যগুলিকে তাৎক্ষণিকভাবে অর্জনের জন্য নির্মিত হয়। এটি এক বছরের বা এক বছরেরও কম সময়ের জন্য গঠিত হয়।
সময় গতিশীলতা অনুযায়ী পরিকল্পনা
  1. রোলিং-টার্ম পরিকল্পনা : এই প্রকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাফল্যের মাত্রার উপর ভিত্তি করে, একটি নির্দিষ্ট সময় কিংবা প্রয়োজন অনুসারে সময়সীমা বর্ধিত করণের সাথে জড়িত।
  2. ফিক্সড-টার্ম পরিকল্পনা : এই প্রকার পরিকল্পনার একটি নির্দিষ্ট সময়কাল থাকে। যেমন- 3 বছর বা 5 বছর এবং এক্ষেত্রে সময়সীমা নির্দিষ্ট অর্থাৎ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য জড়িত থাকে।
ব্যবস্থাপনা স্তরের পরিকল্পনা
  1. রণনীতিগত পরিকল্পনা : এটি সাধারণত শীর্ষ স্তরীয় কমিটি কিংবা পরিচালন সমিতির দ্বারা গৃহীত হয়। ভবিষ্যতে কোনো দেশ, কোন দিকে এগিয়ে যাবে তার দিগনির্দেশ করে এই প্রকার পরিকল্পনা। এটি এক বছরেরও বেশি সময়কাল ধরে জড়িত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে 3-5 বছরেরও হতে পারে।
  2. কৌশলগত পরিকল্পনা : কৌশলগত পরিকল্পনা হল লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি তাৎক্ষণিক বা স্বল্প-মেয়াদী ক্রিয়াকলাপগুলির একটি নিয়মতান্ত্রিক সংকল্প এবং সময়সূচী। কৌশলগত পরিকল্পনা মধ্যম-স্তরের পরিচালক, যেমন- প্রতিষ্ঠানের ডিন, ব্যবস্থাপক, বিভাগের প্রধান এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকগণ দ্বারা পরিচালিত হয়।
  3. স্থায়ী পরিকল্পনা : এই ধরনের পরিকল্পনা এমন এক প্রকার পরিকল্পনা নির্মাণ বা নকশায়িত করে যা খুবকমই পরিবর্তিত হয় এবং বছরের পর বছর ব্যবহৃত হয়।
  4. একক ব্যবহারের পরিকল্পনা : এটি এমন এক ধরনের পরিকল্পনা যা একটি ক্রিয়াকলাপ বা প্রকল্পের বাস্তবায়নের সাথে জড়িত এবং ক্রিয়াকলাপ বা প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পরে এটির সমাপ্তী ঘটে। উদাহরণস্বরূপ- একটি স্কুল বাস কেনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করার পরিকল্পনা।
স্তর অনুসারে শিক্ষা পরিকল্পনার প্রকারভেদ / শিক্ষামূলক পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গি
  1. ম্যাক্রো পরিকল্পনা : এই প্রকার পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ে নেওয়া হয়ে থাকে। এটি জাতীয় সাফল্য অর্জন এবং শিক্ষায় উচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জনের লক্ষে গৃহীত হয়। ম্যাক্রো-লেভেল পরিকল্পনার উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে নীতি নির্ধারণ, শিক্ষার অর্থায়ন, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষার একীকরণ, শিক্ষার সংস্কার, শিক্ষক-শিক্ষণ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রশাসনিক কৌশল অন্তর্ভুক্ত। ম্যাক্রো পরিকল্পনা শিক্ষার জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করে। যেমন- কেন্দ্র স্তরে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা যেখানে সারা দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও  সামাজিক অগ্রগতির জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
  2. মাইক্রো প্ল্যানিং : এটি স্থানীয়, জেলাস্তর বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গৃহীত হয়। এই ধরনের পরিকল্পনা শিক্ষামূলক অনুশীলনের নিবেশ এবং প্রক্রিয়াগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শিক্ষাগত সমস্যাগুলির সাথে কাজ করে। এটি প্রক্রিয়াগুলির সাথে শিক্ষাগত সংস্থাগুলির যথাযথ সংমিশ্রণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করে যাতে উচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জন করা যায়। মাইক্রো স্তরের পরিকল্পনায় শিক্ষাব্যবস্থায় যোগদান, শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া, সাজ-সরঞ্জামাদি, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কিত সমস্যাগুলির সাথে জড়িত। মাইক্রো-পরিকল্পনার উদ্বেগের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে বিনোদনমূলক পরিষেবা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা, নির্দেশনা এবং পরামর্শদান পরিষেবাদি, বিদ্যালয় প্রোগ্রামের সংগঠন এবং পাঠক্রম প্রয়োগের পরিকল্পনা জড়িত।
  3. তৃণমূল স্তরের পরিকল্পনা : এই পরিকল্পনাটি কোনো অঞ্চলে স্বল্প জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের জন্য রচিত হয়। মহাত্মা গান্ধী এমন পরিকল্পনার কথা বলেছেন। পরিকল্পনার রূপরেখা অঞ্চল থেকে অঞ্চলভেদে পৃথক হতে বাধ্য। তৃণমূল স্তরের পরিকল্পনা, মাইক্রো-লেভেল পরিকল্পনা নামেও পরিচিত একটি কৌশল, যা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেদের বিকাশের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিতকরণ, তাদের অগ্রাধিকার এবং কার্যকর প্রকল্পগুলি গঠনে সহায়তা করে যাতে সীমিত সংস্থাগুলির সাথে একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সর্বাধিক বিকাশ সম্ভব হয়।

 

শিক্ষা পরিকল্পনার তাৎপর্য

শিক্ষা পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য তাৎপর্যগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হল-

  1. শিক্ষা পরিকল্পনা ভবিষ্যতের নিরিখে বিভিন্ন ঘটনা, শর্তাবলী ও প্রয়োজনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। পূর্ব-পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মাত্রা যতদূর সম্ভব কম করার চেষ্টা করা হয়।
  2. সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাথমিক শিক্ষা পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাবিষয়ক সর্বাপেক্ষা অনুকূল সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
  3. শিক্ষা পরিকল্পনা ক্রিয়া ও কার্যসম্পাদনের পথপ্রদর্শক রূপে কাজ করে।
  4. শিক্ষা পরিকল্পনা, সাংগঠনিক পুনর্নবীকরণ-এর অংশ হিসাবে স্বীকৃত। MBO, PERT এবং অন্যান্য  পূর্বানুমান পদ্ধতিগুলি শিক্ষা পরিকল্পনারই অংশ বিশেষ।

 

শিক্ষা পরিকল্পনার ত্রুটি

আমাদের দেশে শিক্ষা-পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যে সকল অসম্পূর্ণতা, অসুবিধা বা ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় তা নিম্নরূপ:

  1. শিক্ষা পরিকল্পনার কৌশলের মধ্যেই বিবিধ গলদ রয়েছে।
  2. বহুক্ষেত্রে পরিকল্পনা রূপায়ণে পরিচালকের সদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হয়।
  3. পরিকল্পনাগুলির যথাযথ মূল্যায়নের ব্যবস্থা নেই এবং এই বিষয়ে নতুন চিন্তাধারা বা গবেষণার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই।
  4. পরিকল্পনা রচনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব রয়েছে এবং পরিকল্পনা রচনায় গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার অভাব আছে।

 

 

আরও পোস্ট পড়তে - এখানে ক্লিক করুন

 

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
  1. Ali, Lokman. Educational Administration and Management. Global Net Publication, New Delhi.
  2. পাল, দেবাশিস। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা প্রশাসন এবং সংগঠন। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।
  3. ব্যানার্জী, মিতা., সিনহা, সৃদীপা। শিক্ষা সংগঠন এবং পরিকল্পনা। রীতা পাবলিকেশন, কলকাতা।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *